Skip to content

২১শে ফেব্রুয়ারী, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | বুধবার | ৮ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

মহাকাশজয়ী ভারতীয় নারী বিজ্ঞানী: পোশাক বিতর্ক

ভারতবর্ষীয়দের চিন্তার দৈন্য এতটাই বেশি যে, তারা নারীদের যে-কোনো জয়-পরাজয়ের মধ্যেই পোশাককে মুখ্য গণ্য করে। পুরুষতান্ত্রিক এই মানসিকতা সমাজকে এতটা ভয়ঙ্কর ও বীভৎসভাবে ছেয়ে ফেলেছে যে, মানুষ নারীর যোগ্যতাকে মূল্যায়ন না করে তার পোশাককে প্রাধান্য দেয়। খুব আশ্চর্যের বিষয় হলো সম্প্রতি বিশ্বের বহু ধনী দেশকে পেছনে ফেলে চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণ করেছে ভারতীয় চন্দ্রযান-৩। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে চাঁদের দক্ষিণ মেরু স্পর্শ করেছে ইসরো। ভারতের সাফল্যে শুভেচ্ছাবার্তা ভেসে আসছে অন্য দেশ থেকেও। বলা বাহুল্য, এই সাফল্য একদিনের নয়। অনেক মেধা ও পরিশ্রমের ফসল। যার মধ্যে রয়েছেন ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার মহিয়সী বিজ্ঞানীরাও।

ইসরোর ১৬ হাজার কর্মীর মধ্যে ২৫ শতাংশ নারী। চন্দ্রযান-৩ অভিযানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন ৫৪ জন নারী বিজ্ঞানী। তারা প্রমাণ করেছেন, সব নারী কেবল রান্নায়ই ব্যস্ত থাকে না, অনেকেই মহাকাশ বিজ্ঞানের মতো জটিল বিষয়ে গবেষণায় জীবন উৎসর্গও করে। হোমি জাহাঙ্গির ভাবা, বিক্রম সারাভাই, এপিজে আবদুল কালামের মতোই ভারতগৌরব এই মহিয়সীরা। ৫৪ জন নারী বিজ্ঞানীর মধ্যে বিশেষভাবে নেতৃত্বে ছিলেন ৭ জন। বাঙালির জন্য গৌরবের হলো তাদের মধ্যে রয়েছেন এক বঙ্গললনাও।

আজও সমাজের বিকৃত রুচি, কদর্যতা এতটা বীভৎস যে, তারা এই নারীদের একটি ছবি ভাইরাল করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে প্রত্যেক নারীই শাড়ি পরিহিত। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের আজ্ঞাবহ দাসেরা এটাকেই কোট-আনকোট করছে। তাদের বিকৃত রুচির পরিচয় দিচ্ছে এই বলে যে, এই ৭ বিজ্ঞানী শাড়ি পরিহিত। কোনো ভালো কাজ করতে হলে উশৃংখল পোশাকের প্রয়োজন হয় না। এরূপ কিছু কথা! এখন কথা হলো, উশৃংখল পোশাক কী? কাকে বলে! আর শাড়ি পরিহিত বলেই কি এই নারীরা জয় করলেন চন্দ্রযান-৩-এর সাহায্য নিয়ে! আমাদের মস্তিষ্কে এসব সস্তা ও রুচিহীন কথাবার্তা আর কতকাল থাকলে?

মূলত চিন্তার দৈন্যের কারণেই এ জাতি এখন পেছনে পড়ে আছে৷ নারীর যে-কোনো জয়-পরাজয় ঘিরে থাকে তার পোশাক। কিন্তু এই টিপিকাল বাঙালি সমাজ বোঝে না পোশাক শুধু একটা আবরণ ছাড়া কিচ্ছু না। আমরা সমাজে বাস করি তাই পশুর মতো চলতে পারি না। তাই বলে শাড়ি, বোরখায় যে নারীরা পরবে, এটা কেমন ধারণা! কিছু পুরুষের দাসত্বে প্রাণ দেওয়া নারীদেরও এরূপ বিকৃত চিন্তা দেখে হতবাক হতে হয়! কী অসভ্য ও বর্বর চিন্তা-চেতনার অধিকারী এ সমাজ! যেখানে মেধা কাজে লাগিয়ে তারা সাফল্য নিয়ে এসেছে সেখানে সেই মেধাকে অবমূল্যায়ন করে তার পোশাক নিয়ে এত রুচিহীন কথা বলা কতটা যুক্তিসঙ্গত? কোন জঙ্গলে বাস করছে মানুষ?

 ভারতীয় নারী বিজ্ঞানীদের ছবি শেয়ার করে এই এক ক্যাপশন। সবাই শাড়ি পরিহিত। উশৃংখল পোশাক পরা লাগে না সাফল্য আনতে হলে! এই উশৃংখল-অসভ্য পোশাক বলতে এই কদর্য-বর্বরশ্রেণি কী বোঝায়? আর কেন আবারও নারীর সাফল্য পোশাকে আটকে থাকবে? মৌলীবাদী চিন্তা-চেতনা বললে ভুল হবে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রায় নিরানব্বই ভাগই এখন হীন মানসিকতার৷ তাদের রুচি এতটাই কদর্য যে, নারীর সাফল্য, জয়-পরাজয় সবই গণ্য হয় তার পোশাকে! পুরুষকে কে কতবার বলেছে তুমি লুঙ্গি, টি শার্ট, থ্রি কোয়াটায়, জোব্বা পরিধান করো না!

কোনো নারী কখনোই পুরুষকে আক্রমণ করে বলেননি? কিন্তু এই হতভাগ্য, নীচ, কদর্য, হীন মানসিকতা এবং পুরুষের আজ্ঞাবহ দাসী যারা, তারা নিজে নারী হয়েও অন্য নারীকে বিচার করে পোশাক দিয়ে। তারা ভাবে নারী জিন্স-টপস; সালোয়ার-কামিজ, পরলেই নারীর আত্মমর্যাদা, ব্যক্তিত্ব, মেধা-মনন বিকিয়ে যাবে। নারী অন্যের উপভোগ্য হবে! এসব প্রাচীন আমালের, বর্বর আমলের চিত্র আজও কিভাবে এদের মানসপটে ভেসে ওঠে! এসব হীন মানসিকতাসম্পন্ন মানুষদের জন্যই আজও তৃতীয় বিশ্ব ঠিক তৃতীয়ই থেকে গেলো! এদের কখনো প্রথম সারিতে আসার কোনোই লক্ষণ নেই! কারণ এরা নারীকে মেধা-যোগ্যতা-দক্ষতা দিয়ে মূল্যায়ন করে না। বিচার করে পোশাক দিয়ে।

একসময় মানুষ পোশাক ছাড়াই বেঁচেছে। সময়ের সঙ্গে পোশাক পরিধান না করলেও গাছের ছাল দিয়ে লজ্জা নিবারণ করেছে, একসময় পুরুষরা ধুতি-লুঙ্গি-গেঞ্জি পরেছে, আজ শার্ট-প্যান্ট, কোর্ট পরে, নারীরা শাড়ি-সালোয়ার, জিন্স-টপস পরে এগুলো সবই সময়ের সঙ্গে চাহিদা অনুযায়ী পাল্টায়। এটাই নিয়ম। কিন্তু যারা চিন্তার দৈন্য ঘোচাতে না পেরে শুধু পোশাকে আঁটকে থাকে তাদের সমাজে বাস করা উচিত নয়। এই বর্বর জন্তুরা নিজে মস্তিষ্কের বিকারে ভুগবে, অন্যেকেও টেনেহিঁচড়ে নামতে বাধ্য করবে! স্বাধীন রুচি, স্বাধীন মানুষ। ব্যক্তির ইচ্ছে-অভিরুচিকে প্রাধান্য না দিয়ে তাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রামণ করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

চিন্তার এই দীনতা, ভিখারী মনোভাব বন্ধ করুন। ইউরোপীয় দেশগুলো নিশ্চিয়ই বর্বর, অসভ্য নয়। তারা এত এগিয়ে গেছে। আর ভারতবর্ষের এই হীনতা-নীচুতার কারণেই তারা আঁটকে আছে পোশাকে। নারীকে অভিনন্দিত না করে, নারীর পোশাক নিয়ে ট্রলিংয়ে ব্যস্ত! তো এ জাতির মুখে ভাত জুটবে, বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে কিভাবে ভাবা যায়! চিন্তার প্রাগ্রসরতা যতদিন না বাড়বে, জাতি যতদিন নারীকে মানুষ না ভাবতে পারবে, ততদিন এ জাতির দুর্ভাগ্য ঘুচবে না।

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ