বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
বিবিধ

সারের বাড়তি দাম, কৃষকের উদ্বেগ: ঝুঁকিতে খাদ্য নিরাপত্তা

সারের বাড়তি দাম, কৃষকের উদ্বেগ: ঝুঁকিতে খাদ্য নিরাপত্তা

সরকার আসে, সরকার যায়; সারের সিন্ডিকেট থেকে মুক্তি নেই কৃষকের।

সরকারি হিসাবে সারের সংকট নেই। বিএডিসির তথ্য অনুযায়ী, গুদামে সার রাখার জায়গা পর্যন্ত নেই। অথচ মাঠ পর্যায়ে চিত্র ভিন্ন। সরকার নির্ধারিত এক বস্তা ইউরিয়া সারের দাম ১ হাজার ২৫০ টাকা হলেও কৃষককে গুনতে হচ্ছে ১ হাজার ৪৫০ থেকে ১ হাজার ৪৬০ টাকা। ডিএপি সারের ক্ষেত্রেও চিত্র একই। বস্তাপ্রতি ২০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে, যা শুধু উৎপাদন খরচই বাড়িয়ে দিচ্ছে না বরং খাদ্য নিরাপত্তাকেও শঙ্কায় ফেলছে।

কিন্তু কৃষকেরা অভিযোগ করছেন, বোরো ও অন্যান্য মৌসুমে সারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ডিলাররা অতিরিক্ত দাম আদায় করছেন। পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে সারাদেশে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের এক চক্র সারের বাজারে অরাজকতা তৈরি করেছে। সরবরাহে ঘাটতির অভিযোগও উঠেছে। যদিও সরকারি অভিযান চালানো হয়েছে, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে তা স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারছে না।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, দেশের মোট ধান উৎপাদনের বড় অংশ বোরো মৌসুমে আসে। এই সময় সারের বাজারে অনিয়ম চলতে থাকলে উৎপাদন খরচ বাড়বে, যা সরাসরি ফলনে প্রভাব ফেলবে। ফলে বাজারে চালের দামও বেড়ে যেতে পারে। তাদের মতে, শুধু বরাদ্দ বা গুদামের মজুত হিসাব নয়, মাঠ পর্যায়ে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি।

এখন বোরো মৌসুম। দেশে প্রায় ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়। এই মৌসুমে সোয়া ২ কোটি টন চাল উৎপাদিত হয়, যা সারাবছরের চাল সরবরাহের প্রধান ভরসা। বোরো আবাদ সম্পূর্ণভাবে বীজ, সার ও সেচের ওপর নির্ভরশীল। তাই উপকরণের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ সরাসরি বেড়ে যায়।

Advertisements

শুধু ধান নয়, এই সময় আলু, পেঁয়াজ, সরিষা ও বিভিন্ন সবজির উৎপাদনও চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকে। সারের বাজারে অস্থিরতা মানে পুরো খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া। গত আমন মৌসুমেও প্রায় দেড় কোটি টনের চাল উৎপাদন হয়েছে। ফলন ভালো হলেও কৃষকদের অনেককে বাড়তি দামে সার কিনতে হয়েছে। কিছু অভিযানে ডিলারদের জরিমানা করা হলেও বাজারদর কমেনি।

সরকারি হিসাবে গুদামে পর্যাপ্ত মজুত আছে। তবে মাঠ পর্যায়ে কৃষকের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। কেজি প্রতি ইউরিয়ার দাম সরকার নির্ধারিত ২৭ টাকা হলেও কৃষককে ২ থেকে ৫ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। টিএসপির ক্ষেত্রে ২৭ টাকার বিপরীতে ৩ থেকে ১৩ টাকা, ডিএপি ২১ টাকার বিপরীতে ৭ থেকে ১৫ টাকা এবং এমওপি ২০ টাকার বদলে ৩ থেকে ৮ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।

কৃষকের অভিযোগ, পরিবহন ঠিকাদার ও ডিলারের একটি চক্র অবৈধভাবে সার মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। সরকারি গুদামে সার থাকলেও খুচরা পর্যায়ে সরবরাহ কমিয়ে বাড়তি দাম আদায় করা হচ্ছে। একই ব্যক্তি বা তার স্বজনের নামে একাধিক ডিলারশিপ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

সরকার সার ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ-সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০০৯’ সংশোধন করেছে। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে বিতরণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার কথা বলা হলেও কার্যকর হওয়ার আগেই পুরোনো চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ)-এর একটি অংশ নীতিমালার বিরোধিতা করছে এবং ধীরে বাস্তবায়নের দাবি তুলছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকারের হিসাবে সাড়ে ৫ লাখ টন ইউরিয়া, ৩ লাখ ২১ হাজার টন টিএসপি, ৫ লাখ ৩৩ হাজার টন ডিএপি এবং ৩ লাখ ৩১ হাজার টন এমওপি সারের মজুত রয়েছে। উপজেলা পর্যায়েও চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে বরাদ্দ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কিছু সারের পরিমাণ গত বছরের তুলনায় কম। চলতি ফেব্রুয়ারিতে টিএসপি বরাদ্দ ৭৫ হাজার ৫০০ টন, যেখানে গত বছর ছিল ৮০ হাজার ৮০০ টনের বেশি। ডিএপি বরাদ্দ ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩০০ টন, গত বছর ছিল ১ লাখ ৪৪ হাজার টন। এমওপির বরাদ্দ বেড়ে হয়েছে ৬৭ হাজার ৮০০ টন। সামান্য ঘাটতিও ভরা মৌসুমে বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ভরা মৌসুম শুরু হয়েছিল। তখনও একই অভিযোগ উঠেছিল যে সরকার সারের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। এখন নতুন সরকার বিএনপি দায়িত্বে রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী থাকায় জেলা পর্যায়েও নির্বাচিত প্রতিনিধি রয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমন্বিত নজরদারি থাকলে এখনও বাড়তি দামে সার বিক্রি বন্ধ করা সম্ভব।

১১ জেলায় সমকাল প্রতিনিধিরা অনুসন্ধান চালিয়ে দেখেছেন, সব জেলায় সারের একই পরিস্থিতি। সরকারি হিসাবে কোথাও বলা হচ্ছে, পর্যাপ্ত মজুত। আবার কোথাও ডিলার সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম সংকটের ফাঁদে পড়ে কৃষককে বাড়তি দামে সার কিনতে হচ্ছে।

চুয়াডাঙ্গা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বোরো মৌসুমে সারের ঘাটতি নেই। জেলার মোট আবাদি জমি ৯৪ হাজার ২০ হেক্টর। চার উপজেলায় বিসিআইসি অনুমোদিত ৫০ এবং বিএডিসির ৯৩ জন ডিলার রয়েছেন। তবুও অভিযোগ রয়েছে, কয়েকটি পরিবার সারের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। একই ব্যক্তি বিসিআইসি ও বিএডিসির ডিলারশিপ পেয়েছেন– এমন অভিযোগও আছে।

জেলা সার ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আকবার আলী বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী ডিলারশিপ পেয়েছি এবং ব্যবসা করছি। তবে কৃষকের দাবি, মৌসুমের শুরুতেই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

গাইবান্ধা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সাত উপজেলায় ১ লাখ ২৯ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ইউরিয়া, টিএসপি, পটাশ ও ডিএপির চাহিদার প্রায় সবটাই মজুত রয়েছে। সরকারি নির্ধারিত দাম– ইউরিয়া ২৭ টাকা, টিএসপি ২৭ টাকা, পটাশ ২০ টাকা ও ডিএপি ২১ টাকা কেজি। তবে খুচরা বাজারে ৩–৫ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে রসিদ চাইলে সার দেওয়া হয় না।

দিনাজপুরে ফেব্রুয়ারিতে সারের বরাদ্দ কম পাওয়ার কারণে বাজারে বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এক বিঘা জমিতে বোরো আবাদে খরচ প্রায় ৩৫ হাজার টাকা, যেখানে লাভ ৫–১০ হাজার টাকার বেশি নয়।

রাজশাহীতে বাগমারা, তানোর, বাঘা ও চারঘাটের কৃষকরা বলছেন, সরকারি দামে সার পাওয়া যায় না; বেশি দিলে মিলছে। ইউরিয়া ও ডিএপি সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০০–৩০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। অভিযোগ, কিছু ডিলার বরাদ্দের সার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে পছন্দের খুচরা বিক্রেতার কাছে দিচ্ছেন।

মনিরামপুরে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিকল্পিত সংকট তৈরি করা হচ্ছে। সরকারি ডিলারদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সার পাওয়া যাচ্ছে না, অথচ গ্রামের খুচরা দোকানে বেশি দামে মিলছে।

খুলনার কয়রায় মৌসুমের মাঝামাঝি ইউরিয়া ও ডিএপিতে কেজিপ্রতি ৩–১০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। কয়েক কিলোমিটার ব্যবধানেও দামের তারতম্য দেখা গেছে।

নওগাঁর মান্দা, মহাদেবপুর, নিয়ামতপুর, পোরশা ও সদর উপজেলার কৃষকরা জানাচ্ছেন, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকায় সার কিনতে হচ্ছে। খুচরা দোকানে ৫০ কেজির ‘বাংলা ডিএপি’ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৩০০–১,৩৫০ টাকায়, বেসরকারিভাবে আমদানি করা ‘ডিকে’ ব্র্যান্ড ১,৫০০ টাকায়।

বগুড়ায় টিএসপি বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি মূল্য ১,৩৫০ টাকা হলেও বিক্রি হচ্ছে ১,৫৫০–১,৬৫০ টাকায়।

কৃষকেরা বাজারে বাড়তি দাম দিয়ে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। সরকারি গুদামে মজুত থাকলেও মাঠে কার্যকর তদারকির অভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। উৎপাদন খরচ বাড়লে কৃষক ধীরে ধীরে ধান চাষ থেকে সরে যাবেন। অনেক কৃষক ভুট্টার মতো বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। দ্রুত কার্যকর নজরদারি ও শৃঙ্খলাবদ্ধ বিতরণ ছাড়া খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে থাকতে পারে।

Advertisements