হামের চিকিৎসার ব্যয়ভারে অভিভাবকেরা দিশেহারা

সারা দেশে হামের সংক্রমণ বাড়ায় হাসপাতালে বাড়ছে শিশু রোগীর চাপ। হামে আক্রান্ত শিশুর অভিভাবকেরা খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসায় খরচ কম। তবে যে রোগীকে নিয়ে একাধিক হাসপাতাল ঘুরতে হয়, সেই পরিবারের খরচ অনেক বেড়ে যায়। বেসরকারি হাসপাতালে খরচ আরও বেশি। বেশির ভাগ ওষুধ, স্যালাইন ও সিরিঞ্জ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালে সব ওষুধের সরবরাহ থাকে না। বাইরে থেকে কিনতে হয়। রোগের পরীক্ষা করাতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে নিতে যাতায়াত খরচ যুক্ত হয়। হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের খাবার ও নানা কিছু কেনার পেছনে ব্যয় করতে হয়। সব মিলিয়ে স্বল্প আয় ও দরিদ্র পরিবারের জন্য খরচের পরিমাণ অনেক বেশি। এরপরেও কোন নিশ্চয়তা থাকছে না, অনেককেই ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে।
হামের চিকিৎসায় গড় খরচ কত, সে বিষয়ে কোনো গবেষণার খোঁজ পাওয়া যায়নি। করোনা চিকিৎসার খরচ কত, তা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ২০২২ সালের একটি গবেষণায় উঠে এসেছিল। টিআইবি বলেছিল, বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে একজন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীকে গড়ে সাড়ে চার লাখ টাকার বেশি ব্যয় করতে হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালে এই ব্যয়ের পরিমাণ গড়ে প্রায় ৩৬ হাজার টাকা।
দেশে করোনা, ডেঙ্গু, হাম—একটার পর একটা রোগ লেগেই আছে। বর্তমানে হামের যে চিকিৎসা, তা জেলা শহর আর ঢাকার হাসপাতালের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), বিশেষ করে পিআইসিইউ সেবা লাগলে তখন পরিস্থিতি একটু বেশি জটিল হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে গতকাল বুধবার (১৫ এপ্রিল) সকাল আটটা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামে ৩২টি এবং উপসর্গ নিয়ে ১৬৬ শিশুর মৃত্যুর কথা জানিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, শেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হামের উপসর্গ দেখা গেছে ১ হাজার ৩২ জনের মধ্যে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬৬৬ জন।
১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে আসা ১৯ হাজার ১৬১ জনের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১২ হাজার ৩১৮ জন। তাদের মধ্যে ২ হাজার ৯৭৩ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। আর সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরেছে ৯ হাজার ৭৭২ জন। বিগত কয়েক দিনে শিশু হাসপাতালে হামে আক্রান্ত ১০ জন শিশুর অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা এসেছেন জামালপুর, ফরিদপুর, ঢাকার খিলক্ষেত, মানিকগঞ্জ, কুষ্টিয়া, গাজীপুর, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ভৈরব থেকে। খরচের বিষয়ে সব অভিভাবকের প্রায় একই ধরনের অভিজ্ঞতা। যেসব শিশুর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়, তাদের পরিবারের খরচ অনেক বেশি হয়।
২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে সরকারের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট স্বাস্থ্য বা চিকিৎসা খাতে ব্যক্তির ব্যয় বৃদ্ধির হিসাব জানিয়েছিল ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস ১৯৯৭-২০২০’ শিরোনামের এক প্রতিবেদনে। এতে উল্লেখ করা হয়, স্বাস্থ্য খাতে বছরে ব্যয় যদি হয় ১০০ টাকা, সরকার খরচ করে ২৩ টাকা। আর ব্যক্তি নিজে খরচ করে ৬৯ টাকা। ব্যক্তির এই খরচ বছর বছর বাড়ছে। এতে অনেকেই বিপর্যয়ের মুখে পড়ছেন। অনেক পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, হামে চিকিৎসায় যে খরচ হচ্ছে, তা আর্থিক অবস্থা যা-ই থাকুক, পরিবারগুলোর জন্য অসহনীয় হয়ে যাচ্ছে। পরিবারগুলো এক হাসপাতালে চিকিৎসা পাচ্ছে না, আরেক হাসপাতালে দৌড়াতে হচ্ছে। অন্য হাসপাতালে পিআইসিইউ পাবে তার নিশ্চয়তা নেই। অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিয়ে সিন্ডিকেট কাজ করছে। এর মধ্যে রোগীর অবস্থা খারাপ হচ্ছে।



