রমজান মাসের আগাম প্রস্তুতি

রমজান মাস মুসলমানদের জন্য শুধুমাত্র খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকার সময় নয়। এটি আত্মশুদ্ধি, ইবাদত এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। মাসটি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হলে আগাম পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি অপরিহার্য। কেননা যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের ভালো প্রস্তুতি মানেই ওই কাজটির অর্ধেক পূর্ণতা ও সফলতা অর্জিত হয়ে যায়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কোনো বান্দা যে কোনো ভালো কাজ বা আমল যদি যথাযথভাবে উত্তম উপায়ে করে; তবে সে আমল বা কাজ আল্লাহ তাআলা পছন্দীয় হিসেবে গ্রহণ করেন।’ (তাবারানি)
রমজানের প্রস্তুতি কেমন হবে, নিচে এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরা হলো:
১. রমজানের আগেই তাওবা করা
তওবা করা সব সময় ওয়াজিব। তবে ব্যক্তি যেহেতু এক মহান মাসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তাই অনতিবিলম্বে তওবা করে নেওয়া উচিত, যাতে করে সে পূতপবিত্র ও প্রশান্তমনে এ মুবারক মাসে প্রবেশ করতে পারে।
এরপর আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতে মগ্ন হতে পারে। আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, ‘মুমিনরা, তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো, যাতে সফল হতে পারো।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৩১)
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘হে লোকেরা, তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো। আমি প্রতিদিন তাঁর কাছে ১০০ বার তাওবা করি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২,৭০২)
২. রমজানের গুরুত্ব বোঝা
রমজান মাসের মাহাত্ম্য, বরকত ও ফজিলত সম্পর্কে জ্ঞান থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোরআন ও হাদিসের আলোকে বুঝতে হবে যে, এই মাসে করা প্রতিটি নেক আমল সাধারণ মাসের তুলনায় অনেক গুণ বেশি সওয়াব দেয়। জ্ঞান ও বোঝাপড়া থাকলে ইবাদতের প্রতি মনোযোগ বাড়ে এবং মাসটি পুরোপুরি ফলপ্রসূ হয়।
৩. শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি
অনেকেই গ্যাস্ট্রিক বা এ জাতীয় অন্য কোনো অসুখের দোহাই দিয়ে রোজা পালন থেকে বিরত থাকতে চায়। এটা ঠিক নয়। এ ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। চিকিৎসার প্রয়োজন হলে তা আগেভাগেই সেরে নেওয়া দরকার। শারীরিকভাবে পরিপূর্ণ সুস্থতা অর্জনের যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
অনেকেই হিজরি সন বা চান্দ্রমাসের খবর রাখে না। ফলে হঠাৎ যখন শোনেন, অমুক দিন থেকে রোজা শুরু হবে তখন অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। এই অল্প সময়ে রমজানের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য যথাযথভাবে তারা অনুধাবন করতে পারেন না।
ফলে সঠিকভাবে রোজা রাখাও তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না, তা ছাড়া হঠাৎ করে রোজা রাখা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তাই রমজান আসার আগে রোজা রাখায় অভ্যস্ত হওয়া দরকার।
৪. ওয়াজিব রোজা থেকে মুক্ত হওয়া
যদি পূর্ববর্তী বছর বা মাসে কোনো রোজা অসমাপ্ত থাকে তা রমজান শুরু হওয়ার আগে পূরণ করা উচিত। এটি রমজান মাসের ইবাদতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে এবং হৃদয়কে প্রশান্ত রাখে। অসমাপ্ত রোজা থাকলে ব্যক্তি মনে অশান্তি বা অপরিপূর্ণতার অনুভূতি পেতে পারে যা রমজানের সম্পূর্ণ ফজিলত গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে।
আবু সালামা (রা.) বলেন, আমি আয়েশা (রা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘আমার ওপর বিগত রমজানের রোজা বাকি থাকলে শাবান মাস ছাড়া আমি তা আদায় করতে পারতাম না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১,৮৪৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১,১৪৬)
৫. ইবাদতে প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্ত হওয়া
যেসব কাজ রমজানে আপনার ইবাদত-বন্দেগিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে সেগুলো দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করা, যাতে পুরো রমজান নির্বিঘ্নে ইবাদত-বন্দেগি করতে পারেন।
৬. রোজার নিয়ম-কানুন জানা
রোজা এবং অন্যান্য ইবাদতের সঠিক নিয়মকানুন জানাটা অত্যন্ত জরুরি। ফিকহ অনুযায়ী ইবাদত পালন না করলে সঠিক রোজার স্বীকৃতি পাওয়া যায় না। মাসের আগে নিয়মকানুন শেখা এবং প্রয়োগের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া ব্যক্তি রমজানকে সম্পূর্ণরূপে সফলভাবে পালন করতে পারে।
৭. শাবান মাসে নফল রোজা রাখা
রমজানের আগে শাবান মাসে নফল রোজা পালন করা শরীর ও মনকে রোজার জন্য প্রস্তুত করে। এটি রোজার অভ্যস্ততা তৈরি করে এবং মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করে ফলে রমজান মাসের দীর্ঘ ইবাদত ও নিয়মানুবর্তিতা সহজ হয়।
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত; ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) এমনভাবে রোজা পালন করতেন যে, আমরা বলতাম, তিনি আর রোজা ভঙ্গ করবেন না এবং এমনভাবে রোজা ভঙ্গ করতেন যে আমরা বলতাম তিনি আর রোজা রাখবেন না।
আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে রমজান ছাড়া অন্য কোনো মাসের গোটা অংশ রোজা রাখতে দেখিনি এবং শাবান ছাড়া অন্য কোনো মাসে বেশি রোজা রাখতে দেখিনি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১,৮৬৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১,১৫৬)
৯. রমজানের ২৪ ঘণ্টার রুটিন তৈরি করা
রমজান মাসজুড়ে যে যেই কাজেই থাকুক না কেন পুরো সময়টি কোন কোন কাজে কীভাবে ব্যয় হবে তার একটি সম্ভাব্য রুটিন তৈরি করে নেওয়া। আগাম রুটিন থাকলে রমজানে চরম ব্যস্ততার মাঝেও নেক আমলসহ অন্যান্য কাজগুলোও ইবাদতের মধ্যেই কেটে যাবে। এক কথায় সব কাজের তালিকা করে নেওয়া।
১০. রমজানের চাঁদ অনুসরণ
শাবান মাস শেষে রমজানের চাঁদ দেখা নিশ্চিত করা জরুরি। এটি রোজা শুরু ও অন্যান্য মাসিক ইবাদতের জন্য সঠিক সময় নির্ধারণে সাহায্য করে। চাঁদ দেখা নিয়ে পূর্ব প্রস্তুতি থাকলে মাসের প্রথম দিন থেকে সঠিকভাবে ইবাদত পালন করা যায়।
চাঁদ দেখা গেলে এ দোয়া পড়া-
আল্লাহু আকবার, আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল আমনি ওয়াল ঈমানি ওয়াস্সালামাতি ওয়াল ইসলামি ওয়াত্তাওফিকি লিমা তুহিব্বু ওয়া তারদা রাব্বুনা ওয়া রাব্বুকাল্লাহ।
অর্থ : আল্লাহ মহান, হে আল্লাহ! এ নতুন চাঁদকে আমাদের নিরাপত্তা, ঈমান, শান্তি ও ইসলামের সঙ্গে উদয় কর। আর তুমি যা ভালোবাস এবং যাতে তুমি সন্তুষ্ট হও, সেটাই আমাদের তাওফিক দাও। আল্লাহ তোমাদের এবং আমাদের প্রতিপালক।’ (তিরমিজি, মিশকাত)
রমজানের চাঁদ দেখার খবর শুনেই হৃদয়ের গভীর থেকে আল্লাহর কাছে মুমিনের আকুতিভরা প্রার্থনা হবে এমন-
‘আল্লাহুম্মা সাল্লিমনি লি-রমাদান, ওয়া সাল্লিম রামাদানা লি, ওয়া তাসলিমাহু মিন্নি মুতাক্বাব্বিলা।’
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমাকে শান্তিময় রমজান দান করুন। রমজানকে আমার জন্য শান্তিময় করুন। জন্য রমজানকে শান্তিময় করে দিন। রমজানের শান্তিও আমার জন্য কবুল করুন।’ (তাবারানি)
১১. আল্লাহর কাছে দোয়া ও তাওফিক প্রার্থনা
রমজান ও নেক আমল সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা অপরিহার্য। দোয়া মানুষকে আত্মিক দৃঢ়তা দেয়, নেক কাজের প্রতি মনোযোগ বাড়ায় এবং বরকত অর্জনে সাহায্য করে।



