বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
বিবিধ

শুধুমাত্র চাঁদরাত নয়, পুরো রমজানে বিশ্বজুড়ে মেহেদির ঐতিহ্য

f8e345f6-4869-412c-973d-36b191826d12

রমজান মাসজুড়ে মেহেদী পরার যে ঐতিহ্য, তা শুধু চাঁদরাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের নানা দেশে পুরো রমজান মাসজুড়ে নারীরা— কখনও কখনও পুরুষেরাও— হাতে মেহেদী দিয়ে পবিত্র এই সময়টিকে আলাদাভাবে উদ্‌যাপন করেন। এটি যেমন সৌন্দর্যচর্চা, তেমনি আধ্যাত্মিক আবহকে ঘিরে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রকাশেরও একটি অংশ।

মেহেদীর রঙে হাত সাজানো খুব জনপ্রিয় একটি রীতি। ধর্মীয় যেকোন উৎসব থেকে শুরু করে বিয়ে-জন্মদিন সহ নানা অনুষ্ঠানে মেহেদীর রঙে হাত না রাঙ্গালে অনেকের কাছেই উৎসবের পরিপূর্ণতা পায় না। তাই সুপ্রাচীনকাল থেকে যেকোনো ধর্মীয় উৎসব থেকে শুরু করে পালাপার্বণ সবকিছুতেই রয়েছে মেহেদি পাতার আধিপত্য। মেহেদি পাতা বেটে, শুকিয়ে, গুড়া করে বা পেস্ট করে শরীরের বিভিন্ন স্থান রাঙানোর ইতিহাস বহু পুরনো।

প্রাচীন মিশরের রাণী নেফারতিতি (খ্রী.পূর্ব ১৩৭০-১৩৩০) ও রানী ক্লিওপেট্রা (খ্রী.পূর্ব ৬৯-৩০) নিয়মিত মেহেদি ব্যবহার করতেন। মোগল সম্রাট শাহজাহান পত্নি মমতাজকে মিশরের রাজা রাষ্ট্রীয় উপহার হিসেবে মেহেদি ও মেহেদি চারা উপহার দিয়েছিলেন বলে জানা যায়।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রমজান শুরু হওয়ার আগেই বাজারে মেহেদীর চাহিদা বেড়ে যায়। বিশেষ পারিবারিক ইফতারের দিনগুলোতে অনেক নারী হাতে হালকা নকশার মেহেদী পরেন। ফুল, লতা ও জ্যামিতিক রেখা মেহেদির ডিজাইন হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। পুরো হাত ভরে না দিয়ে আঙুল বা কবজিতে সূক্ষ্ম নকশা করার প্রবণতাই বেশি দেখা যায়।

দক্ষিণ এশিয়ায় রমজানের মেহেদী ঐতিহ্য আরও রঙিন। পাকিস্থান ও কলকাতা -তে রমজানের বিভিন্ন রাতে, বিশেষ করে শুক্রবার বা দাওয়াতের আয়োজনে, নারীরা হাতে নতুন নকশা আঁকেন। অনেক জায়গায় মসজিদে তারাবির নামাজ শেষে বাড়ি ফিরে পরিবারের নারীরা একসঙ্গে বসে মেহেদী দেন। এটি এক ধরনের আড্ডা ও পারিবারিক বন্ধনের মুহূর্ত হয়ে ওঠে। তরুণীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘রমজান হেনা ডায়েরি’ শেয়ার করেন—মাসজুড়ে প্রতি সপ্তাহে ভিন্ন ভিন্ন ডিজাইন দিয়ে।

উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতেও রমজান ও মেহেদীর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মরোক্কো ও মিশর-এ বিশেষ ধর্মীয় রাত—যেমন শবে কদরের সময়—অনেকে মেহেদী পরাকে শুভ ও আনন্দের প্রতীক মনে করেন। মরক্কোয় ঐতিহ্যবাহী বেরবার নকশা জনপ্রিয়, যেখানে জ্যামিতিক চিহ্নের মাধ্যমে শুভকামনা প্রকাশ করা হয়। মেহেদী সেখানে শুধু সাজ নয়; বরং সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের এক অংশ।

Advertisements

আফ্রিকার পূর্বাঞ্চলেও রমজানে মেহেদী ব্যবহারের চল রয়েছে। সোমালিয়া ও সুদানে -এ রমজানের মাঝামাঝি সময়ে পারিবারিক মিলনমেলায় নারীরা হাতে-পায়ে গাঢ় রঙের মেহেদী পরেন। সুদানে কখনও কখনও পুরো তালু ভরে রঙ করা হয়, যা আধ্যাত্মিক পবিত্রতা ও আনন্দের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়ও এই চর্চা রয়েছে। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় রমজানের বিশেষ ইফতার মাহফিল বা কোরআন খতম উপলক্ষে মেহেদী ব্যবহার দেখা যায়। যদিও সেখানে নকশা তুলনামূলকভাবে সরল, তবে ধর্মীয় আবহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তা পরা হয়। অনেকেই মনে করেন, মেহেদীর প্রাকৃতিক রং ও গন্ধ মনকে প্রফুল্ল করে, যা রোজার ক্লান্তি কাটাতেও সহায়ক।

তুরস্কের আনাতোলিয়া অঞ্চলে মেহেদীর ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বেশি ঐতিহ্যবাহী। কোনিয়া বা দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কিছু এলাকায় রমজানের মাঝামাঝি বা শেষ দশকে নারীরা পারিবারিক মিলনমেলায় হাতে সামান্য মেহেদী পরেন। এটি আনন্দ বা বরকতের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। অনেক সময় দাদী-নানীরা নাতনিদের হাতে ছোট ফুল বা বিন্দু আকৃতির নকশা এঁকে দেন—যা দক্ষিণ এশিয়ার জটিল ডিজাইনের চেয়ে অনেক সরল।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও রমজানকেন্দ্রিক মেহেদী শিল্প অনেক দেশে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস। অস্থায়ী স্টল, বাসায় সেবা দেওয়া, কিংবা অনলাইন বুকিং—সব মিলিয়ে হাজারো নারী এই সময় বাড়তি আয় করেন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পেশাদার মেহেদী আর্টিস্ট হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন, প্রাকৃতিক মেহেদী ব্যবহার করাই উত্তম। দ্রুত গাঢ় রঙের জন্য রাসায়নিক মিশ্রিত পণ্য ব্যবহার করলে ত্বকের ক্ষতি হতে পারে। রমজানের পবিত্রতা যেমন আত্মিক শুদ্ধতার কথা বলে, তেমনি দৈহিক সুস্থতাও এর অংশ— এ কথা মনে রাখা জরুরি।

রমজান মাসে মেহেদী দেওয়া অনেক দেশের মুসলিম সমাজে এক নীরব অথচ প্রাণবন্ত ঐতিহ্য। এটি ধর্মীয় অনুশাসনের পরিপন্থী নয়; বরং সংযম, সৌন্দর্য ও সামাজিক বন্ধনের এক সাংস্কৃতিক বহিঃপ্রকাশ। চাঁদরাতের বাইরেও, পুরো রমজানজুড়ে মেহেদীর রঙ তাই হয়ে ওঠে পবিত্র সময়ের এক কোমল, নান্দনিক ছোঁয়া।

Advertisements