আইসিইউতে ওষুধ প্রতিরোধী ছত্রাক ‘সুপারবাগ’-উদ্বেগজনক মনে করছে আইসিডিডিআর,বি

ঢাকার আইসিইউতে ছড়িয়ে পড়ছে ওষুধ-প্রতিরোধী ছত্রাক ‘ক্যান্ডিডা অরিস’। ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) ওষুধ-প্রতিরোধী ছত্রাক ক্যান্ডিডা অরিস–এর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত এক সাম্প্রতিক গবেষণায়।
গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, বহুল আলোচিত এই ‘সুপারবাগ’ কেবল নবজাতক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (এনআইসিইউ) পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নেই। গুরুতর অসুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের মধ্যেও সংক্রমণের প্রমাণ মিলেছে। ফলে হাসপাতালভিত্তিক সংক্রমণ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর আগে পরিচালিত গবেষণাগুলোতে এনআইসিইউতে এই ছত্রাকের উপস্থিতি শনাক্ত হলেও, নতুন গবেষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সমস্যাটি এখন আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করেছে। অন্যান্য আইসিইউতেও এর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় রোগী নিরাপত্তা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, ‘ক্যানডিডা অরিস’ কোনো উপসর্গ ছাড়াই ত্বকে অবস্থান (কলোনাইজেশন) করতে পারে। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি রক্তে প্রবেশ করে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটায়। গুরুতর অসুস্থ রোগী এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল তাদের ক্ষেত্রে এ ছত্রাক বেশি ক্ষতিকর। এছাড়া, প্রায় সব ধরনের সি. অরিস সাধারণত ব্যবহৃত অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হওয়ায় এর চিকিৎসা বেশ কঠিন। এসব কারণে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা কর্তৃপক্ষ ক্যানডিডা অরিসকে গুরুতর স্বাস্থ্যগত হুমকি হিসাবে বিবেচনা করছে।
২০২১ সালের আগস্ট থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৩৭২ জন আইসিইউ রোগীকে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, আইসিইউতে থাকার কোনো এক পর্যায়ে প্রায় ৭ শতাংশ রোগীর শরীরে সি. অরিস পাওয়া গেছে। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের বেশি রোগী আইসিইউতে থাকার সময়ই সংক্রমিত হয়েছেন— যা থেকে হাসপাতাল-ভিত্তিক সংক্রমণের স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলে। সরকারি হাসপাতালে সংক্রমণের হার (শতকরা ১৩ জন) বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় (শতকরা ৪ জন) উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। আন্তর্জাতিক গবেষণার তুলনায় ঢাকার হার অনেক বেশি— কানাডা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশে এই হার সাধারণত ০.৫ শতাংশেরও কম।
গুরুতর রোগীরাই বেশি ঝুঁকিতে
আইসিডিডিআর,বি’র সংক্রামক রোগ বিভাগের অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধ গবেষণা ইউনিটের প্রধান ও গবেষণার প্রধান গবেষক ডা. ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, ক্যানডিডা অরিস এখন সব ধরনের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের জন্য বড় হুমকি। হাসপাতালে ভেতরেই সংক্রমণ ছড়ানোর সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে এবং প্রচলিত ছত্রাকনাশক ওষুধের বিরুদ্ধে উচ্চমাত্রার প্রতিরোধ দেখা যাচ্ছে।
গবেষণায় দেখা যায়, যেসব রোগীর শরীরে ক্যানডিডা অরিস পাওয়া গেছে, তারা তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুতর অসুস্থ ছিলেন এবং নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে দীর্ঘদিন অবস্থান করেছেন। তাদের অনেকের ক্ষেত্রেই যান্ত্রিক শ্বাস-প্রশ্বাস সহায়তা, কেন্দ্রীয় নল বা মূত্রনালী নলের মতো দেহে প্রবেশমূলক চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে। যথাযথ জীবাণুনাশ ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত না হলে এসব ক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
নির্বাচিত নমুনার জিনগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকার আইসিইউগুলোতে পাওয়া সি. অরিস মূলত দক্ষিণ এশীয় ধরনভুক্ত। অর্থাৎ এটি এখন অঞ্চলে স্থায়ীভাবে অবস্থান করছে; বাইরের কোনো বিচ্ছিন্ন আমদানি-ঘটিত সমস্যা নয়।
গবেষকরা হাসপাতালের বিভিন্ন স্থান নিয়মিত ও যথাযথভাবে ক্লোরিনভিত্তিক কার্যকর জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করা, স্বাস্থ্যকর্মীদের সঠিকভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস নিশ্চিত করা এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ইউনিটগুলোতে নিয়মিত স্ক্রিনিং চালুর সুপারিশ করেছেন, যাতে সংক্রমিত বা জীবাণু বহনকারী রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করা যায়। পাশাপাশি, অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের সংযত ও যুক্তিসংগত ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও তারা গুরুত্ব দিয়েছেন, যাতে কার্যকর চিকিৎসার সীমিত বিকল্পগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায়।



