বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬
এডিটরস পিক

ভয়নিচ পাণ্ডুলিপি: রহস্যময় বই যার ভাষা পড়তে পারেনি কেউ

images

ইতিহাসে এমন কিছু বই আছে, যেগুলো শুধু তথ্যের জন্য নয়, রহস্যের জন্যও বিখ্যাত। সেই তালিকার শীর্ষে রয়েছে ভয়নিচ পাণ্ডুলিপি। প্রায় ছয় শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারেনি—এই বইয়ে আসলে কী লেখা আছে। ভাষাবিদ, ইতিহাসবিদ, গণিতবিদ এমনকি গোয়েন্দা সংস্থার বিশেষজ্ঞরাও চেষ্টা করেছেন এর রহস্য ভেদ করতে। তবু বইটি এখনও রহস্যই রয়ে গেছে।

বইয়ের সন্ধান

১৯১২ সালে বই ব্যবসায়ী উইলফ্রিড ভয়নিচ ইতালির একটি পুরোনো সংগ্রহ থেকে একটি অদ্ভুত হাতে লেখা বই কিনে নেন। বইটি হাতে নিয়েই তিনি বিস্মিত হয়ে যান। কারণ এর বর্ণমালা তার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা। বহু ভাষায় পারদর্শী ভয়নিচ এমন অদ্ভুত অক্ষর আগে কখনো দেখেননি।

কৌতূহল থেকেই তিনি বইটি কিনে ফেলেন। পরে বাসায় গিয়ে বইটি পরীক্ষা করতে গিয়ে আরেকটি চমক পান। বইয়ের ভেতর থেকে একটি পুরোনো চিঠি বেরিয়ে আসে। সেই চিঠি থেকেই শুরু হয় ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় বইয়ের গল্প।

কী এই ভয়নিচ পাণ্ডুলিপি?

ভয়নিচ পাণ্ডুলিপি হলো মধ্যযুগের একটি হাতে লেখা বই। চামড়া দিয়ে বাঁধাই করা এই বইটির প্রায় ২৩৪টি পৃষ্ঠা রয়েছে। গবেষকদের মতে, মূল বইয়ের কিছু পৃষ্ঠা হয়তো হারিয়ে গেছে।বইটির সবচেয়ে বড় রহস্য এর ভাষা। এতে এমন এক ধরনের বর্ণমালা ব্যবহার করা হয়েছে যার সাথে পৃথিবীর পরিচিত কোনো ভাষার মিল পাওয়া যায়নি। আধুনিক কম্পিউটার বিশ্লেষণেও এর অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।আরও অবাক করা বিষয় হলো, পুরো পাণ্ডুলিপিতে প্রায় ১৭ হাজার অক্ষর বা শব্দচিহ্ন পাওয়া গেছে। অথচ কোনো জায়গায় লেখকের নাম বা স্বাক্ষর নেই।

কত পুরোনো ?

বইটির বয়স জানার জন্য বিজ্ঞানীরা কার্বন ডেটিং পদ্ধতি ব্যবহার করেন। পরীক্ষার ফল বলছে, বইটি সম্ভবত ১৪০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে লেখা হয়েছিল।অর্থাৎ এটি প্রায় ৬০০ বছরেরও বেশি পুরোনো একটি পাণ্ডুলিপি।

রহস্যময় চিঠির সূত্র

ভয়নিচ যে চিঠিটি পেয়েছিলেন সেটি লেখা হয়েছিল ১৬৬৫ সালে। চিঠির লেখক ছিলেন বিজ্ঞানী জোয়ানাস মার্সি, আর প্রাপক ছিলেন ইতালির বিখ্যাত গবেষক আথানাসিয়াস কার্চার।

চিঠিতে মার্সি অনুরোধ করেছিলেন, কার্চার যেন বইটির ভাষা বুঝে দেন। সেখানে আরও উল্লেখ ছিল যে বইটি একসময় হাবসবার্গের সম্রাট দ্বিতীয় রুডলফের সংগ্রহে ছিল। তিনি নাকি প্রায় ৬০০ ডুকাট দিয়ে বইটি কিনেছিলেন।তবে বইটি তার হাতে আসার আগের প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাস এখনো অস্পষ্ট।

কী আছে এই বইয়ে?

ভয়নিচ পাণ্ডুলিপির আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো এর ছবিগুলো। বইয়ের পাতায় হাতে আঁকা অসংখ্য অদ্ভুত ছবি দেখা যায়।

গবেষকরা ছবিগুলোকে সাধারণত কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন—

১।অজানা ভেষজ উদ্ভিদ
২।জ্যোতির্বিদ্যা ও নক্ষত্রের চিত্র
৩।রাশিচক্রের নকশা

৪।অদ্ভুত জীবজগতের ছবি

৫।চিকিৎসা বা শরীরবিজ্ঞান সম্পর্কিত চিত্র

৬।বিভিন্ন জ্যামিতিক নকশা

কিছু ছবিতে এমন উদ্ভিদ দেখা যায় যা পৃথিবীর কোনো পরিচিত উদ্ভিদের সাথে মেলে না। আবার কিছু পাতায় দেখা যায় বৃত্তাকার মহাজাগতিক নকশা।

নির্ভুল রহস্যময় লেখা

প্রাচীন পাণ্ডুলিপিতে সাধারণত অনেক জায়গায় কাটাকাটি বা সংশোধন দেখা যায়। কিন্তু ভয়নিচ পাণ্ডুলিপিতে এমন কোনো ভুলের চিহ্ন নেই।মনে হয় যেন লেখক একবারেই নিখুঁতভাবে পুরো বইটি লিখেছেন।

লেখক কে?

এই পাণ্ডুলিপির লেখক কে ছিলেন—এ নিয়েও নানা মত রয়েছে।

প্রথমদিকে উইলফ্রিড ভয়নিচ বিশ্বাস করতেন, বইটির লেখক হতে পারেন বিখ্যাত দার্শনিক রজার বেকন। কিন্তু পরে গবেষণায় দেখা যায় বইয়ের কাগজের ধরন বেকনের সময়ের সাথে মেলে না।এরপর বিভিন্ন গবেষক ভিন্ন ভিন্ন তত্ত্ব দিয়েছেন। কেউ মনে করেন এটি কোনো গোপন সাংকেতিক ভাষায় লেখা। আবার কেউ মনে করেন এটি কোনো চিকিৎসক বা রসায়নবিদের গোপন নোট।আরেকদল গবেষকের মতে, পুরো বইটি হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে রহস্য তৈরি করার জন্য বানানো হয়েছিল।

আধুনিক প্রযুক্তি

ভয়নিচ পাণ্ডুলিপি নিয়ে গবেষণা করেছেন বিশ্বের বহু ভাষাবিদ, গণিতবিদ ও ইতিহাসবিদ। এমনকি বিভিন্ন সময় FBI ও CIA–এর বিশেষজ্ঞরাও এর পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করেছেন।

রুশ গণিতবিদরাও একবার দাবি করেছিলেন যে বইটির কিছু অংশে ইউরোপীয় কয়েকটি ভাষার মিশ্রণ থাকতে পারে। তবে সেটিও পুরো রহস্য সমাধান করতে পারেনি।

এখন কোথায় আছে এই পাণ্ডুলিপি?

বর্তমানে ভয়নিচ পাণ্ডুলিপিটি যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইনেকি লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত রয়েছে। ২০০৪ সালে এর সম্পূর্ণ ডিজিটাল অনুলিপি প্রকাশ করা হয়, যাতে পৃথিবীর যে কেউ অনলাইনে বইটি দেখতে পারেন।

কখনো কি ভাঙবে এই রহস্য ?

ভয়নিচ পাণ্ডুলিপি আজও ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভাষাগত রহস্যগুলোর একটি। আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা হয়তো একদিন এর রহস্য উন্মোচন করবে।

সেদিন হয়তো জানা যাবে—এই অদ্ভুত পাণ্ডুলিপির পাতায় লুকিয়ে আছে কোনো বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, গোপন বার্তা, নাকি মানুষের কল্পনারই এক বিস্ময়কর সৃষ্টি।

ততদিন পর্যন্ত ভয়নিচ পাণ্ডুলিপি ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় বই হিসেবেই থেকে যাবে।

বইভয়নিচ পাণ্ডুলিপিরহস্য