আফগানিস্তানে নতুন আইন: হাড় না ভাঙা পর্যন্ত নারীদের মারতে পারবেন স্বামী

আফগানিস্তানে নারীদের অধিকারের সীমানা সঙ্কুচিত হল আরও। এ বার বিশেষ শর্তে নারীদের বিরুদ্ধে গার্হস্থ্য হিংসাকে ‘বৈধ’ করল তালেবান সরকার। জানিয়ে দিল, এখন থেকে স্ত্রী এবং সন্তানদের শারীরিক ভাবে শাস্তি দিতে পারবেন আফগান পুরুষেরা। যতক্ষণ না পর্যন্ত স্ত্রী বা সন্তানের হাড় ভাঙে বা শরীরে ক্ষতের সৃষ্টি হয়, ততক্ষণ তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে না।
তবে মারধরের ফলে ‘হাড় ভেঙে গেলে’ বা ‘জখম হলে’ স্বামীদের শাস্তি পেতে হবে, নতুন এই আইনে বলা হয়েছে। তালেবান সরকার নতুন এই ফৌজদারি আইন জারি করেছে। আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থি গোষ্ঠীটির সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা ৯০ পাতার নতুন এই দণ্ডবিধিটিতে স্বাক্ষর করেছেন। এই নতুন আইনে নারীদের ওপর পারিবারিক সহিংসতাকে কার্যত অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
২০০৯ সালে ‘মহিলাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা নির্মূল আইন’ চালু হয়েছিল আফগানিস্তানে। গার্হস্থ্য হিংসা বন্ধে এই পদক্ষেপ করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হামিদ কারজ়াই (Hamid Karzai)। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে এই আইন তুলে দেয় তালেবান সরকার। বদলে নিয়ে আসে নতুন ফৌজদারি আইন। সেখানেই এই বিধি চালু করা হয়েছে।
দেশটিতে নারীদের ওপর পারিবারিক সহিংসতাকে কার্যত বৈধতা দেয়া হয়েছে বলে মনে করছেন সমালোচকরা। পশতু ভাষায় ‘দ্য মাহাকুমু জাজাই উসুলনামা’ বা ‘আদালতের ফৌজদারি বা দণ্ডবিধি সংক্রান্ত নিয়মাবলী’ নামের এই বিধিমালা আফগানিস্তানের আদালতগুলোতে পাঠানো হয়েছে। নতুন এই দণ্ডবিধিতে বিভিন্ন ধরনের বর্ণ ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। অপরাধী ‘মুক্ত’ নাকি ‘দাস’, তার ওপর ভিত্তি করে শাস্তির মাত্রাও ভিন্ন হবে। ফলে এই ব্যবস্থায় একই অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান নির্ধারিত হবে অপরাধীর সামাজিক পদমর্যাদার ওপর ভিত্তি করে। এর ফলে একই অপরাধে একজন সাধারণ মানুষ যে শাস্তি পাবেন, একজন উচ্চপদস্থ বা ধর্মীয় নেতা সেই একই কাজে কেবল মৌখিক উপদেশের মাধ্যমে পার পেয়ে যেতে পারেন। নারীদের জন্য বিচার পাওয়ার পথ এই আইনের মাধ্যমে আরও কণ্টকাকীর্ণ করে তোলা হয়েছে।
কোনো স্বামী ‘অতিরিক্ত মাত্রার শক্তি’ ব্যবহার করে দৃশ্যমান জখম বা হাড় ভাঙার ঘটনা ঘটালে তার মাত্র ১৫ দিনের কারাদণ্ড হতে পারে। আর স্বামী তখনই দোষী সাব্যস্ত হবে যখন তার স্ত্রী তার সাথে হওয়া নির্যাতন আদালতে সফলভাবে প্রমাণ করতে পারবে। নির্যাতিত নারী পুরোপুরি হিজাব পরা অবস্থায় তার জখম বিচারককে দেখাতে পারবে, তবে এ সময় তার স্বামী অথবা প্রাপ্তবয়স্ক কোনো পুরুষকে তার সঙ্গে আদালতে থাকতে হবে। এছাড়াও, আফগানিস্তানের এক জন বিবাহিত মহিলা যদি স্বামীর অনুমতি ছাড়া তাঁর আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে যান, তা হলে তাঁকে তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হতে পারে।
নতুন দণ্ডবিধির বিরুদ্ধে যাতে মানুষ অসন্তোষ না প্রকাশ করতে পারেন, তারও ব্যবস্থাও করে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে তালেবান সরকার। নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, চালু করা এই দণ্ডবিধি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ফলে আফগান সমাজের মানুষেরা নাম প্রকাশ না করার শর্তেও বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই নতুন দণ্ডবিধিকে চরম উদ্বেগজনক ও মধ্যযুগীয় বর্বরতার শামিল বলে অভিহিত করেছে। নির্বাসিত আফগান মানবাধিকার সংস্থা ‘রাওয়াদারি’ জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এই আইনের বাস্তবায়ন অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।



