Skip to content

৪ঠা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ১৯শে আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

হাজার চুরাশির মা মহাশ্বেতা দেবী

সংকল্প করেছিলেন তিনি ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাঁচবেন। একুশ শতকের নানা পরিবর্তন দেখবেন নিজের চোখে। ১৯৯৬ সালে ঢাকায় তিনি যখন আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে এই কথা বলছিলেন, তখন চিলেকোঠার সেপাই সে-কথায় অবিশ্বাস করেননি। মুচকি হেসে বলেছিলেন, 'আপনি পারবেন। কিন্তু প্রকৃতির খেয়াল ঠিক কলমের ডগার মতো নিখুঁত চিত্র আঁকতে পারে না।' ২০১৬ সালের ২৮ জুলাই হাজার চুরাশির মা মৃত্যুবরণ করেন।

৯১ বছরের দীর্ঘ জীবনে বাংলা সাহিত্যকে ঠিক মায়ের মতোই বিলিয়ে দিয়েছেন অনেক কিছু। রেখে গেছেন এক স্বতন্ত্র ধারা। বাংলা সাহিত্যে মানিক এসেছেন- প্রান্তিক মানুষের কথা বলে গেছেন। কিন্তু মহাশ্বেতা দেবী রেখে গেছেন গণ-মানুষের কণ্ঠস্বর। লেখার বিষয়, ভাবনা, ভাষার বুনন, সেখানে জীবনের উপস্থাপনা ও রূপায়ণ, এমনকি পর্যবেক্ষণের মাঝে নিজ অভিজ্ঞতার মিশেল- যেন এক অদ্ভুত জগৎ মহাশ্বেতার লেখায়।

মহাশ্বেতা দেবীকে শুধু একজন সাহিত্যিক ভাবলে ভুল করা হবে। জল মাটি ও শস্যের গন্ধমাখা সাহিত্যের পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের জীবনের লড়াইয়ে সামিল হওয়ার গল্পও আছে। সামাজিক জীবনের কষাঘাতে জর্জরিত মর্যাদাহীনতার চিলেকোঠায় নিপতিত আদিবাসীদের নিয়ে তার দরদ এবং তাদের অধিকার আদায়ের জন্যে স্বর তোলার কাজটির জন্যে ভারতীয় ইতিহাসে তাঁর স্বাতন্ত্র্য প্রশংসাযোগ্য।

১৯২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি ঢাকার আরমানিটোলায় মামাবাড়িতে জন্ম। বাবা মণীশ ঘটক 'যুবনাশ্ব' ছদ্মনামে ছোটগল্প লিখতেন। মা ধরিত্রী দেবী নিজেও কবিতা লিখতেন। তার লেখার পরিমাণ খুব বেশি না হলেও পড়ার ক্ষেত্র বেশ বড় ছিল। পরিবার থেকেই মহাশ্বেতা তাই সাহিত্য আর সৃষ্টিশীলতার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। দিদিমা কিরণময়ীর রেখে যাওয়া পাঠাগারটিতে বড় হতে হতে তাঁর মানসভূমিতে যেন সোনালি ফসল ফলতে শুরু করে। দিদিমার ইতিহাসপ্রিয়তার ছোঁয়া মহাশ্বেতার মনোভূমিতেও লাঙলে কর্ষণ করেছিল। এই দিদিমাকেই দেখেছেন কবি গোবিন্দ দাসের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে এল সাহায্য নিতে। দেওয়ার মতো কিছু নেই দেখে দিদিমা হাতের একগাছি বালাই খুলে দিলেন।

শুধু তাই নয়, কবি অমিয় চক্রবর্তী যে আবার মহাশ্বেতার সম্পর্কে মামা হয়। বুদ্ধদেব বসুর আত্মজীবনী ঘাঁটলেই জানা যাবে, মহাশ্বেতার পরিবার কেমন সংস্কৃতিপাগল ছিল। মহাশ্বেতা ছিলেন সবার বড় সন্তান। এরপর তাঁর আরো আটটি ভাই-বোন হবে। প্রতিজনই একেক গুণের অধিকারী। তার মাঝে বড় বোন পেয়েছিলেন খাঁটি সাহিত্যিকের মন।

মাত্র চার বছর বয়সেই মহাশ্বেতার শিক্ষা-জীবন শুরু। বাবা সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর প্রায়ই স্কুল বদলি হতে হতো। মাত্র দশ বছর বয়সেই চলে আসেন শান্তিনিকেতনে। মা-বাবাকে ছেড়ে সেবার আসার সময় ভীষণ কেঁদেছিলেন। কে জানত আরো তিন বছর পর কলকাতায় আসার সময় আরো কান্না করতে হবে? শান্তিনিকেতনে কবিগুরুর সান্নিধ্য পাওয়াটা সম্ভবত মহাশ্বেতার জীবনের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সপ্তম শ্রেণিতে খোদ কবিগুরুই নিয়েছিলেন বাংলার ক্ল্যাস।

তেরো বছর বয়সেই তাঁকে আবার বাড়ি ফিরতে হয়। মা অসুস্থ। ভাই-বোনদের দেখভাল তো করতে হবে। সে কাজটিতেও তাঁর ভুলচুক নেই। এ-সময় অবশ্য পড়ালেখা আর সাহিত্য পড়া চালিয়ে গেলেন। তখন কাকা ঋত্বিক ঘটক তাঁর সমবয়সী। তাঁরই সাথে থেকে থেকে ইংরেজিটার দিকে একটু ঝোঁক বাড়ল। সময়টাও ভালো না। ভারতে ব্রিটিশ-রাজের দৌরাত্ম আর বিশ্বসাহিত্যের বিখ্যাত বই- এ-সব কিছুর সাথেই প্রত্যক্ষ সংযোগ তাঁর রাজনৈতিক জ্ঞানকেও কিছুটা সচল করে তুলছে।

১৯৮২-এ ম্যাট্রিক পাস করেই আশুতোষ কলেজে ভর্তি হলেন। তখন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হননি। তবে পার্টির কাজের সাথে যুক্ত হন। পার্টির কাজ, সংবাদপত্র বিক্রি, পাঠচক্র- সবই করতেন। মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ঠিকই ছিল। তাই কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি আস্থাও গড়ে উঠেছিল। দলীয় রাজনীতি বা ছকবাঁধা বিপ্লবে তাঁর আস্থা ছিল না। তাই যোগ দেননি কোনো দলে।

এ-সময় তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই জীবনকে নিয়েছিলেন। ভাইদের সাথে পাল্লা দিয়ে গাছে চড়া, সাঁতার কাটার মতো কাজে তাঁর দোনামোনা ছিল না। এমনকি নিজেকে অবলা বানিয়ে রাখাটাও অভিপ্রেত ছিল না। তাই হাজরা পার্কে রোজ লাঠিখেলা আর ছোরাখেলা শিখতেন। মা আর বাবার পূর্ণ সমর্থন ছিল বলে মহাশ্বেতা জীবনের প্রতিটি বাঁকেই অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। বাধার জিঞ্জির তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেনি।

আর্তের সেবায় সারা জীবনই কাজ করেছেন। আবার গৃহকর্মে উদাসীন হননি কখনো। বাড়িতেই জামাকাপড়, মশারি নিজ হাতে সেলাই করতেন। এমনকি ১৯৮২ সালে সহপাঠিনীদের সহযোগীতায় 'চিত্ররেখা' নামে কাপড় ছাপানোর একটি দোকান খোলেন। স্বনির্ভরতা অর্জন করার উদ্দেশ্যেই খোলা। এই ব্যবসা করে অনেক দিন চলেছেন- লেখাপড়া চালিয়েছেন।

দ্বিতীয় বার যখন ত্তিনি শান্তিনিকেতনে যান, তখন গিয়েছিলেন বিএ পড়ার জন্যে। ভাগ্যিস ছোট বোন মিতুল সংসারের দায়িত্ব নিয়েছিল। তবে এবার মহাশ্বেতা যেন অন্য রকম। জীবনের ক্রূরতা আর বাস্তবতা তাঁকে বদলে দিয়েছে। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই প্রতিবাদ সংগ্রামে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ। লেখালেখিটাও আচমকা শুরু। দেশ পত্রিকার সাগরময় ঘোষ গল্প লেখার অনুরোধ করলেন। মহাশ্বেতা লিখলেন। সেবার দেশ-পত্রিকায় তাঁর তিনটি গল্প প্রকাশিত হয়। একেকটি গল্পের জন্য দশ টাকা করে পারিশ্রমিক পান। আর সেখান থেকেই লেখালেখিকে নিজের পেশা হিসেবে ধরে নেন হাজার চুরাশির মা। 

১৯৪৭ সালেই নাট্যকার ও সাহিত্যিক বিজন ভট্টাচার্যের সাথে পারিবারিকভাবে তাঁর বিয়ে হয়। তবে স্বামী বলতে গেলে বেকার। আরেক অভাব ও অনটনের মাঝে মহাশ্বেতা। একেক সময় একেক উপায়ে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা। স্বামী মাঝে একবার একটি চাকরি বাগিয়ে নিলেও কমুনিস্ট হওয়ার অপরাধে সে চাকরিও গেল। তবে আইনবিদ অতুল গুপ্তের চেষ্টায় অস্থায়ীভাবে চাকরিতে পুনর্বহাল হলেন। ভাগ্যের বিড়ম্বনা। ড্রয়ারে মার্কস ও লেনিনের বই পাওয়ায় আবার চাকরি গেল। 

সংসারের এই হালে একমাত্র সন্তান নবারুণ কিছুটা আশা দেখায়। তবে বিজনের সাথে বিবাহ-বিচ্ছেদের পর নবারুণকে ফেলে আসতে হয়। এই মানসিক বিপর্যয় খুব কঠিন ছিল মহাশ্বেতার জন্য। অতিমাত্রায় ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে পৃথিবীকে বিদায় জানাতেও চান। অবাক হলেন? আর ইনিই কিনা ২০২৫ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে চেয়েছেন একসময়? হ্যাঁ, ডাক্তারদের চেষ্টায় সে যাত্রা বেঁচে গেলেন। দ্বিতীয় বার অসিত গুপ্তকে বিয়ে করেও শান্তি মেলেনি। আবার বিবাহ-বিচ্ছেদের পর একাকী নিঃসঙ্গ এক জীবন-যাপনের শুরু তাঁর।  

বাবার মৃত্যুর পর বর্তিকা পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি যেন আবার লড়াইয়ের সুযোগ পেলেন। ব্রাত্য শ্রেণির মুখপত্র হয়ে উঠল বর্তিকা। 'ঝাঁসীর রাণী" লেখার পরই তার খ্যাতি শুরু। ইতিহাসকে উপজীব্য করে একের পর এক লেখেন অমৃত সঞ্চয়ন, আঁধার মানিক। আঠারো ও উনিশ শতকের বিদ্রোহের সাথে সাথে সাধারণ মানুষের জীবনকে এক বিন্দুতে নিয়ে আসার মতো সাহিত্যিক খুব বেশি নেই। সামাজিক বিষয় নিয়েও লিখেছেন। তবে তাঁকে সব চেয়ে বেশি খ্যাতি এনে দেয় কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু, হাজার চুরাশির মা ও অরণ্যের অধিকার।

মানুষের প্রতি ভালোবাসা তো আছেই। তবে পাশাপাশি বহু জনকল্যাণমূলক কাজেই নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিলেন। সুবিধাবঞ্চিত প্রান্তিক মানুষদের লেখায় তুলে এনেছেন। প্রতিষ্ঠা করেন 'আদিম জাতি ঐক্য পরিষদ'।

অন্যায়ের ক্ষেত্রে তাঁর রাগ ছিল সূর্যের তেজের মতো। মানুষের কথা তিনি বারবার লিখেছেন। শিল্প নাকি মানবিকতা? পরেরটিকেই জোর দিয়েছেন বেশি। বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার তিনি লেখার জন্যই পেয়েছেন। তার মাঝে সমগ্র সাহিত্য রচনার জন্য ফরাসি সরকার কর্তৃক 'অফিসার অব দি অর্ডার অব আর্টস অ্যান্ড লেটারস' সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। এ-ছাড়া, সম্মানসূচক ডি লিট ডিগ্রিও পেয়েছেন একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ভারত সরকারের পদ্মশ্রী পুরস্কারও পেয়েছেন একবার।

বাংলা সাহিত্যে হাজার চুরাশির মায়ের মৃত্যু ২০১৬-তে অনেক পাঠককেই স্তব্ধ করে দিয়েছিল। তাঁর জীবন যে বর্ণিল এবং সংগ্রামমুখর- সেই ইতিহাসে ধারা থেকেই হয়তো অনেকে মেনেই নিতে পারেননি এই মৃত্যু। সবাই তো বিশ্বাস করেই ফেলেছিল- ২০২৫ পর্যন্ত মহাশ্বেতা দেবী ঠিকই বেঁচে থাকবেন।