বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ১০ জুন, ২০২৬
বিবিধ

সম্পর্কে ঝুঁকি: সঙ্গী কি আপনার সঙ্গে প্রতারণা করছে? বুঝবেন যেসব লক্ষণে

S743LGTTGFB2HK5OROUH7LJJDQ

অধিকাংশ মানুষই কোনো না কোনো সম্পর্কে থাকেন। এর মধ্যে অনেক সম্পর্কেই মাঝে মধ্যে জটিলতার কথা শোনা যায়। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সঙ্গীর প্রতারণা। সম্পর্কের ভিতই হলো বিশ্বাস। যদি একবার বিশ্বাস ভেঙে যায়, সেই সম্পর্ক আর আগের মতো সুন্দর থাকে না। আর এই বিশ্বাস একদিনে তৈরি হয় না। অন্যদিকে, একদিনে মানুষও চেনা যায় না। কেউ কেউ বছরের পর বছর একসঙ্গে থাকার পরও সঙ্গীকে বুঝতে পারেন না। তবে সঙ্গী আপনার সঙ্গে প্রতারণা করছেন কি না, তা বুঝতে পারবেন একটু সচেতন হলেই!

চিঠির যুগ থেকে চ্যাটবক্স

একসময় প্রেমের ভাষা ছিল হাতে লেখা চিঠি, নির্জন বিকেলের অপেক্ষা। বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর রচনায় প্রেম ছিল ভাবগম্ভীর, আর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর উপন্যাসে তা ছিল সামাজিক বাধার বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ। সেই প্রেমে সময় ছিল ধীর, আবেগ ছিল গভীর। এখন সেই জায়গা নিয়েছে মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও ভিডিও কল। যোগাযোগ দ্রুত, কিন্তু অনেক সময় অনুভূতির গভীরতা প্রশ্নের মুখে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: প্রকাশ না প্রদর্শন?

স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে পরিচয় হওয়া এখন খুব সহজ। কয়েকটি ক্লিকেই বন্ধুত্ব, কথোপকথন, এমনকি প্রেমের সূচনা। কিন্তু এই সহজলভ্যতার মধ্যেই রয়েছে এক ধরনের ভঙ্গুরতা। অনলাইন উপস্থিতি অনেক সময় বাস্তব চরিত্রকে আড়াল করে রাখে। ফলে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ফাঁক তৈরি হয়। তরুণ-তরুণীরা অনেক সময় সম্পর্কের গভীরতার চেয়ে তার প্রকাশ—ছবি, স্ট্যাটাস, রিল—নিয়ে বেশি সচেতন হয়ে পড়ে। সম্পর্ক তখন হয়ে ওঠে এক ধরনের ‘পারফরম্যান্স’।

রোমান্টিক আদর্শ বনাম বাস্তবতা

সিনেমা ও সিরিজ প্রেমের এক স্বপ্নিল চিত্র তুলে ধরে। যেমন ‘Friends’ -এ বন্ধুত্ব ও প্রেমের মিশেল, কিংবা ‘The Notebook’ -এ চিরন্তন ভালোবাসার গল্প— এসব দর্শকদের মনে উচ্চ প্রত্যাশা তৈরি করে। কিন্তু বাস্তব সম্পর্ক সবসময় নাটকীয় নয়; বরং তা দৈনন্দিন যত্ন, ছোট ছোট সমঝোতা ও সহমর্মিতায় গড়ে ওঠে।

কিভাবে বুঝবেন সঙ্গীর প্রতারণা !

আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন:

বিশেষজ্ঞদের মতে, কথার চেয়ে আচরণ অনেক সময় বেশি স্পষ্ট বার্তা দেয়। ধরা যাক, সঙ্গী আগে অফিসের লাঞ্চ ব্রেকে নিয়মিত ফোন করতেন। দিনের ছোটখাটো ঘটনা শেয়ার করতেন, খোঁজ নিতেন। হঠাৎ সেই অভ্যাস বন্ধ হয়ে গেল। আগের মতো যোগাযোগ নেই, বার্তায় দেরি, কথোপকথনে অনাগ্রহ—এগুলো কেবল ব্যস্ততার কারণেও হতে পারে। তবে পরিবর্তন যদি ধারাবাহিক হয়, তখন তা খেয়াল করার মতো বিষয়।

একইভাবে, বাসা থেকে অস্বাভাবিকভাবে আগে বের হওয়া বা প্রায়ই দেরি করে ফেরা, ঘন ঘন ‘ব্যবসায়িক’ বা ‘পেশাগত’ ভ্রমণের অজুহাত, কিংবা হঠাৎ করে ওভারটাইমের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ—এসব আচরণও প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। অবশ্যই কর্মক্ষেত্রের চাপ বাড়তে পারে, দায়িত্ব বাড়তে পারে। কিন্তু যখন এসব পরিবর্তনের সঙ্গে মানসিক দূরত্বও বাড়তে থাকে, তখন তা সম্পর্কের ভেতরে অস্বস্তির ইঙ্গিত দেয়।

গোপনীয়তা নিয়ে বেশি সতর্কতা: সম্পর্কের জন্য সতর্ক সংকেত?

সঙ্গীর ব্যক্তিগত জীবনের সবটাতেই আপনার নাক গলাতে হবে, এমন নয়। তার অনুমতি ছাড়া তার ফোন ঘাঁটাঘাঁটি করাও ঠিক কাজ নয়। কিন্তু আপনার সঙ্গী যদি তার ফোনটি সব সময় নানা ধরনের পাসওয়ার্ড দিয়ে সুরক্ষিত রাখেন এবং আপনার থেকে দূরে দূরে রাখেন তবে তা হতে পারে আপনার জন্য সতর্ক সংকেত। আপনি যদি সঙ্গীর ফোন ঘাঁটেন, তা হলে সঙ্গী রেগে যাচ্ছেন কি না, খেয়াল রাখুন। সঙ্গীর সামনে ফোনে কথা বলা, চ্যাটিং করা স্বাভাবিক ব্যাপার। তবে এর জন্য সঙ্গীকে যদি উঠে অন্যত্র চলে যেতে হয়, কার সঙ্গে কথা বলা হলো প্রশ্নের জবাব যদি ‘কেউ না’ হয়, তাহলে রেড ফ্ল্যাগ হিসেবে ধরতে হবে বিষয়টি।

সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ রাখুন:

ডিজিটাল যুগে সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক সময় অনলাইন আচরণ থেকেই একজন মানুষের মানসিক অবস্থান, অগ্রাধিকার কিংবা সম্পর্কের প্রতি দায়বদ্ধতার ইঙ্গিত মেলে। তাই সঙ্গীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা পর্যবেক্ষণ করা একেবারে অস্বাভাবিক নয়। তিনি কার পোস্টে নিয়মিত প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন, কার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আলাপ চালাচ্ছেন বা ইনবক্সে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করছেন কি না—এসব বিষয় খেয়াল করলে কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে। হঠাৎ করে গোপনীয়তা বাড়িয়ে দেওয়া, পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা বা অনলাইন উপস্থিতি নিয়ে অস্বচ্ছতা তৈরি হওয়াও প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে।

ব্রাউজিং হিস্ট্রি ডিলিট:

তার সোশ্যাল মিডিয়ায় সার্চ অপশনে কারও নাম খুঁজে পাবেন না। এমনকী তাদের ফোনেও ব্রাউজিং হিস্ট্রি খুঁজে পাবেন না। যেন তারা কখনোই কিছু সার্চ করেননি। ফোনের পাশাপাশি ল্যাপটপ বা ডেস্কটপের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। এর কারণ হলো তাদের মনে সব সময় এক ধরনের ভয় কাজ করে। আপনি তার সার্চ হিস্ট্রি থেকে জেনে যেতে পারেন অনেককিছুই। তাই তিনি এভাবে সব ডিলিট করে রাখেন।

সঙ্গী বা সংসারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা:

সম্পর্কে টানাপোড়েনের একটি স্পষ্ট লক্ষণ হতে পারে সঙ্গীর আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন। বিশেষ করে তিনি যদি ধীরে ধীরে সঙ্গী বা পরিবারের প্রতি আগ্রহ হারাতে শুরু করেন, তবে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। আগে যেসব ছোটখাটো বিষয়—পছন্দের রঙের পোশাক, প্রিয় খাবার বা বিশেষ কোনো আয়োজন—তাকে আনন্দিত করত, সেসবেও যদি আর আগের মতো সাড়া না দেন, সেটি সম্পর্কের দূরত্বের ইঙ্গিত হতে পারে। এ ছাড়া সংসারের দায়িত্বে অনাগ্রহ, সন্তানকে সময় না দেওয়া কিংবা কথাবার্তায় অমনোযোগী হয়ে পড়াও সম্পর্কের ভেতরে পরিবর্তনের লক্ষণ হতে পারে। আপনার কথা মন দিয়ে না শোনা বা আগের মতো আবেগী প্রতিক্রিয়া না দেখানো অনেক সময় মানসিক দূরত্ব তৈরি হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

সরাসরি না বলে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলা:

আগে সঙ্গী দিনের শেষভাগটা আপনার সঙ্গেই কাটাতেন। কিন্তু এখন তাঁর ভীষণ কাজের চাপ। আপনাকে ফোন করার সময়টুকু নেই। কিংবা আগে দিনটা কেমন কাটল, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ আপনাকে বলতেন। কিন্তু এখন প্রশ্ন করলেই বাঁধছে বিপত্তি। সঙ্গী হুট করে রেগে গিয়ে বলছেন , ‘সবকিছু কেন তোমাকে ব্যাখ্যা করতে হবে? সোজাসাপটা বা যৌক্তিক উত্তর না পান, সঙ্গী যদি আপনাকে প্রমাণস্বরূপ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা না করতে পারেন, সঙ্গীকে সন্দেহ করার অবকাশ থেকেই যায়।

পাল্টা আপনাকে সন্দেহ করা:

একজন প্রতারক বা যিনি গোপনে অন্য একটি সম্পর্কে রয়েছেন, তিনি নিজের দিকে আঙুল উঠার আগে আপনাকে নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে পারেন। একজন লাইসেন্সধারী বিয়ে ও পরিবার থেরাপিস্ট নাদিন ম্যাকালুসো বলেছেন, গ্যাসলাইটিং এক ধরনের সাইকোলজিক্যাল ম্যানিপুলেশন (মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ)। আপনি নিজেকে নিয়ে যেন দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে থাকেন, সঙ্গীর দিকে আঙুল তুলতে না পারেন, এ জন্য প্রতারক সঙ্গী নিজেই আপনাকে সন্দেহ করে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ব্যস্ত রাখবেন।

প্রাক্তনের সঙ্গে কথা বললে:

আপনার সঙ্গী যদি তার প্রাক্তনের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ রাখে বা যোগাযোগের চেষ্টা করে তবে বুঝে নেবেন যে সে একজন প্রতারক। কারণ তার হৃদয়ে এখনও প্রাক্তনের জন্য জায়গা রয়েছে, যা আপনার কাছে স্বীকার করে না। এভাবে আপনাকে না জানিয়ে প্রাক্তনের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে গেলে তা আপনার জন্য কখনোই মঙ্গলজনক হবে না।

আপনার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়:

‘লাস্ট বাট নট দ্য লিস্ট’, বলা হয়ে থাকে, সঙ্গী প্রতারণা করছে, এর সবচেয়ে প্রকট বৈশিষ্ট্য হলো আপনার ‘গাট ফিলিং’ বা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়। সঙ্গীর যদি কোনো বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য দেখা না-ও যায়, তবু আপনার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আপনাকে সতর্ক করবে। এছাড়া, আপনার সঙ্গীর কথার ভেতরে অসঙ্গতি বৃদ্ধি একটি বিশাল সতর্কবার্তা হতে পারে। সে যদি বেশিরভাগ সময়েই অসঙ্গতিপূর্ণ কথা বলে তাহলে ধরে নেবেন সে কোনোকিছু লুকানোর জন্যই এমনটা করছে।

কথায় আছে, মানুষ যখন কোনো অপরাধ করে তখন কোনো না কোনো চিহ্ন রেখে যায়। আপনার সঙ্গী অতি সাবধানতার পরেও হয়তো এমন কোনো চিহ্ন রেখে যাচ্ছেন, যা একটু খেয়াল করলেই আপনি বুঝতে পারবেন। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে “প্রেম” ও “সম্পর্ক” শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতির বিষয় নয়; এটি সামাজিক বাস্তবতা, মানসিক স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বিশেষত জীবনে সম্পর্ক এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান, আবার একই সঙ্গে বেশি জটিল।

প্রতারণাসম্পর্ক