১০১ বছর বয়সেও প্রাণবন্ত জীবনের প্রতীক জিয়াং ইউয়েচিন

বয়স যে কেবল একটি সংখ্যা এই কথাটি যেন জীবন্ত করে তুলেছেন চীনের ওয়েনজু শহরের ১০১ বছর বয়সী নারী জিয়াং ইউয়েচিন। সাত সন্তানের জননী এই প্রবীণ নারীর জীবনযাপন, অভ্যাস ও মানসিকতা আধুনিক স্বাস্থ্যবিধির প্রচলিত ধারণাকে বারবার চ্যালেঞ্জ জানায়। শতবর্ষ পেরিয়েও তাঁর শরীর ও মন—দুটিই বিস্ময়করভাবে সজীব। আজও তাঁর সব কটি দাঁত অটুট, হাঁটাচলায় আত্মবিশ্বাসী, আর প্রাণশক্তি কোনো কিশোরীর চেয়ে কম নয়।
জিয়াংয়ের জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো তাঁর ভ্রমণপ্রীতি। বয়স একশ পেরোলেও তাঁর ঘোরার নেশা কমেনি একটুও। গত দুই বছরে তিনি সন্তান ও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে চীনের দোংতৌ, ইয়ংজিয়া, জিনহুয়া, সুঝৌসহ ২০টিরও বেশি শহর ঘুরে দেখেছেন। পাহাড়, নদী ও প্রকৃতির সৌন্দর্য আজও তাঁকে গভীরভাবে মুগ্ধ করে। দীর্ঘ ভ্রমণেও তিনি ক্লান্ত হন না—বরং নতুন জায়গা দেখার আনন্দে আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠেন।

এক অনন্য ‘নাইট আউল’ জীবনধারা
দীর্ঘায়ু মানেই ভোরে ওঠা, সময়মতো ঘুমানো এমন ধারণা প্রচলিত থাকলেও জিয়াংয়ের জীবনযাপন একেবারেই ব্যতিক্রম। তাঁর মেয়ে ইয়াও সুংপিং জানান, তাঁর মা যেন জন্মগতভাবেই একজন ‘নাইট আউল’। তিনি প্রায়ই রাত ২টা পর্যন্ত টেলিভিশন দেখেন এবং সকাল ১০টার আগে ঘুম থেকে ওঠেন না। ঘুম থেকে উঠে এক কাপ সুগন্ধি গ্রিন টি দিয়ে শুরু হয় তাঁর দিন।
খাদ্যাভ্যাসেও রয়েছে ভিন্নতা। জিয়াং দিনে মাত্র দুবার ভারী খাবার খান একবার ব্রাঞ্চ হিসেবে সকাল ও দুপুরের খাবার একসঙ্গে, আর সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে রাতের খাবার। তবে গভীর রাতে ক্ষুধা লাগলে তিনি চিপস, কুকিজ কিংবা হালকা স্ন্যাক্স খেতে দ্বিধা করেন না। তাঁর প্রিয় খাবারের তালিকায় রয়েছে ওয়াটার চেস্টনাট কেক, যা তিনি বিশেষভাবে উপভোগ করেন। অনেকের চোখে এসব অভ্যাস ‘অস্বাস্থ্যকর’ মনে হলেও, জিয়াংয়ের ক্ষেত্রে এগুলোই যেন শক্তির উৎস হয়ে উঠেছে।
কর্মব্যস্ততা থেকে শান্ত জীবনে রূপান্তর
জীবনের বড় একটি সময় জিয়াং ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী। ঘর পরিষ্কার রাখা, অতিথি আপ্যায়ন, দীর্ঘ পথ হাঁটা সবই ছিল তাঁর দৈনন্দিন রুটিনের অংশ। তবে কয়েক বছর আগে পড়ে গিয়ে হাতে চোট পাওয়ার পর পরিবার থেকে তাঁর ওপর কাজের চাপ কমিয়ে দেওয়া হয়। হাতে অবসর বাড়ায় তিনি দিনে কিছুটা ঘুমাতে শুরু করেন, যার প্রভাব পড়ে রাতের ঘুমে। ধীরে ধীরে টেলিভিশন দেখা ও রাত জাগার অভ্যাস গড়ে ওঠে, যা এখন তাঁর জীবনের স্বাভাবিক অংশ।
আজীবন রোমান্টিকতা ও স্মৃতির শক্তি
জিয়াংয়ের জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তাঁর প্রয়াত স্বামী ইয়াওকে ঘিরে। তাঁদের পাড়ায় তাঁরা পরিচিত ছিলেন সবচেয়ে রোমান্টিক দম্পতি হিসেবে। জিয়াং নিরক্ষর হওয়ায় স্বামী ছিলেন তাঁর ভরসা ও পথপ্রদর্শক। সিনেমা দেখতে গেলে স্বামী কানে কানে গল্পের প্লট বুঝিয়ে দিতেন, আর মজার দৃশ্যে চরিত্রদের নকল করে তাঁকে হাসাতেন। একসঙ্গে ভ্রমণ, গল্প আর হাসিতে ভরা সেই স্মৃতিগুলো আজও জিয়াংয়ের জীবনীশক্তির বড় উৎস।
দীর্ঘায়ুর আসল রহস্য: ইতিবাচক মন
জিয়াংয়ের মেয়ে ইয়াও মনে করেন, দীর্ঘায়ুর মূল চাবিকাঠি খাওয়া বা ঘুমের নিয়মে নয়, বরং তাঁর মায়ের মানসিকতায়। তাঁর ভাষায়,
‘মা সারা জীবন অন্যের যত্ন নিয়েছেন, নিজের কথা খুব কম ভেবেছেন। তাঁর মন খুব পরিষ্কার। তিনি সহজে রাগ করেন না, কোনো বিষয়কে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেন না এবং মনে কোনো ক্ষোভ জমতে দেন না।’
জিয়াং বিশ্বাস করেন, জীবনকে সহজভাবে গ্রহণ করাই সুখের মূল চাবিকাঠি। দুঃখ-কষ্টকে আঁকড়ে না ধরে, হাসি ও কৃতজ্ঞতা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়াই তাঁর দর্শন।
জীবনের প্রতি এক অনুপ্রেরণামূলক বার্তা
জিয়াং ইউয়েচিনের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় নিয়মমাফিক জীবনযাপন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন মানসিক শান্তি, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনকে ভালোবাসার ক্ষমতা। দীর্ঘ ও সুখী জীবনের জন্য কঠোর নিয়ম নয়, বরং মন খুলে বাঁচার সাহসই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর ওষুধ।



