বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
বিবিধ

শিশুদের হাত-পা-মাথায় ক্যানুলা, কান্না থামছে না অভিভাবকদের

pic-018-5-0000

হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর সন্দেহজনক হামে মৃত্যু হয়েছে ১৩৮ জনের। বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে। এসব মৃত্যুর বেশির ভাগই ঢাকা বিভাগে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

ঠান্ডা, জ্বর, কাশিসহ ৯ মাস বয়সী তাসলিমাকে সপ্তাহখানেক আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থেকে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে এসেছেন মা সোনিয়া আক্তার। স্বামী প্রবাসে থাকায় একাই বাচ্চাকে নিয়ে হাসপাতালে লড়াই করছেন তিনি। বাচ্চার কান্না থামাতে গিয়ে নিজেই একটু পর পর ওড়না দিয়ে নিজের ভেজা চোখ-নাক মুছছিলেন এই মা।

তিনি বলেন, “আমার দুই বাচ্চা। বড়টা জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চিকিৎসা নিচ্ছে। আর এখানে আমি ওকে নিয়ে আছি। কিচ্ছু খেতে চায় না। ডাক্তার বলেছে, সুস্থ হতে আরও সময় লাগবে। বারবার মাথা থেকে ক্যানুলা ছিঁড়ে ফেলতে চায়। দুদিন আগে অনেক রক্ত বের হয়েছে। তাই ২৪ ঘণ্টা জেগে থাকতে হচ্ছে, যেন কোনোভাবেই ক্যানুলায় হাত না দেয়।”

নয় মাস বয়সী বাচ্চা মাহমুদুর রহমানের মাথাতেও ক্যানুলা লাগানো। খালার কোলে যন্ত্রণায় ছটফট করছে, কিছুতেই কান্না থামছে না তার। পাশেই ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে বসে আছে মা সামিয়া আক্তার। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “পাঁচ দিন আগে গোপালগঞ্জ থেকে এসেছি। ডাক্তার ভালো মন্দ কিছুই বলছে না। শুধু বলছে ধৈর্য ধরে আল্লাহকে ডাকতে। আমার একমাত্র কলিজার টুকরো। ওর কিছু হলে আমি সত্যি বাঁচবো না।”

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিশু হাসপাতালে হাম আক্রান্ত প্রায় সব শিশুর একই চিত্র। তাদের নিয়ে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছেন আত্মীয়-স্বজনেরা। একইসঙ্গে মনে ক্ষোভ চেপে চুপিসারে কান্না করছেন। হামের এই প্রাদুর্ভাব কেন বেড়েছে তা খতিয়ে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের হাম আক্রান্ত শিশুদের বিশেষায়িত ওয়ার্ডটিতে গিয়ে দেখা যায়, হাম আক্রান্ত শিশুদের কারও মাথায় ক্যানুলা লাগানো, কারো হাতে কারো বা পায়ে। মাথায় ক্যানুলা লাগানো শিশুদের একপাশের চুল কেটে ফেলা হয়েছে। যারা খেতে পারছে না তাদের নল দিয়ে খাওয়ানো হচ্ছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে ৪৪টি শয্যা রয়েছে। এই ওয়ার্ডের ভেতরেই আছে ১৬ সিটের একটি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)। মোট ৬০টি শয্যা হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য। তবে, কোনও শয্যাই খালি চোখে পড়েনি। একজন রোগী রিলিজ হওয়া মাত্রই সেই শয্যায় আরেকজন এসে ভর্তি হচ্ছেন।

Advertisements

বরিশাল থেকে ৮ দিন আগে ১৪ মাস বয়সী সামিউল ইসলামকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন তার মা। নাকে নল লাগানো। কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে সামিউলের মা বলেন, “অবস্থা শোচনীয়। অবস্থার কোনও উন্নতি হয়নি। সারা শরীরে ছোপ ছোপ লাল দাগ, কিছুতেই যাচ্ছে না। আমার চঞ্চল বাচ্চাটা অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। আল্লাহর কাছে নামাজ রোজা দান সদকা সব মেনেছি। বিনিময়ে আল্লাহ শুধু আমার বাচ্চাটারে সুস্থ করে দিক।”

বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে মশা ও তেলাপোকার যন্ত্রণা

শিশু হাসপাতালের বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে মশা ও তেলাপোকার যন্ত্রণা অতিষ্ঠ বলে অভিযোগ জানিয়েছেন হাম আক্রান্ত শিশুদের অভিভাবকেরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অভিভাবক বলেন, “রাতে মশা কামড়ায়। তার চেয়ে বেশি যন্ত্রণা দেয় তেলাপোকা। ছোট ছোট তেলাপোকার বাচ্চারা গায়ে উঠে যায়, খাবারে এসে পড়ে। সবকিছুর মধ্যে এটা একটা বাড়তি প্যারা।”

চিকিৎসাধীন শিশুদের বিষয়ে যা বলছেন চিকিৎসকরা

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুল হক বলেন, “হাম আক্রান্ত হওয়া বা হামের লক্ষণ নিয়ে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাসপাতালে রোগী আসছে। আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে হামের বিশেষ ওয়ার্ডে চিকিৎসা দিচ্ছি। হামের সংক্রমণ অনেকটা ছড়িয়েছে। হাম ছোঁয়াচে। জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এমন শিশুরা প্রতিনিয়ত হাসপাতালে ভর্তি হতে আসছে।”

হামের লক্ষণ দেখা দিলে হলে কী করণীয় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “হাম আক্রান্ত শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। তারা স্বাভাবিকের চেয়ে খানিকটা অস্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেয়। এ জন্য শিশুকে ভিটামিন এ ক্যাপসুল এবং তরল খাবার খাওয়ানোসহ চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে। হাম আক্রান্ত শিশুর সঙ্গে থাকা অভিভাবকদের অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।”

Advertisements