যেই শিশু আগে কাঁদবে, সেই চ্যাম্পিয়ন- জাপানের অদ্ভুত ‘নাকিসুমো ক্রাইং বেবি ফেস্টিভ্যাল’

জাপানে ৪০০ বছর পুরনো এক উৎসব আছে, যেখানে বাবা-মায়েরা নিজের সন্তানের কান্না থামাতে নয়—বরং কান্না শুরু করাতে ব্যস্ত থাকেন। শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি। প্রতি বছর জাপানের বিভিন্ন অঞ্চলে আয়োজিত হয় ‘নাকিসুমো ক্রাইং বেবি ফেস্টিভ্যাল’ (Nakizumo Crying Baby Festival)—যেখানে বিজয়ী হয় সেই শিশু, যে সবার আগে জোরে কেঁদে ওঠে।
এই উৎসবে সাধারণত এক বছর বয়সী শিশুদের অংশগ্রহণ করানো হয়। শিশুদের পরানো হয় ঐতিহ্যবাহী সাজ-পোশাক। এরপর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় সুমো কুস্তির মঞ্চে—যাকে বলা হয় দোহয়ো (dohyo)।

সেখানে প্রতিযোগিতা শুরু হয় অভিনব নিয়মে। দুই শিশুকে দুইজন সুমো কুস্তিগীর কোলে নিয়ে দাঁড়ান মুখোমুখি। এরপর শুরু হয় কান্না বের করার নানা কৌশল।
দোহয়ো শিশুরা মুখোমুখি হলে সুমো রেফারি তাদের নানাভাবে ভয় দেখানো বা মজা করার চেষ্টা করেন।
কুস্তিগীররা শিশুকে সামান্য দোল দেন, যেন কান্না চলে আসে।
কিন্তু যদি কোনো শিশু একদমই না কাঁদে—তাহলে বের করা হয় বিশেষ অস্ত্র!
একটি ভয়ংকর দেখতে ‘টেঙ্গু’ (Tengu) মাস্ক—যা জাপানি লোককথায় এক ধরনের পাখি-দানব হিসেবে পরিচিত।
টেঙ্গু মাস্ক দেখেই অনেক শিশুর চোখ-মুখ এক মুহূর্তে বদলে যায়—আর শুরু হয় জোর কান্না।

যদি দুই শিশু একই সময়ে কাঁদে, তাহলে বিচার হয় কার কান্না বেশি জোরে এবং বেশি সময় ধরে চলে। যে শিশু সবচেয়ে বেশি হাউমাউ করে কাঁদতে পারে—তাকেই ঘোষণা করা হয় বিজয়ী।
এই উৎসবের পেছনে রয়েছে একটি পুরনো জাপানি বিশ্বাস। জাপানি প্রবাদ ‘নাকু কো ওয়া সোডাতসু’ (Naku ko wa sodatsu) অর্থাৎ—
‘যে শিশু কাঁদে, সে ভালোভাবে বড় হয়।’
বিশ্বাস করা হয়, কান্না শিশুকে শক্তিশালী ও সুস্থ করে তোলে। পাশাপাশি এই কান্না অশুভ আত্মা তাড়াতেও সাহায্য করে।
এই উৎসব জাপানের বিভিন্ন জায়গায় হলেও সবচেয়ে বড় আয়োজন হয় টোকিওর আসাকুসা এলাকায় অবস্থিত বিখ্যাত সেনসোজি (Sensoji) মন্দিরে।
এখানে উৎসব এতটাই জনপ্রিয় যে অংশ নিতে হয় লটারির মাধ্যমে। প্রতিবছর মাত্র প্রায় ১০০ জন শিশু সুযোগ পায় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার। উৎসবে ভিড়—শিশু, আত্মীয়, পর্যটক সবাই হাজির।
উৎসব চলাকালে সেনসোজি মন্দির এলাকায় জমে যায় উৎসবমুখর পরিবেশ। বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন, স্থানীয় মানুষ এমনকি বিদেশি পর্যটকরাও ভিড় করেন এই মজার দৃশ্য দেখতে।
নাকিজুমো উৎসব দেখতে যতই মজার এবং অদ্ভুত লাগুক না কেন, এর মূল উদ্দেশ্য হলো—শিশুর সুস্থতা, শক্তি এবং শুভ ভবিষ্যতের জন্য আশীর্বাদ কামনা।
আর সত্যি বলতে কী—একদিন যে কান্না থামাতে বাবা-মা হিমশিম খান, সেই কান্নাকেই উৎসবে পরিণত করা—এটা কেবল জাপানই পারে।



