বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
বিবিধ

দেশজুড়ে শুরু হচ্ছে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণ অভিযান

Gk2vnlXMF4OhovXcQ94IPAR1KLwvxfrO4MBNS9ro

দেশে বনাঞ্চল কমছে ধারাবাহিকভাবে, কমছে বৃক্ষ–আচ্ছাদিত এলাকা। গত এক দশকে কমেছে প্রায় সাড়ে ১১ কোটি গাছ। ক্ষয়িষ্ণু বনাঞ্চলে জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনতে নির্বাচনী ইশতেহারে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের অঙ্গীকার করে বিএনপি। ভোটে জিতে ক্ষমতায় যাওয়ার পর এখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এগোচ্ছে তারা।

দেশের বনভূমিতে দেশীয় প্রজাতির জায়গা দখল করে বিস্তার ঘটে বিদেশি আগ্রাসী গাছের—বিশেষ করে আকাশমণি (অ্যাকাশিয়া) ও ইউক্যালিপটাসের। এই প্রেক্ষাপটে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। আগামী জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া এই কর্মসূচিতে বিদেশি প্রজাতির বদলে দ্রুতবর্ধনশীল দেশীয় গাছ লাগানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। ২০১৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস পরিচালিত ‘ইউক্যালিপটাস ডিলেমা ইন বাংলাদেশ’ গবেষণায় বলা হয়, ১৯৩০ সালে সিলেটের চা–বাগানে সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য প্রথম ইউক্যালিপটাস আনা হয়। সেখান থেকে তা ধীরে ধীরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে আশির দশকে ৩৪ প্রজাতির ইউক্যালিপটাস ও ১০ প্রজাতির আকাশমণি এনে আবারও পরীক্ষামূলক বনায়ন করা হয়। এর মধ্যে তিন প্রজাতির আকাশমণি ও তিন প্রজাতির ইউক্যালিপটাস বাংলাদেশে রোপণের জন্য উপযুক্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

উদ্ভিদবিদ ও গবেষকেরা বলছেন, ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি দ্রুত বাড়ে এবং কাঠের চাহিদা মেটায় ঠিকই কিন্তু এগুলো প্রচুর পানি শোষণ করে মাটিকে রুক্ষ করে তোলে। গরু-ছাগল এসব গাছের পাতা খায় না, এমনকি এসব গাছে পাখিরাও বাসা বাঁধে না।

এ প্রেক্ষাপটে পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের স্বার্থে এবং জাতীয়-আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পূরণে গত বছরের ১৫ মে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি গাছের চারা তৈরি, রোপণ ও কেনাবেচা নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রজ্ঞাপনে আগ্রাসী প্রজাতির পরিবর্তে দেশি প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করে বনায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

২০১৫ সালে জাতীয় বন জরিপে বন আচ্ছাদনের পরিমাণ ছিল ১২ দশমিক ৭৬ শতাংশ, সেটি এখন কিছুটা হ্রাস পেয়ে ১২ দশমিক ১১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বন জরিপে দেশে বনভূমি আছে ১৭ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর। আগের বন জরিপে যেটির পরিমাণ ১৮ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর।

বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে বিদেশি প্রজাতির পরিবর্তে দেশীয় দ্রুতবর্ধনশীল মেহগনি, গামার, জারুল, জীবন, কদম, আগর ও বাঁশগাছ রোপণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বন অধিদপ্তর। এ ছাড়া অগ্রাধিকার পাচ্ছে শিলকড়ই, জাম, মহুয়া, বহেরা, অর্জুন, নিম, হরীতকী, কাঁঠাল ও চালতা।

Advertisements

আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে এক লাখ নিমগাছের চারা রোপণের পরিকল্পনা আছে সরকারের। উপকূলীয় এলাকায় লাগানো হবে ঝাউ। আর সুন্দরবন এলাকায় রোপণ করা হবে সুন্দরী, গেওয়া, বাইন ও গরানগাছ। বন অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে ছয়টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে উপকূলীয় বনায়ন, বন পুনরুদ্ধারে বনায়ন, নগর বনায়ন, কমিউনিটিভিত্তিক বনায়ন, বসতবাড়ি ও কৃষি বনায়ন এবং উৎপাদনমুখী বনায়ন।

সরকারের ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বন্য প্রাণী ও বনবিশেষজ্ঞ রেজা খান। তিনি বলেন, ‘দেশীয় প্রজাতির গাছ দিয়েই এই কর্মসূচির বাস্তবায়ন করা দরকার। একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, কাঠ উৎপাদনের জন্য এই বৃক্ষরোপণ করা হচ্ছে না। এর মূল উদ্দেশ্য পরিবেশ, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা। দেশীয় প্রজাতির গাছ ছাড়া সেই উদ্দেশ্য অর্জন সম্ভব নয়।’ এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এক জায়গায় অতিরিক্ত গাছ রোপণ করলে পানির ওপর চাপ পড়তে পারে। গাছের পানির চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে কৃষিজমির পানির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কোন অঞ্চলে গাছ কমে গেছে, সেই উপাত্ত সংগ্রহ করে গাছ রোপণ করতে হবে। এ জন্য মৃত্তিকাবিজ্ঞানী, উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও প্রাণিবিদদের সমন্বয়ে সরকারের একটি কমিটি গঠন করে কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করা উচিত।

Advertisements