সাধারণ নারীদের নিয়েই লিখতে চাই : আনমনা মনিষীতা

কমনওয়েলথ ছোটগল্প পুরস্কার ২০২৬-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন বাংলাদেশি লেখক আনমনা মনীষিতা। আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতি কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, সমকালীন বাংলা সাহিত্যচর্চার জন্যও এক গর্বের মুহূর্ত। তিনি বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়-এর ইংলিশ অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগে প্রভাষক এবং ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড-এ সম্পাদকীয় সহকারী হিসেবে কর্মরত। এর আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন।
গল্পশোনা থেকে গল্পলেখা
শৈশব থেকেই গল্পের প্রতি তার গভীর টান। পরিবারের আড্ডায় তিনি ছিলেন মনোযোগী শ্রোতা—বিশেষ করে দাদুমনির জীবনকথা তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ছোটবেলায় দাদুমনির আত্মজীবনীমূলক বই একাধিকবার পড়েছেন তিনি। সেই ব্যক্তিগত স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে তার লেখার ভেতরে রূপ নিতে শুরু করে। প্রথমদিকে লেখা প্রকাশের কথা ভাবেননি; নিজের ভেতরেই লালন করেছেন গল্পের বীজ।
পাঠাভ্যাসের ক্ষেত্রেও তার কোনো সীমানা নেই। ভাষা বোধগম্য হলে তিনি সব ধরনের সাহিত্য পড়েন। তার পছন্দের লেখকদের তালিকায় আছেন Elena Ferrante, Italo Calvino, কমলকুমার মজুমদার, Isabel Allende, Jane Austen, Tayeb Salih, Clarice Lispector এবং Leonora Carrington। বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক এই পাঠভূমি তার লেখায় বৈচিত্র্য ও গভীরতা যোগ করেছে।
ইতিহাসের ভেতর দিয়ে নারীর জীবনকথা
সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত গল্প ‘এ ম্যাসকুলিন ফেস্ট’ ১৯৫০-এর দশকের প্রেক্ষাপটে রচিত। এতে উঠে এসেছে একজন বাঙালি মুসলিম নারীর জীবনযাপন, তার আনন্দ-বেদনা ও সামাজিক বাস্তবতা। পারিবারিক স্মৃতি, বিশেষত দাদুমনির জীবন থেকে নেওয়া নানা উপাদান গল্পটিকে দিয়েছে এক ধরনের আন্তরিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা। ব্যক্তিগত ইতিহাসের সঙ্গে সামাজিক ইতিহাসের সংযোগ ঘটিয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন এক সময়ের নারীর অন্তর্জগত।
গল্পটি ইংরেজিতে লেখা হলেও স্থানীয় সংস্কৃতির ভাষিক স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রাখার বিষয়ে তিনি সচেতন ছিলেন। ‘চাচা’ বা ‘চাচি’ সম্বোধনের মতো শব্দ তিনি অনুবাদ করেননি, কারণ তার মতে ‘আংকেল’ বা ‘আন্টি’ শব্দে সেই সম্পর্কের অন্তরঙ্গতা ধরা পড়ে না। এই ভাষিক সিদ্ধান্ত গল্পকে একাধারে স্থানীয় ও বৈশ্বিক করে তুলেছে।
পরিকল্পনাহীন অংশগ্রহণ, অপ্রত্যাশিত সাফল্য
এই প্রতিযোগিতার জন্য গল্পটি আলাদাভাবে লেখা হয়নি। নির্ধারিত সময়সীমার কয়েকদিন আগে গল্পটি শেষ করে বন্ধুর পরামর্শে জমা দেন তিনি। কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই জমা দেওয়া সেই লেখাই পৌঁছে গেছে আন্তর্জাতিক মঞ্চে। এই সাফল্য প্রমাণ করে, প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সৃজনশীলতার নিজস্ব সময় ও প্রবাহ আছে।
নারী লেখক ও সাহিত্যবাস্তবতা
বাংলাদেশে সাহিত্যচর্চা এখনও অনেকের কাছে মূল পেশা নয়; বরং এক ধরনের ‘সাইড-জব’। লেখালেখির জন্য সময়, অর্থ ও আলোচনার ক্ষেত্র—সবই প্রয়োজন। এই সীমাবদ্ধতা নারীদের ক্ষেত্রে আরও তীব্র, কারণ তাদের উপর পারিবারিক দায়িত্বের চাপ বেশি থাকে। লেখকের পর্যবেক্ষণে, বহু প্রতিভাবান নারী সময় ও সুযোগের অভাবে নিজেদের সৃজনশীলতা বিকশিত করতে পারেন না। তাই তিনি সাধারণ নারীদের জীবন ও অভিজ্ঞতাকেই নিজের লেখার কেন্দ্রে আনতে চান।
নির্দিষ্ট রুচির বাইরে বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা
আন্তর্জাতিক সাহিত্য প্রতিযোগিতায় প্রায়ই একটি ‘অলিখিত রুচি’ বা নির্দিষ্ট ধারা প্রাধান্য পায়। তবে তার মতে, ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার জন্য প্রয়োজন ভিন্ন ভিন্ন ফর্ম ও বয়ান। একটি মাত্র রুচিকে সর্বোচ্চে স্থান দিলে বহু অভিজ্ঞতা ও চিন্তার সম্ভাবনা উপেক্ষিত হয়। সাহিত্যকে বহুস্বরের জায়গা হিসেবে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গি তার লেখায়ও প্রতিফলিত হয়।
নতুন লেখকদের জন্য বার্তা
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে ইচ্ছুক লেখকদের জন্য তার পরামর্শ সরল কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ—লিখতে চাইলে লিখতে হবে। লেখার পর সেটিকে কিছুদিন দূরে রেখে আবার নতুন চোখে ফিরে দেখা জরুরি। প্রয়োজনে সংশোধন ও পরিমার্জন করতে হবে। পাশাপাশি একজন সৎ পাঠক বা সমালোচক থাকা দরকার, যিনি নিঃসংকোচে দুর্বল দিকগুলো তুলে ধরতে পারেন। নির্মোহ সমালোচনাই লেখাকে পরিপক্ব করে।
আনমনা মনীষিতার এই সাফল্য প্রমাণ করে, ব্যক্তিগত স্মৃতি ও স্থানীয় বাস্তবতা থেকেই উঠে আসতে পারে বিশ্বজনীন গল্প। সাধারণ মানুষের জীবনই হয়ে উঠতে পারে অসাধারণ সাহিত্যের উপাদান।



