বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬
বিবিধ

মশার প্রাদুর্ভাব বেড়েছে, অতিষ্ঠ সারাদেশ

মশার প্রাদুর্ভাব বেড়েছে, অতিষ্ঠ সারাদেশ

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে মশার উপদ্রব বেড়েছে। তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডের চায়ের দোকানী বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘দু’পাশে কয়েল জ্বালালেও মশা দমে না। দোকানে কাজ করতেও সমস্যা হচ্ছে।’ পীরেরবাগ রোডের বাসিন্দা বাদল সূত্রধরও জানান, ঘরে মশার উপদ্রব তীব্র, নিরাপদভাবে বাঁচা মুশকিল হয়ে উঠেছে।

নগরবাসীর এই অভিযোগ নতুন নয়। সম্প্রতি এক আইনজীবী স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন। কারণ, মাসের বেশি সময় মশার উপদ্রব চললেও কার্যকর পদক্ষেপ নেই। মাঝেমধ্যে ওষুধ ছিটালেও তা প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, মশার ওষুধে কাজ হচ্ছে কিনা তা যাচাইয়ের জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। শাহজাহানপুর, বাসাবো, খিলগাঁও এলাকায় নমুনা সংগ্রহের পর তা আইইডিসিআরে পরীক্ষা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ওষুধ কার্যকর হলে মশার এই তীব্রতা হওয়া উচিত নয়।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশার প্রজনন বেড়ে যাওয়ার পেছনে পরিবেশগত কারণ রয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘বেশ কিছুদিন বৃষ্টি নেই, ড্রেন ও জলাধারে পানি পচে গেছে। শীত চলে যাওয়ায় তাপমাত্রা বেড়েছে। এ সব মশার বংশবিস্তারকে প্ররোচিত করছে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন কার্যক্রম ঠিকমতো চালায়নি।’

রাজধানীর পরিস্থিতি ছাড়িয়ে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা, রংপুর, ময়মনসিংহ, বগুড়া ও কুমিল্লাতেও মশার উপদ্রব বেড়েছে।

অতিষ্ঠ চট্টগ্রামবাসী
গত ১৬ মাসে চট্টগ্রামে মশাবাহিত দুই রোগে প্রাণ গেছে ৪৮ জনের; আক্রান্ত হয়েছে ১০ হাজারের বেশি। এর মধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ৬ হাজার ৩৩৮ জন আর চিকুনগুনিয়ায় ৩ হাজার ৬৮৩ জন। 
এ সময়ে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন দায়িত্বে থাকলেও স্বস্তিতে নেই নগরবাসী। কাগজে-কলমে সিটি করপোরেশন মশা মারতে কোটি টাকা খরচ করেছে। তবে বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাস্তবে দৃশ্যমান নয় মশক নিধন কার্যক্রম। গত তিন মাসে মশা মারতে বেশির ভাগ এলাকায় দেখা যায়নি সিটি করপোরেশনের কাউকে। 

Advertisements

যার প্রমাণ মিলেছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালিত এক গবেষণায়। করপোরেশনের তদারকি না থাকায় উল্টো দ্বিগুণ হয়েছে মশার লার্ভা। চট্টগ্রাম নগরে ২০২৪ সালে লার্ভার ঘনত্ব ছিল মাত্র ৩৬ শতাংশ। অথচ সেটি এক বছরের ব্যবধানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫ দশমিক ২৯ শতাংশে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার (২০ শতাংশ) চেয়ে চার গুণ। 

রাজশাহীতে ফগার মেশিন ও ওষুধ কেনা বন্ধ
সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় রাজশাহী নগরীর প্রতিটি এলাকায় মশার উপদ্রব অস্বাভাবিক বেড়েছে। পাশাপাশি বেড়েছে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়ার প্রকোপও। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত ১৪ মাসে ১ হাজার ৭২০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রাজশাহী মেডিকেল (রামেক) কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে মারা গেছেন ২১ জন।

নগরের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, প্রজনন মৌসুম শুরু হওয়ায় রমজান মাসে মশার উপদ্রব বেড়েছে। বাসা বা অফিসে কোথাও শান্তি নেই। সিটি করপোরেশন থেকে মশা মারার কোনো উদ্যোগ তারা দেখেননি।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা শেখ মামুন ডলার বলেন, মশা নিধনে নগরীতে প্রতিদিনই নর্দমা পরিষ্কার করা হয়। উড়ন্ত মশা ধ্বংসের জন্য ফগার মেশিন ব্যবহার হয়। তবে এটি ব্যবহার করলে মশা মরে না; বরং উপকারী অনেক পতঙ্গ মারা যায়। বৃদ্ধ ও শিশুরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফগার মেশিন একটা ‘আইওয়াশ’। এ জন্য মশার প্রজনন মৌসুমে এটা আমরা সীমিত পরিসরে ব্যবহার করি। গত দুই বছরে নানা কারণে ফগার মেশিনের ওষুধ কিনতে পারিনি। শিগগিরই কেনার প্রক্রিয়া শুরু হবে। 

সিলেটে কর্মী সংকটে মশক নিধন করা যাচ্ছে না
সিলেট সিটি করপোরেশন কর্মকর্তারা জানান, কর্মী সংকটে নগরীতে মশক নিধন কার্যক্রম চালানো যাচ্ছে না। করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। মশক নিধনের ওষুধ আছে, তবে পরিচালনার কর্মী নেই। মশা বাড়ছে, কিন্তু ওষুধ ছিটানো যাচ্ছে না। ফগার মেশিনও ব্যবহার করা যাচ্ছে না রমজানে।

এ ব্যাপারে সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন জন্মেজয় দত্ত বলেন, গত দেড় মাসে আমরা দুজন ডেঙ্গু রোগী পেয়েছি। তবে সামনে মশার প্রজনন মৌসুম হওয়ায় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে বড় বিপদ। বর্ষার আগে মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করতে হবে। সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদের সঙ্গে সমন্বয় করে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ নানা সময় বিভিন্ন জায়গায় মশার লার্ভা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছেন। তাতে সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। তাই এখন থেকেই সতর্ক থাকতে হবে।

খুলনায় ৫৪ দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত ৪৫ জন
মৌসুম পরিবর্তনের সময় অন্যান্য বছর মশার লার্ভা নিধনে ড্রেন-জলাশয়ে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের মিশ্রণ ছিটাত খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি)। স্থানীয়ভাবে এটি ‘কালো তেল বা লাইট ডিজেল’ হিসেবে পরিচিত। তবে এ বছর এখনও ‘কালো তেল’ ছিটানো শুরু হয়নি। এতে মশার উপদ্রব বাড়ছে।

খুলনায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে। গত ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৯ জন এবং জেলার ৯ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৬ জন ভর্তি হয়েছেন। 

সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে কেসিসিতে ফার্নেস অয়েলের মজুত নেই। গত জানুয়ারিতে ফার্নেস অয়েল কেনার প্রস্তাব দেওয়া হলেও সেটি আটকে রয়েছে। এ ছাড়া অ্যাডাল্টিসাইডের মজুতও প্রায় শেষ পর্যায়ে। বর্তমানে কেসিসির স্টোরে ৪১০ লিটার অ্যাডাল্টিসাইড মজুত আছে।

কেসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কোহিনুর জাহান বলেন, রোজার আগে থেকেই মশক নিধনে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে। প্রতিদিন বিকেলে ৩১টি ফগার মেশিন দিয়ে সব ওয়ার্ডে মশা মারা হচ্ছে। ফার্নেস অয়েল কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। 

রংপুরে ওষুধে কাজ হচ্ছে না
রংপুর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ জানায়, মশক নিধন কার্যক্রম চলছে। উড়ন্ত মশা দমনে অ্যাডাল্টিসাইড (ম্যালাথিওন) এবং মশার লার্ভা দমনে লার্ভিসাইড (টেমিফস ৫০ ইসি) জাতীয় ওষুধ ছিটানো হয়।

সহকারী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান মিজু বলেন, মশক নিধন কার্যক্রম একটি চলমান প্রক্রিয়া। এই বছর দুই হাজার লিটার অ্যাডাল্টিসাইড স্প্রে করার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ইতোমধ্যে এক হাজার লিটার এবং ৫০০ লিটার লার্ভিসাইডের বিপরীতে ২০০ লিটার কেনা হয়েছে। ৭২টি ফগার মেশিনের বিপরীতে ২৪টি দিয়ে মশক নিধন কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। 

ময়মনসিংহে সাঁড়াশি অভিযানেও মশা মরছে না 
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এইচ কে দেবনাথ জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মশক নিধনে দেড় কোটি টাকা বাজেট ধরা হয়েছিল। এবারও বাজেট কোটি টাকার বেশি। গত ২০ অক্টোবর থেকে নগরীতে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে। চলছে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ। 

সিটি করপোরেশনের স্যানিটারি ইন্সপেক্টর দীপক মজুমদার জানান, বর্তমানে নগরীর ৩৩ ওয়ার্ডে নিয়মিতভাবে মশার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। প্রতিদিন সকালে স্প্রে মেশিনের মাধ্যমে লার্ভিসাইড এবং বিকেলে ফগার মেশিনের মাধ্যমে অ্যাডাল্টিসাইড ওষুধ দেওয়া হয়। 

বগুড়ায় বরাদ্দ আছে, নিধনে তেমন কার্যক্রম নেই 
বগুড়া পৌরসভায় মশা নিধনে যে পরিমাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সে তুলনায় তেমন কার্যক্রম নেই। বিশেষ করে পৌরসভার বর্ধিত এলাকায় মশক নিধনে কোনো কার্যক্রম দেখা যায় না বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের।

বগুড়া পৌরসভার চলতি অর্থবছরের বাজেটে দেখা যায়, এবার মশক নিধন ওষুধ কেনায় বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৫০ লাখ টাকা। গত অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। মশা নিধনে নিয়মিত ওষুধ ছিটানোর দাবি করে পৌরসভার স্বাস্থ্য পরিদর্শক আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, শীতের সময় মশা কম হয়, তাই নভেম্বর থেকে ওষুধ ছিটানো বন্ধ রাখা হয়েছিল। আবার চালু করা হবে দু-একদিনের মধ্যে। মশা নিধনের পাশপাশি ড্রেন পরিষ্কারের জন্য ১০ কেজি ব্লিচিং পাউডার, পাঁচ কেজি ডিটারজেন্ট পাউডার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রতি ওয়ার্ডে। 

পৌর প্রশাসক ও জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের উপপরিচালক রাজিয়া সুলতানা বলেন, মশা নিধনের জন্য সব এলাকায় সমান কার্যক্রম চালাতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছি। 

কুমিল্লায় বরাদ্দের টাকা কাজেই আসছে না
কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নগরবাসীকে মশার উপদ্রব থেকে রক্ষা করতে নিয়মিত ‌ওষুধ ছিটানোর কথা বললেও বাস্তবতা ভিন্ন। মশক নিধনে বরাদ্দের অর্ধকোটি টাকা কোনো কাজেই আসছে না বলে অভিযোগ নগরবাসীর। 

সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ২৭টি ওয়ার্ডে মশক নিধনে ফগার মেশিন আছে মাত্র ১০টি। এই অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ আছে ৫০ লাখ টাকা। তবে নগরবাসীর অভিযোগ, মাঝেমধ্যে নগরীর প্রধান সড়কের পাশে মশক নিধনের ওষুধ ছিটানো হলেও এতে মশা মরে না। এ ছাড়া নগরীর যেসব এলাকায় মশা বেশি, সেখানে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা যান না। তবে সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মশক নিধন কর্মকর্তা নাজিম উদ্দিন বলেন, আমাদের ১০টি ফগার মেশিন দিয়ে প্রতিদিন পাঁচটি করে ওয়ার্ডে ছয়টি টিম কাজ করছে। এভাবে ২৭টি ওয়ার্ডে পালাক্রমে কাজ চলছে। 

Advertisements