বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬
নারী

বীভৎস ও রক্তাক্ত শৈশব : রাষ্ট্র এখনো নীরব?

1741866755_1739859657_rape

একটি সাত বছরের শিশু বনের ভেতর দিয়ে হেঁটে আসছে। তার শরীর রক্তে ভেজা, আর শ্বাসনালি কাটা অবস্থায় ঝুলে আছে। কথা বলার শক্তি নেই, কেবল বাঁচার আকুতি নিয়ে সে এগিয়ে চলছে। এটি কোনো ভৌতিক সিনেমার দৃশ্য নয়, বরং চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক এলাকায় ঘটে যাওয়া আমাদের বাস্তবতার এক পৈশাচিক প্রতিচ্ছবি। দ্বিতীয় শ্রেণির এই শিশুটিকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছে। সকালটা যখন এমন বীভৎস খবর দিয়ে শুরু হয়, তখন প্রশ্ন জাগে—আমরা কি কোনো সভ্য সমাজে বাস করছি, নাকি কোনো আদিম অরণ্যে?

নতুন বছরে নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল নারী ও শিশু নিরাপত্তার আমূল পরিবর্তন। কিন্তু বাস্তব চিত্র উল্টো। ২০২৪ সালের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালেও সহিংসতার গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। গত বছর যেখানে ৭৪৯ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে (৩৬ জনকে হত্যার পর), সেখানে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেই সংখ্যাটি দাঁড়িয়েছে ৩৫-এ। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহেও অন্তত পাঁচটি নৃশংস ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়, বরং প্রতিটি ঘটনার পেছনে থাকা একেকটি পরিবারের কান্না আর বিচারহীনতার হাহাকার।

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ৯৯ শতাংশ মামলা পরিচালনা, তদন্ত এবং সাক্ষী উপস্থাপনের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু এই ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের আস্থার চরম সংকট রয়েছে।

মামলা না হওয়া: প্রায় ৩০ শতাংশ ধর্ষণের ঘটনা রিপোর্টই হয় না।

দীর্ঘসূত্রতা: ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও অধিকাংশ মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।

মৃত্যুদণ্ডের সীমাবদ্ধতা: অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, কেবল মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবনের বিধান থাকায় বিচারকরা রায় দিতে গিয়ে অনেক সময় দ্বিধায় পড়েন, যা প্রকারান্তরে আসামিকে সুবিধা করে দেয়।

ধর্ষণের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে ধর্ষণের বিচার চাওয়া। নরসিংদীর মহিষাশুড়া ইউনিয়নে এক কিশোরীকে ধর্ষণের পর বিচার চাওয়ায় তাকে এলাকা ছাড়ার চাপ দেওয়া হয় এবং শেষপর্যন্ত অপহরণ করে হত্যা করা হয়। যখন প্রভাবশালী রাজনীতিক, ব্যবসায়ী বা মাস্তানরা অপরাধীর পেছনে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়, তখন রাষ্ট্র নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। রাষ্ট্র যদি তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করতে পারে, তবে মানুষ সালিসের মতো অনিরাপদ ব্যবস্থার দিকেই ঝুঁকবে।

মানবাধিকার সংস্থা ‘ব্লাস্ট’-এর গবেষণা বলছে, অনেক ক্ষেত্রে পরিবার নিজেই সামাজিক মর্যাদার ভয়ে মুখ খোলে না। ২০১৮ সালের ‘মরিয়ম’ (ছদ্মনাম) নামক এক শিশুর ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, সমাজ ভুক্তভোগীকে সহমর্মিতা দেওয়ার বদলে তাকেই একঘরে করে রাখে। পুলিশের গাফিলতি এবং সামাজিক চাপের কারণে অপরাধীরা দায়মুক্তি পেয়ে যায়, যা তাদের পরবর্তী অপরাধে আরও সাহসী করে তোলে।

পুলিশ মাঝে মাঝে আসামি গ্রেপ্তার করে, যা ইতিবাচক। কিন্তু সেখানেই কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ? মানবাধিকার নেত্রী সালমা আলীর মতে, নারীর প্রতি সহিংসতার মাত্র চার ভাগের এক ভাগ গণমাধ্যমে আসে। বাকিগুলো ক্ষমতা আর অর্থের জোরে ধামাচাপা পড়ে যায়। রাষ্ট্রকে কেবল ‘ঘটনা পরবর্তী’ ব্যবস্থা নিলে হবে না, বরং এমন এক পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে কোনো অপরাধী রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ছত্রছায়ায় বাঁচার স্বপ্ন দেখবে না।

সীতাকুণ্ডের সেই গলাকাটা শিশুটি আজ হাসপাতালের বিছানায় জীবনের সাথে লড়াই করছে। তার সেই রক্তাক্ত পদচিহ্ন আমাদের জাতীয় বিবেকের ওপর এক গভীর ক্ষত। রাষ্ট্র যদি এখনই তার পুরো শক্তি দিয়ে এই হায়েনাদের বিরুদ্ধে না দাঁড়ায়, তবে ‘আইনের শাসন’ শব্দটি কেবল কাগুজে বুলি হিসেবেই থেকে যাবে। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়, বরং রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। আমরা কি আরও একটি শিশুর গলাকাটা লাশের অপেক্ষায় থাকব, নাকি এখনই ব্যবস্থা নেব?

নীরবরক্তাক্তশৈশব