বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬
সাহিত্য-সংস্কৃতি

সূর্য দীঘল বাড়ী: এক নারীর প্রথা ভাঙার গল্প

images (2)

ক্ষুধার রাজ্যে পূর্ণিমার চাঁদকে যখন ঝলসানো রুটি মনে হয়, তখন আর মানুষ প্রথার বেড়াজালে আটকে থাকতে পারে না, পারে না ধর্মের অনুশাসনে আবদ্ধ থাকতে। ক্ষুধার স্মৃতিতে খুদের গন্ধ মানুষকে প্রথা ভাঙার সাহস জোগায়। এমনই এক প্রথা ভাঙা নারীর গল্প দিয়ে বুনন করা লেখক আবু ইসহাকের কালজইয়ী উপন্যাস ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’। আর প্রথা ভাঙা, হার না মানা সেই নারী চরিত্র জয়গুন। ক্ষুধার সাথে যুদ্ধে জিততে, সন্তানের মুখে দু’ মুঠো ভাত তুলে দিতে যে পেছনে ফেলে যায় সমাজ, সংষ্কারের রীতি-নীতি।

বাড়ির মুখখানা পূর্ব ও পশ্চিমে, সূর্যের উদয়াস্তের দিকে। তাই এর নাম সূর্য দীঘল বাড়ী। গায়ের লোকেরা বিশ্বাস করে, এ বাড়িতে ভূত-প্রেত আছে। তাই এখানে কেউ টিকতে পারে না। যারাই এখানে থেকেছে, তাদের অনেকেই আকস্মিকভাবে মরেছে। তবে সে যা-ই হোক, মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু তো দরকার। এ বাড়ির আরেক শরিক জয়গুনের নাবালক ভাইপো শফি। জয়গুনের দেখাদেখি শফির মা আর শফিও উঠে আসে এই বাড়িতে। দুই পাশে দুইখানা ঘর তুলে তারা জঙ্গল সাফ করে থেকে যায় সূর্য দীঘল বাড়িতে।

দ্বিতীয় স্বামী থেকে তালাকপ্রাপ্ত জয়গুনের তিন ছেলে মেয়ে। কিন্তু এক ছেলেকে রেখে দিয়েছে তার স্বামী, কাছে ঘেঁষতে অব্ধি দেয় না। তিনটি মুখের খাবার কীভাবে যোগাড় হবে, এই চিন্তায় ঘুম নেই জয়গুনের। সমাজের কেউ এসে তার মুখে খাবার তুলে দেবে না, তা সে ভালোই বুঝেছে। তার উপরে দেশে তখন তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ; দেশভাগের ডামাডোল। শেষে জয়গুন নিজেই নিজের আবরণ থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। একবেলা খাবার জোটাতে জয়গুনকে বাইরে গিয়ে কাজ করতে হয়। তার পরেই সে সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে পারে। তবে তার বাইরে গিয়ে রোজগার করার ব্যাপারখানাতেই গ্রামের মোড়ল গদু প্রধানের ছিল প্রচুর মতবিরোধ। তার অবশ্য ব্যক্তিগত কারণও আছে। জয়গুনের প্রথম স্বামী ছিল গদু প্রধানের বন্ধু। বন্ধুর বউয়ের এমন ‘উচ্ছৃঙ্খল’ চলাফেরা এভাবে মেনে নিতে পারে না সে। এ উপন্যাসে গদু প্রধানকে দেখা যায় পুরুষতান্ত্রিক সমাজের হর্তাকর্তা কিংবা উপন্যাসের এক খলনায়ক হিসেবে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে সমকক্ষ না করবার কিংবা নারীকে দুর্বল মনে করবার মানসিক অসুস্থতা থেকেই ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে নারীদের সামনে এগোতে দেওয়া হয় না। আর এই ব্যাপারটিই ছিল এ উপন্যাসের প্রধান বিবেচ্য বিষয়। ‘ক্ষুধার অন্ন যার নেই, তার আবার কিসের পর্দা, কিসের কি? জয়গুন বুঝেছে, জীবন রক্ষা করাই ধর্মের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ মূলমন্ত্র। জীবন রক্ষা করতে ধর্মের যেকোনো অপ-আক্রমনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে সে প্রস্তুত। উদরের আগুন নেবাতে দোজগের আগুনে ঝাপ দিতেও তার কোনো ভয় নেই।’ এখানে লক্ষণীয়, লেখক ধর্মকে হেয় করেননি। তিনি হেয় করেছেন ধর্মের অপব্যাখ্যা দেওয়া মানুষদের। যারা ধর্মের চেয়েও নিজের স্বার্থকেই বড় করে দেখে। ধর্মীয় গোঁড়ামি মনের ভেতর বেঁধে রাখা কুসংস্কারচ্ছন্ন মানুষদের নিন্দা জানিয়েছেন তিনি।

জয়গুন চরিত্রটি ব্যবহৃত হয়েছিল বর্তমানের নারী সমাজের আত্মোন্নয়নের প্রতীকী অর্থ হিসেবে। শত ঝড়-ঝঞ্ঝা উপেক্ষা করে নিজের সিদ্ধান্ত, নিজের ও পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রামকে সে তিলে তিলে কীভাবে গড়ে তোলে, সেটাই এ চরিত্রে প্রতিফলিত হয়েছে। স্বামীর অত্যাচার, গ্রামের মানুষের অবহেলা-অবজ্ঞা আর কুংসস্কারের ফাঁদে পা না দিয়ে সে তার মনকে রেখেছে শক্ত। এখানে ঔপন্যাসিক বেশ সুচতুরতার পরিচয় দিয়েছেন। সমাজের প্রথা ভাঙার পর একজন নারীর যতগুলো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, তার সবগুলোই জয়গুন চরিত্রকে মুখোমুখি করিয়েছেন এবং সেসব প্রতিকূলতা জয়গুন তার বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কাটিয়ে উঠেছে। এমনকি জয়গুনের প্রতিটি সংলাপ ছিল হৃদয়স্পর্শী।

একটি কিংবদন্তি উপন্যাসের সবচেয়ে সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তার প্রতিটি দৃশ্যপটের একেবারে নিখুঁত ব্যাখ্যা থাকা, যাতে বাদ দেওয়া যাবে না সবুজ ঘাসের উপর জমে থাকা স্বচ্ছ শিশির কিংবা ভোরের কাকের দুর্গন্ধময় বিচরণও। অর্থাৎ, প্রতিটি দৃশ্যের প্রতিটি উপাদানের উপস্থিতি পুঙ্খানুপুঙ্খ হওয়া চাই। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে, আবু ইসহাকের লেখা এই উপন্যাসটি সফল বলা চলে। আর জয়গুন হয়ে ওঠে বাংলা সাহিত্যের এক প্রথা ভাঙা অপরাজেয় নারী চরিত্র।

আবু ইসহাকজয়গুননারীসূর্য দীঘল বাড়ি