Skip to content

২৮শে জুন, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ১৪ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারী শিক্ষককে যৌন-হয়রানি


চার দেয়ালের ঘেরাটোপ ভেঙে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় সমানতালে কাজে যুক্ত হচ্ছেন নারীরা। প্রায়শই পত্রিকায় আশার গল্প আসে। নারীকে প্রতিনিধিত্ব করে যারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন এক অনন্য উচ্চতায়, তাদের খবর বিভিন্ন মাপের শিরোনামে প্রচার করা হয় গণমাধ্যমে। কিন্তু সেখানেও দুঃখের কথা আছে।

করোনা মহামারির সময়ে নারী নির্যাতনের হার বাড়তে শুরু করে। বাল্যবিবাহ, শিক্ষাক্ষেত্রে নারী শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া, পারিবারিকভাবে নানা সমস্যার মুখোমুখি হওয়া যেন পত্রিকার নিত্যদিনের খবর হয়ে ওঠে। যেখানে নারীর লড়াইয়ের প্রস্তুতকারী মঞ্চেই সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ভিত্তিগত বাধা-বিপত্তি, সেখানে স্বভাবতই নারীর কর্মক্ষেত্রে বাধা আসবে। গার্মেন্টস শিল্পে নারীকর্মীর প্রাধান্য কমতে শুরু করেছিল করোনাকালীন সময়ে। তবে সার্বিকভাবে নারীর কর্মক্ষেত্রের পরিসর বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু তাদের প্রতি নির্যাতন কিংবা নিপীড়নের মাত্রা কমেনি। তা যেন পেয়ে গেছে লুকিয়ে যাওয়ার গলিঘুপচি। ইংরেজিতে যাকে বলে, মাস্কিং।

শিক্ষাক্ষেত্র থেকে নারীদের ঝরে পড়ার কারণগুলোকে মোটাদাগে বিচার করতে গেলে আমরা হাতেগোনা কিছু কারণ খুঁজে পাবো। কিন্তু সমস্যাটি যেখানে আন্তর্জাতিক পরিসর পর্যন্ত বিস্তৃত, সেখানে সংকট দিনকে দিন বাড়ারই কথা।

কিন্তু সূক্ষ্ণভাবে বিচার করতে গেলে বাংলাদেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে এখনো মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ব্যবস্থা কিংবা অবকাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি এখনো মানসম্পন্ন শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ক্রমশ নারী শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষত প্রাথমিক স্তরেই আমরা বেশি নারী শিক্ষক দেখতে পাই। শিক্ষকতায় যেহেতু তেমন অর্থ কিংবা প্রাচুর্যের সম্ভাবনা নেই, সেহেতু উচ্চাকাঙ্ক্ষী পুরুষেরা শিক্ষকতায় আগ্রহী হয় না।

সেই চিত্র উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে যেন বারবার প্রতিফলিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যেকোনো বিভাগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ থাকে পুরুষ শিক্ষকদের অধীনে। ফলে উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে নারীকে বারবার হেনস্তার শিকার হতে হয়।

যেমনটা বলেছিলাম, উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে নারীকে মূলত যৌন-নিপীড়ন কিংবা ইভ টিজিং-এর শিকার হতে হয়। আর এই ধরনের ঘটনাগুলো এমন হয়ে থাকে যার ফলে উপযুক্ত প্রমাণ কিংবা সাক্ষ্যের মাধ্যমে নিজের প্রতি হয়ে ওঠা নির্যাতনের বিষয়ে মুখ ফুটে কিছু বলাও সম্ভব হয় না। সহজ ভাষায় প্রতিটি ঘটনা মাস্কিং হয়ে ওঠে।

নারীর প্রতি নির্যাতনের বিষয়ে সবসময় প্রগতিশীলরা কথা বলে এসেছেন। বিশেষত শিক্ষক সমাজে এ নিয়ে সবসময় কথা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অন্তত শিক্ষার্থীরাও বয়স অনুসারে পরিণতমনস্ক। নর-নারীর যৌন সৃজনশীলতার বিষয়েও তারা সতর্ক। এমন পরিবেশে নারীর কাজ করা আরও কঠিন হয়ে ওঠে কারণ নারীর প্রতি ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা রয়ে যায় অন্তরালে।

সেই বাধাবিঘ্নতা শুরু হয় একজন ছাত্রাবস্থায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রবস্থায় নারীকে এক ধরনের ইভটিজিংয়ের মুখোমুখি হতে হয়। অধিকাংশ সময়ে তার মেধার পরিচয় পরীক্ষার ফলে এলেও সবার চোখে তা অত্যধিক শিক্ষকের সঙ্গে দহরম মহরমের ফসল বলেই ধরে নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে তাই অনেক নারীই বিরূপ মন্তব্যের মুখোমুখি হয়ে ঝরে পড়েন।

তবুও এই বিরূপ পরিবেশ উতরে যদিওবা শিক্ষকতায় যোগ দেন, তখন তাকে আবার মুখোমুখি হতে হয় ইভটিজিংয়ের। ছাত্রাবস্থায় বিষয়টি যেমন ছিল, একদিকে সহপাঠীদের টিজিং, অন্যদিকে শিক্ষকদের। নারী শিক্ষকদের বেলায়ও তার পরিবর্তন হয় না। একদিনে সহকর্মীদের হয়রানি, অন্যদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।

এমনকি ছাত্ররাও তাদের শিক্ষিকাদের নিয়ে বাজে মন্তব্য করে থাকে। এই একটি ক্ষেত্রে অন্তত শিক্ষার্থীরা মানসিক পরিণতমনস্কতার পরিচয় দিতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষকদের নাম জড়িয়ে রাখা অনেক বাজে গুজবই মূলত শিক্ষার্থীদের কল্পনাপ্রবণতা থেকে উৎপন্ন। যখন বহু লোকের মুখে একই কথা বারবার প্রচারিত হতে থাকে, একসময় তা প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবেই গণ্য হতে থাকে।

সেই পরিস্থিতি যেন আরও বিরূপ আকৃতি নেয় নিজ বিভাগে। সব ছাত্রের সঙ্গে পরিচিত হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু সহকর্মী? নারীকে তার নিজ বিভাগে বিরূপ মন্তব্যের শিকার হতে হয়। বিশেষত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক সময় রাজনীতি জড়িয়ে থাকে। এই বীভৎস রাজনীতির ভেতরকার চিত্র দেখে অনেক সময় শিক্ষার্থীরাও গোটা শিক্ষক সমাজকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। আর সেই কাঠগড়ায় যেন নারী প্রধান আসামি হিসেবে বারবার দাঁড়িয়ে থাকে।

নিজ বিভাগের শিক্ষকদের মধ্যকার বিরূপ প্রতিক্রিয়া অনেক সময় ঈর্ষা ও নারীর মেধাকে অস্বীকার করার প্রবণতা থেকে আসে। ‘আরে ওই স্যারের মেয়ে’, ‘ওই স্যারের বউ’ থেকে শুরু করে ‘এই স্যারের সঙ্গে খাতির আছে’ এসব মন্তব্য খুবই সাধারণ। নারী সম্ভবত মেধার জোরে শিক্ষকতা করতে পারে না। তবে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়।

নারীর মেধার থাকলেও পুরুষের লোলুপতার কাছে তার মেধার বিসর্জন হয়। তখন তাকে মেধার স্বীকৃতি না পেয়ে নিজেকে বিসর্জন দিয়েই প্রবেশ করতে হয় এমন কর্মক্ষেত্রে। এতে তার সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় না। অথচ শিক্ষাক্ষেত্রে একজন শিক্ষক হিসেবে তাকে সবার আগে রাখার কথা। দুঃখের বিষয় হলো এ নিয়ে নারীর কিছু বলার নেই। এ যেন এক সাংস্কৃতিক ‘অপজাল’। নারী শিক্ষক সেই অপজালের যে কোণেই থাকুক, মাকড়শা ঠিকই এসে শিকার করবে।

কিন্তু সাংস্কৃতিক জালের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও তীব্র। নারীকে সর্বস্ব খুইয়ে বসতে হয়। একজন নারী শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত হলেও তার সামাজিক অবস্থান ও দায়িত্বের জায়গায় তেমন হেরফের হয় না। তাকে সন্তান প্রতিপালন করতে হয়, ঘর সামলাতে হয় ও নারীর স্বাভাবিক স্বাস্থ্যগত সমস্যার সঙ্গেও মোকাবিলা করতে হয়।

নারীকে ইভটিজিং করা হলে তার দুইটি ভিন্ন অবস্থানের সামঞ্জস্য ভেঙে যেতে শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন নারী শিক্ষককে সবচেয়ে বেশি ইভটিজিংয়ের শিকার হতে হয় বিভাগীয় প্রধানের কাছ থেকে। বিভাগীয় প্রধানের হাতে যেহেতু সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা, তাই তার সুযোগ গ্রহণের উপায় বেশি। অধিকাংশ সময় মিটিংয়ের নাম করে নারী শিক্ষক থেকে অনৈতিক সুযোগ লাভের চেষ্টা তাদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এর ফল ভয়ঙ্কর।

যেভাবেই বিচার করা হোক, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় নারীর কর্মক্ষেত্র হিসেবে আরও সংকীর্ণ। শিক্ষকতাকে নিয়ে আমাদের সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও শিক্ষককে সামাজিক মর্যাদার দিক থেকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাই নারীর পক্ষে সেই সামাজিক প্রতিষ্ঠার মুখোশ উন্মোচন করা কঠিন হয়ে ওঠে।

কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদধারী শিক্ষক বা কর্মকর্তা যেন এই সুযোগেরই অপেক্ষায় থাকেন। শিক্ষকতা পেশায় প্রথমেই শুরু হয় খণ্ডকালীন শিক্ষকতার সুযোগে। আর এই খণ্ডকালীন শিক্ষকতার বিষয়ে নির্দিষ্ট নীতিমালা কিংবা নারীর নিজের থেকে কিছু নিয়ম অনুসরণ করার পথও খোলা থাকে না। ফলে যে বিভাগে তিনি শিক্ষকতা করেন, সেখানে তাদের ঊর্ধ্বতন শিক্ষক বা কর্মকর্তারা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেন। নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেই তারা অফিসে বা শিক্ষাঙ্গনে নারী শিক্ষককে ডেকে নেন। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার দোহাই দিয়েই তারা এমনটা করেন।

তখন সেই নারীকে খণ্ডকালীন চাকরিকে স্থায়ী করার জন্যেই সেই সময়ে আসতে হয়। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তার সময়জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তোলাসহ নানা হেনস্তার শিকার হতে হয়। সেক্ষেত্রে অফিস আওয়ার শেষ হলে আবার জরুরি মিটিংয়ের বাহানা।

সেটা বহুবারই করা হয়। অফিস আওয়ার শেষ হতেই বিভাগীয় প্রধানের কক্ষে জরুরি মিটিংয়ের বাহানায় নারীকে টিজিং করার বিষয়টি নতুন কিছুই না। নারীকে প্রতিনিয়ত মানসিক নিপীড়নের মুখোমুখি হতে হয়। অস্বস্তিকর আলোচনার মাঝে অন্যপক্ষ থেকে আসে সহানুভূতির সুর। পারিবারিক অবস্থার আলোচনা থেকে শুধু নারীর অশান্তি বা অসন্তুষ্টি খোঁজার প্রচেষ্টা হয়। সেই প্রচেষ্টা থেকেই কুপ্রস্তাব দেওয়া। সেই ডাকে সাড়া না দিলে মুখোমুখি হতে হয় প্রাতিষ্ঠানিক সব ঝামেলার।

অফিস আওয়ার শেষ হওয়ার সময়েই যেন মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। নিভৃত থাকার সুযোগে গায়ে হাত দেওয়া থেকে শুরু করে যৌন-হয়রানিও করা হয়। তখন একজন নারীর হাতে একটিই উপায়, হয় কর্মস্থল ত্যাগ করা নাহয় নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া।

খণ্ডকালীন চাকরিকে স্থায়ী করার জন্যে নারী কি নিজের মেধাকে ব্যবহার করতে পারে? না। কারণ ঊর্ধ্বতন পুরুষ কর্মকর্তারা মেধার চেয়ে নারীর দেহকে বেশি মূল্য দিতে চায়। তবে সেটাও কি নিশ্চিত? অবশ্যই না। এই চিত্র আমাদের সামনে এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হতে পারছে না।

যেমনটা বলেছিলাম, নারীর জগৎ আরও বিস্তৃত ও ক্লান্তিজনক। তার সংসার আছে। তার কর্মক্ষেত্রের অবস্থানকে সংসার মেনে নিতে পারে না। প্রথমেই অবিশ্বাসের বীজ অঙ্কুরিত সেখানে। আর যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত বাতাসে সেই গুজবগুলো আসে তাই যেন সারের মতো সেই বীজে পুষ্টি প্রদান করে। আর সামান্য বীজ থেকে বিরাট গাছ ডালপালা মেলে।

নিজ কর্মক্ষেত্রে দৈহিক ও মানসিক যন্ত্রণা যেমন তাদের ভোগায়, সাংসারিক কলহ ও গৃহ নির্যাতন আরও ব্যাপকতর হয়। নারীর বিস্তৃত জগতের দুই দিক এবার হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। শেষ পর্যন্ত নারীকে বেছে নিতে হয় একাকিত্বের পথ।

বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া ও ইন্টারনেটের জন্যে যেন সবকিছুই আমাদের একদম সামনে। কিন্তু আসলেই কি এমন? একজন বিভাগীয় প্রধান তার সহকর্মীদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলবেন এমনটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মনের খেয়াল কী, তা বোঝা এতটা সহজ? ছবি তোলার ছলেই তারা নারীর গায়ে হাত দিতে পারেন। জড়িয়ে ধরেন। স্পর্শকাতর জায়গায় হাত রাখেন। সেই ছবি ফেসবুকে পোস্ট দেন। এতে ওই নারী শিক্ষকের সংসারে ভাঙন দিলে তারও সুযোগ বসরা নেন। সহানুভূতি সুরে কথা বলে লালসা চরিতার্থ করার সুযোগ নেন।

আমাদের দেশে অনেকেই বলেন ভার্সিটির শিক্ষক হয়ে তো সুখ নেই। কেন নেই? এর সূক্ষ্ম কারণটি মোটেও নারীর দোষ নয়। সাংস্কৃতিকভাবে যখন ইভটিজিং মাস্কিং হয়ে আসছে, তখন শিক্ষাক্ষেত্রে নারীর নিজ পায়ে দাঁড়ানো কঠিন হওয়াই স্বাভাবিক। সম্প্রতি মিটু আন্দোলন যেন নতুন করে সে বিষয়ে আলোকপাত করতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক ঘটনাও তা প্রতিভাত করে স্পষ্টভাবে।

সরকারের উচিত, শিক্ষাঙ্গনের প্রতি নজরদারি বাড়ানো। আর কর্তৃপক্ষের উচিত, প্রতিটি শ্রেণীকক্ষ, সেমিনার কক্ষ, বিভাগীয় প্রধানদের কক্ষ থেকে শুরু করে করোডোর পর্যন্ত সিসি-ক্যামেরা স্থাপন করা। তাহলেই এ ধরনের যৌন-হয়রানি বন্ধ করা সহজ হবে বলে মনে করি। আর মাধ্যমেই অসৎ শিক্ষক, বিভাগীয় প্রধানদের আইনের আওতায় এনে ব্যবস্থা নেওয়াও সহজ হবে।