বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬
নারী

অনলাইন বিজনেস: নারীর ক্ষমতায়নের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার?

file_00000000322881fa80bf0439572375f9

একসময় ব্যবসা মানেই ছিল দোকান, অফিস কিংবা বড় অঙ্কের মূলধন। উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও অনেক নারী সামাজিক বাধা, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা অর্থের অভাবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারতেন না। কিন্তু ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার সেই বাস্তবতা বদলে দিয়েছে। আজ একটি স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সংযোগ এবং নিজের দক্ষতাই একজন নারীকে সফল উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।

বাংলাদেশে গত এক দশকে অনলাইন ব্যবসার প্রসার নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, ইউটিউব কিংবা বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে হাজারো নারী ঘরে বসেই নিজেদের ব্যবসা গড়ে তুলছেন। কেউ বিক্রি করছেন দেশীয় পোশাক, কেউ গয়না, অর্গানিক প্রসাধনী, মেহেদি, হস্তশিল্প কিংবা ঘরে তৈরি খাবার। আবার কেউ ডিজিটাল সেবা, গ্রাফিক ডিজাইন, অনলাইন কোর্স বা কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে আয় করছেন। এসব উদ্যোগ শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে পরিবর্তন আনছে না, বদলে দিচ্ছে পরিবার ও সমাজের অর্থনৈতিক চিত্রও।

ঘর থেকেই শুরু, স্বপ্নের পথে হাঁটা
অনলাইন ব্যবসার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—এটি শুরু করতে বিশাল মূলধনের প্রয়োজন হয় না। একটি ফেসবুক পেজ, কিছু ভালো ছবি, আন্তরিক গ্রাহকসেবা এবং নিয়মিত যোগাযোগ দিয়েই ব্যবসার যাত্রা শুরু করা সম্ভব। ফলে যেসব নারী সন্তান লালন-পালন, সংসারের দায়িত্ব বা সামাজিক সীমাবদ্ধতার কারণে বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারেন না, তাঁরাও নিজের সময় অনুযায়ী কাজ করে আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন।

অনেক নারী প্রথমে নিজের শখ থেকে ব্যবসা শুরু করেন। হাতে তৈরি গয়না, কেক, ব্লক-প্রিন্ট, মেহেদি, বুটিক পোশাক কিংবা হোমমেড খাবার দিয়ে শুরু হওয়া ছোট উদ্যোগ ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ ব্র্যান্ডে পরিণত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাঁদের জন্য শুধু বিক্রির জায়গা নয়, এটি হয়ে উঠেছে নিজের পরিচয় তুলে ধরার একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম।

Advertisements

অর্থনৈতিক স্বাধীনতার নতুন সংজ্ঞা
অর্থনৈতিক স্বাধীনতা শুধু নিজের আয় নয়; এটি নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার সক্ষমতাও তৈরি করে। একজন নারী যখন নিজের উপার্জনের মাধ্যমে পরিবারের ব্যয়ে অংশ নেন, তখন তাঁর মতামতের মূল্যও বাড়ে। সন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কিংবা পারিবারিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অংশ নিতে পারেন।

অনেক নারী উদ্যোক্তা তাঁদের ব্যবসার মাধ্যমে অন্য নারীদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিচ্ছেন। একজন উদ্যোক্তার সফলতার পেছনে যুক্ত থাকেন কারিগর, ডেলিভারি কর্মী, প্যাকেজিং সহকারী, ফটোগ্রাফার কিংবা স্থানীয় উৎপাদকরা। অর্থাৎ একটি ছোট অনলাইন ব্যবসাও অনেক মানুষের জীবিকার উৎস হয়ে উঠতে পারে।

গ্রামের নারীদের জন্যও নতুন সম্ভাবনা
একসময় গ্রামের নারীদের তৈরি পণ্য স্থানীয় বাজারের বাইরে খুব একটা পরিচিতি পেত না। এখন মোবাইল ব্যাংকিং, কুরিয়ার সেবা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে সেই সীমাবদ্ধতা অনেকটাই দূর হয়েছে।

রাজশাহীর সিল্ক, টাঙ্গাইলের শাড়ি, জামালপুরের নকশিকাঁথা, পার্বত্য অঞ্চলের হস্তশিল্প কিংবা গ্রামের ঘরে তৈরি আচার—এসব পণ্য এখন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে। এতে স্থানীয় ঐতিহ্য যেমন টিকে থাকছে, তেমনি গ্রামীণ নারীদের আয়ও বাড়ছে।

শুধু ব্যবসা নয়, আত্মবিশ্বাসের গল্প
অনলাইন ব্যবসার মাধ্যমে অনেক নারী প্রথমবারের মতো নিজের পরিচয়ে পরিচিত হচ্ছেন। আগে যাঁরা শুধু কারও মা, স্ত্রী বা কন্যা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, আজ তাঁরা একজন উদ্যোক্তা, একজন ব্র্যান্ড নির্মাতা।

গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলা, নতুন পণ্যের পরিকল্পনা করা, লাইভে এসে নিজের পণ্য উপস্থাপন করা কিংবা ব্যবসার হিসাব পরিচালনা—এসব অভিজ্ঞতা নারীদের নেতৃত্বের গুণাবলি এবং আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলছে। নিজের পরিশ্রমে অর্জিত সাফল্য তাঁদের আরও বড় স্বপ্ন দেখতে শেখাচ্ছে।

কিছু চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে
তবে অনলাইন ব্যবসার পথ পুরোপুরি মসৃণ নয়। অনেক নারী উদ্যোক্তাকে প্রতারণা, ভুয়া অর্ডার, কুরিয়ার জটিলতা, নকল পণ্যের প্রতিযোগিতা কিংবা সামাজিক নেতিবাচক মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার থেকেও পর্যাপ্ত সমর্থন মেলে না।

এ ছাড়া ডিজিটাল মার্কেটিং, ব্র্যান্ডিং, ফটোগ্রাফি, আর্থিক পরিকল্পনা কিংবা ব্যবসা পরিচালনার দক্ষতার অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ মাঝপথেই থেমে যায়। তাই শুধু উদ্যোক্তা হওয়ার অনুপ্রেরণা দিলেই হবে না; প্রয়োজন নিয়মিত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ।
কী করা প্রয়োজন?

নারী উদ্যোক্তাদের আরও এগিয়ে নিতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি:

-ডিজিটাল ব্যবসা ও মার্কেটিং বিষয়ে সহজ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা।
-ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি।
-অনলাইন প্রতারণা রোধে কার্যকর আইন ও দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি।
-নিরাপদ ডিজিটাল পেমেন্ট ও নির্ভরযোগ্য কুরিয়ার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
-সফল নারী উদ্যোক্তাদের গল্প গণমাধ্যমে আরও বেশি তুলে ধরা, যাতে নতুন উদ্যোক্তারা অনুপ্রাণিত হন।
-পরিবার ও সমাজে নারী উদ্যোক্তাদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা।

ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়তে নারীর উদ্যোক্তা হওয়ার বিকল্প নেই
বাংলাদেশ দ্রুত ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি হতে পারেন নারী উদ্যোক্তারা। কারণ, নারীরা শুধু নিজের জন্য আয় করেন না; তাঁদের আয় পরিবারের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে একজন নারীর আর্থিক সাফল্য পুরো পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে প্রভাব ফেলে।

অনলাইন ব্যবসা নারীদের প্রমাণ করার সুযোগ দিয়েছে যে সাফল্যের জন্য সবসময় বড় অফিস বা বিশাল মূলধনের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন সৃজনশীলতা, ধৈর্য, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং নিজের ওপর বিশ্বাস।

নারীর ক্ষমতায়ন কেবল সমতার প্রশ্ন নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই ভবিষ্যৎ গঠনের অন্যতম ভিত্তি। তাই অনলাইন ব্যবসাকে শুধু একটি বাণিজ্যিক উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং নারীর স্বপ্ন পূরণ, আত্মমর্যাদা অর্জন এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে দেখা উচিত।
হাজারো নারী যখন নিজের পরিচয়ে দাঁড়াতে শেখেন, তখন বদলে যায় একটি পরিবার। আর হাজারো পরিবারের সেই পরিবর্তনই একসময় বদলে দেয় একটি দেশের অর্থনীতি, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ।

Advertisements
অনলাইননারী