বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬
বিশ্লেষণ

ভারত মহাসাগরে সন্তানকে আঁকড়ে ছুটছে এক মা ডলফিন

post-1c2f82f734-c0113799-1024×635

ভারত মহাসাগরে ফ্র্যাগল (Fraggle) নামের এক শোকাহত মা ডলফিন তার মৃত শাবককে বহন করে চলেছে ছয় দিন ধরে।

অস্ট্রেলিয়ার সংরক্ষণবিষয়ক প্রতিষ্ঠান Geographe Marine Research-এর ড্রোন এই শবযাত্রার ফুটেজ ধারণ করে। দেখা যায়, ফ্র্যাগল তার মাত্র দুই সপ্তাহ বয়সী নবজাতক শাবকটিকে সঙ্গে নিয়ে সাঁতার কাটছে। মৃত সন্তান ছাড়া আর কোনোদিকে নজর নেই তার। মনে হতে পারে কোনো এক ভ্রান্ত আশায় সে মনপ্রাণ উজাড় করে সাঁতার কাটছে। সে হয়তো জানেও না সন্তানকে আর ফিরে পাবে না । হয়তো আর কিছুকাল পর তার ছোট্ট সন্তানটির মরদেহে পচন ধরবে।

তবে শবযাত্রার এমন ছবি এটাই প্রথম নয়। তিমি ও ডলফিন তাদের মৃত শাবককে পানির ওপর ভাসিয়ে বহন করে এবং এ সময় তাদের পাশে প্রায়ই অন্য পূর্ণবয়স্ক সদস্যদেরও থাকতে দেখা যায় বলে সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন।

জার্নাল অব ম্যামালজি-তে প্রকাশিত Reggente ও সহকর্মীদের (২০১৬) এক গবেষণায় সাতটি তিমি ও ডলফিন প্রজাতির মধ্যে মৃত শাবক ও অল্পবয়সী সদস্যকে বহন করার আচরণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

Advertisements

ওই গবেষণায় বিশ্বের তিনটি মহাসাগরের ১৪টি ঘটনা তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করেন গবেষকেরা। সেবারই প্রথম এসব প্রজাতির মধ্যে শোক প্রকাশের আচরণের প্রমাণ নথিভুক্ত হয়। বিশাল তিমি থেকে শুরু করে ছোট স্পিনার ডলফিন পর্যন্ত বিভিন্ন প্রজাতিতে এ আচরণ দেখা যায় ওতে।

গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত প্রজাতিগুলো ছিল, ইন্দো-প্যাসিফিক বটলনোজ ডলফিন (Tursiops aduncus), স্পিনার ডলফিন (Stenella longirostris),

কিলার হোয়েল বা অরকা (Orcinus orca), অস্ট্রেলিয়ান হাম্পব্যাক ডলফিন (Sousa sahulensis), স্পার্ম তিমি (Physeter macrocephalus), রিসোর ডলফিন (Grampus griseus) ও শর্ট-ফিনড পাইলট তিমি (Globicephala macrorhynchus)।

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার কলেজ অব উইলিয়াম অ্যান্ড মেরি-এর নৃবিজ্ঞানের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং How Animals Grieve বইয়ের লেখক বারবারা কিং প্রাণীদের শোককে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে, “স্বাভাবিক জীবনাচরণে ব্যাঘাত ঘটার সঙ্গে যখন গভীর মানসিক কষ্ট যুক্ত হয়, তখনই প্রাণীরা শোক করে।”

গবেষণার সহলেখক এবং ইতালির মিলান-বিকোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী মেলিসা রেজেন্তে বলেন, “তারা শোক করছে। তারা যন্ত্রণা ও মানসিক চাপে আছে। তারা বুঝতে পারছে, কিছু একটা ঘটেছে, যা স্বাভাবিক নয় মোটেও।”

গবেষণায় আরও দেখা যায়, মা তিমিরা কখনও মৃত শাবককে মুখে ধরে রাখে, কখনও পানির মধ্যে ঠেলে নিয়ে যায়, আবার কখনও পাখনা দিয়ে বারবার স্পর্শ করে। অনেক ক্ষেত্রে মৃতদেহে পচন অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে গিয়েছিল, যা ইঙ্গিত করে যে শাবকটিকে দীর্ঘ সময় ধরে বহন করা হয়েছিল।

শোকের সময় ডলফিন যা করে

একটি ঘটনায় উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে শর্ট-ফিনড পাইলট তিমির একটি দল একটি পূর্ণবয়স্ক তিমি ও তার মৃত শাবককে ঘিরে বৃত্ত তৈরি করেছিল।

আরেকটি ঘটনায় লোহিত সাগরে একটি স্পিনার ডলফিন একটি মৃত অল্পবয়সী ডলফিনকে একটি নৌকার দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। নৌকায় থাকা গবেষকেরা মৃতদেহটি তুলে নেওয়ার পর আশপাশের সব ডলফিন নৌকাটিকে ঘিরে কয়েকবার চক্কর দিয়ে সরে যায়।

বারবারা কিং বলেন, এসব ঘটনা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে সামুদ্রিক স্তন্যপায়ীরা তাদের মৃত সঙ্গীর জন্য শোক প্রকাশ করে। তবে তিনি এটাও স্বীকার করেন, কিছু ক্ষেত্রে এ আচরণ কৌতূহল, অনুসন্ধিৎসা বা পরিচর্যার প্রবৃত্তির প্রকাশও হতে পারে।

তবু তাঁর ভাষায়, “মৃত শাবককে ভাসিয়ে রাখতে যে পরিমাণ শক্তি তারা ব্যয় করে, বারবার দেহটি স্পর্শ করে এবং শোকাহত সদস্যটিকে ঘিরে সামাজিকভাবে একসঙ্গে সাঁতার কাটে, সেসব আচরণে তাদের শোকের প্রকাশ অস্বীকার করার উপায় নেই।”

শোকের এই সময়ে তারা মুখে কিছু তোলে না, বন্ধ রাখে যোগাযোগ।

লোহিত সাগরে গবেষকেরা একটি ইন্দো-প্যাসিফিক বটলনোজ ডলফিনকে একটি ছোট ডলফিনের পচে যাওয়া মৃতদেহ পানির মধ্যে ঠেলে নিয়ে যেতে দেখেন।

গবেষকেরা মৃতদেহটি দড়ি দিয়ে বেঁধে তীরে নেওয়া শুরু করলে পূর্ণবয়স্ক ডলফিনটি তাদের পাশে পাশে সাঁতার কাটতে থাকে এবং মাঝেমধ্যে মৃতদেহটি স্পর্শ করছিল। বিপজ্জনক অগভীর পানিতে পৌঁছানোর পরই সেটি ফিরে যায়। মৃতদেহটি সরিয়ে নেওয়ার পরও ডলফিনটি দীর্ঘ সময় তীরের কাছাকাছি অবস্থান করেছিল।

দুটি ডলফিনের সম্পর্ক নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও মেলিসা রেজেন্তের ধারণা, তারা সম্ভবত মা ও শাবক অথবা ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছিল।

কিছু ক্ষেত্রে গবেষকেরা সম্পর্ক সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হতে পেরেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের সান হুয়ান দ্বীপের কাছে L72 নামে পরিচিত একটি স্ত্রী কিলার হোয়েলকে মুখে করে একটি মৃত নবজাতক শাবক বহন করতে দেখা যায়। তার শরীরে সদ্য সন্তান জন্ম দেওয়ার লক্ষণও ছিল।

গবেষণার সহলেখক রবিন বেয়ার্ড বলেন, “সে পুরো সময়টাতেই মৃত শাবকটিকে পানির ওপর ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল। কখনও সেটিকে মাথার ওপর ভারসাম্য রেখে বহন করছিল।”

কিলার হোয়েলের মা ও শাবক সাধারণত সারাজীবন একসঙ্গেই থাকে। বেয়ার্ডের মতে, যখন তাদের একজন মারা যায়, তখন বেঁচে থাকা সদস্যটি “আপনি বা আমি প্রিয়জন হারালে যেমন অনুভূতির মধ্য দিয়ে যাই, তেমনই এক ধরনের আবেগের সময় অতিক্রম করে।”

গবেষকেরা বলেন, “এই গবেষণা আরও দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করে যে দীর্ঘজীবী এবং অত্যন্ত সামাজিক স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে মৃত শাবকের জন্য পূর্ণবয়স্ক সদস্যদের শোক প্রকাশ একটি সাধারণ এবং বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত আচরণ।”

এর আগে ফ্র্যাগল তার আরও চারটি শাবক হারিয়েছিল।

শোকের এই সময়ে অন্য কয়েকটি ডলফিনকেও ফ্র্যাগলের পাশে থাকতে দেখা গেছে।

গবেষকেরা এর আগেও ডলফিন ও তিমির মধ্যে এমন শোকের আচরণ নথিভুক্ত করেছেন, যেখানে তারা নিজেদের মৃত শাবকের দেহ দীর্ঘ সময় ধরে বহন করেছে।

Advertisements
ডলফিনভারত মহাসাগরসন্তান