ডিম্বাশয় ক্যান্সারের নতুন ওষুধ, বাড়ছে নারীদের আয়ু

দীর্ঘদিন ধরে কঠিন ধরনের ডিম্বাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত নারীদের জন্য নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে একটি আধুনিক টার্গেটেড থেরাপি—মিরভেটুক্সিম্যাব সরাভটানসিন। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ওষুধটি রোগীর বেঁচে থাকার সময় বাড়ানোর পাশাপাশি রোগের অগ্রগতি ধীর করে, টিউমার সঙ্কুচিত করে এবং প্রচলিত কেমোথেরাপির তুলনায় জীবনমানও উন্নত করে।
দীর্ঘদিনের সীমিত চিকিৎসার পরিবর্তন
প্লাটিনাম-রেজিস্ট্যান্ট ডিম্বাশয়ের ক্যানসার—যেখানে স্ট্যান্ডার্ড প্লাটিনাম-ভিত্তিক কেমোথেরাপি আর কাজ করে না—সেখানে চিকিৎসার বিকল্প এতদিন ছিল খুবই সীমিত এবং রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও কম ছিল।
এমন পরিস্থিতিতে এই নতুন ওষুধটি ক্যানসার চিকিৎসায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসসহ বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে নির্দিষ্ট রোগীদের জন্য এর ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে।
কীভাবে কাজ করে এই ওষুধ?
মিরভেটুক্সিম্যাব সরাভটানসিন একটি অ্যান্টিবডি-ড্রাগ কনজুগেট শ্রেণির ওষুধ। এটি ক্যানসার কোষকে নির্দিষ্টভাবে লক্ষ্য করে কাজ করে।
ওষুধটি ক্যানসার কোষের উপর থাকা ফোলেট রিসেপ্টর-আলফা প্রোটিনকে শনাক্ত করে সেখানে যুক্ত হয় এবং সরাসরি ক্যানসার কোষের ভেতরে শক্তিশালী অ্যান্টি-ক্যানসার উপাদান পৌঁছে দেয়। এতে সুস্থ কোষের ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম হয়।
মিরাসল ট্রায়ালের গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল
ফেজ-৩ মিরাসল ট্রায়ালে ৪৫০-এর বেশি রোগীর ওপর গবেষণা করা হয়। এতে দেখা যায়, প্রচলিত কেমোথেরাপির তুলনায় এই নতুন চিকিৎসা উল্লেখযোগ্য উন্নতি আনতে সক্ষম।
গবেষণার ফলাফলে বলা হয়—
- গড় বেঁচে থাকার সময় বেড়ে প্রায় ১৬.৫ মাস, যেখানে কেমোথেরাপিতে ছিল প্রায় ১২.৮ মাস
- রোগের অগ্রগতি বিলম্বিত হয় ৫.৬ মাস পর্যন্ত, কেমোথেরাপিতে যা ছিল প্রায় ৪ মাস
- টিউমার সঙ্কুচিত হওয়ার হার বেশি
- মৃত্যুঝুঁকি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে যায়
- এই ফলাফলকে বিশেষজ্ঞরা চিকিৎসা পরিবর্তনকারী অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।1
জীবনমানেও উন্নতি
গবেষণায় অংশ নেওয়া রোগীরা জানিয়েছেন, এই চিকিৎসায় শুধু বেঁচে থাকার সময়ই নয়, দৈনন্দিন জীবনযাপন ও শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্যও তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল।
ক্লান্তি, শারীরিক অস্বস্তি ও অন্যান্য উপসর্গ কম হওয়ায় রোগীরা তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পেরেছেন।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
যেকোনো ক্যানসার চিকিৎসার মতো এই ওষুধেরও কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- বমি বমি ভাব
- ক্লান্তি
- দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হওয়া
- চোখে সমস্যা (কর্নিয়াল জটিলতা)
- তবে গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচলিত কেমোথেরাপির তুলনায় গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার হার কম। তবুও রোগীদের নিয়মিত চোখ পরীক্ষা প্রয়োজন।
- ভারতের মতো দেশের জন্য গুরুত্ব
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অগ্রগতি ভারতসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর প্রয়োগে এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে—যেমন খরচ, অনুমোদন এবং পরীক্ষার সুযোগ।
শুধুমাত্র সেই রোগীরাই এই চিকিৎসা থেকে উপকৃত হতে পারবেন যাদের টিউমারে এফআর আলফা প্রোটিনের উচ্চ মাত্রা রয়েছে। তাই আগে থেকে জিনগত পরীক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সাফল্য শুধু ডিম্বাশয়ের ক্যানসার নয়, ভবিষ্যতে অন্যান্য কঠিন ক্যানসারের চিকিৎসায়ও একই ধরনের টার্গেটেড থেরাপির পথ খুলে দিতে পারে।



