আজ বিশ্ব শিশু ক্যান্সার দিবস

আজ ১৫ ফেব্রুয়ারি, বিশ্ব শিশু ক্যান্সার দিবস। শিশু ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০০২ সাল থেকে চাইল্ড ক্যান্সার ইন্টারন্যাশনাল (সিসিআই) দিবসটি পালন করে আসছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রতি বছর বিশ্ব শিশু ক্যান্সার দিবস পালন করা হয়। প্রতিবারের মতো এবারও আজ রোববার বাংলাদেশে ‘বিশ্ব শিশু ক্যান্সার’ দিবস পালন করা হচ্ছে। দিবসটির প্রতিপাদ্য– ‘শিশু ক্যান্সারের প্রভাব তুলে ধরা: চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে পরিবর্তন’। প্রতি বছরের মতো এবারও দিবসটি উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি সভার আয়োজন করা হয়েছে।
প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৩ হাজার নতুন শিশু ক্যান্সার রোগী শনাক্ত হচ্ছে বলে দ্য ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব পেডিয়াট্রিক অনকোলজির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ক্যান্সার কোন ছোঁয়াচে রোগ নয়। কিন্তু আমাদের দেশে সচেতনার অভাবে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু তার স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বাংলাদেশেই এখন শিশু ক্যান্সারের উন্নত চিকিৎসা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ ক্যান্সারই নিরাময়যোগ্য। দ্রুত রোগ সনাক্ত হলে ৮০% শিশুদেরকে উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে সারিয়ে তোলা যেতে পারে। শিশুদের এ রোগ শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, বরং পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক কাঠামোতেও গভীর প্রভাব ফেলে।
সামাজিক প্রভাব ও জটিলতা
তিন বছরের শিশু নাফিসা মম। এই বয়সে শিশুটির এখন বাবা-মায়ের আদর-যত্নে বড় হওয়ার কথা। কিন্তু মরণব্যাধি ক্যান্সার তাকে আটকে রেখেছে হাসপাতালের বিছানায়। ‘ক্রোনিক অস্টিওমাইলাইটিস’ ও মরণব্যাধি ‘মেটাস্টেসিস ইউয়িং সারকোমা’ নামক বোন ক্যান্সারে আক্রান্ত নাফিসা ।
এর মধ্যে তার শরীরের বিভিন্ন হাড়, ফুসফুস ও লিভারে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে। নাফিসার বাবা জানান চিকিৎসা বাবদ প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা প্রয়োজন। যা পরিবারের পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ এরই মধ্যে চিকিৎসা বাবদ আর্থিক সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে দেয়া হয়েছে।
শিশু নাফিসার মতো অসংখ্য পরিবার ক্যান্সারের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার বিপুল খরচ বহন করতে গিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়ছে। এই ছোট্ট শিশুর সংগ্রাম আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হলে সরকারি, বেসরকারি উদ্যোগ ও সামাজিক সহায়তা কতটা জরুরি।
চিকিৎসা কেন্দ্রের সীমিত সেবা
দেশে হাতে গোনা যে কয়েকটি হাসপাতালে শিশুদের ক্যানসারের চিকিৎসা হচ্ছে, সেগুলো ঢাকাকেন্দ্রিক। বড় বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকলেও, তা ব্যয়বহুল। তাই সারা দেশ থেকে ঢাকায় এসে সরকারি হাসপাতালে ক্যানসারের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা অনেকটা কঠিন হয়ে পড়ে। দেশের ১৪টি সরকারি হাসপাতালসহ মাত্র কয়েকটি স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিশু ক্যান্সারের চিকিৎসা দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুদের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসায় দরকার তিনটি সুবিধা—কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি ও অস্ত্রোপচার। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ছাড়া এসব সুবিধা আর কোনো সরকারি হাসপাতালে নেই।
শিশু সার্জনের অভাব
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক হেমাটোলজি ও অনকোলজি বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ড. এ কে এম আমিরুল মোরশেদ খসরু বলেন, অধিকাংশ রোগী শেষ সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়।সারাদেশে শিশু ক্যান্সারের রোগী বাড়লেও চিকিৎসা ব্যবস্থা ঢাকা। বর্তমানে পেডিয়াট্রিক হেমাটোলজি ও অনকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশে প্রায় ৬০ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সদস্য আছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কঠিন টিউমার অপসারণে প্রশিক্ষিত শিশু সার্জনের অভাব রয়েছে।
চিকিৎসা ব্যয়
প্যালিয়েটিভ কেয়ার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন মাত্র ১২ জনের মতো। প্রয়োজনীয় ওষুধ, বিশেষ করে মরফিন সিরাপেরও ঘাটতি রয়েছে। অধিকাংশ ওষুধ আমদানি নির্ভর হওয়ায় দাম ও সরবরাহ অনিশ্চিত। সেবা বিকেন্দ্রীকরণ, জাতীয় নিবন্ধন চালু এবং পর্যাপ্ত রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপন করা গেলে শিশু ক্যান্সার চিকিৎসায় দৃশ্যমান অগ্রগতি সম্ভব। বাংলাদেশে শিশু ক্যান্সারের চিকিৎসার খরচ প্রায় ২–৪ লাখ টাকা, যেখানে উন্নত দেশে খরচ ২০–৩০ লাখ টাকা। বহু পরিবার এ খরচ বহন করতে অক্ষম।
সচেতনতা ও প্রতিরোধ
স্কুলে সচেতনতা কর্মশালা,পরিবার ও অভিভাবকের জন্য গাইডলাইন,পরিবার ও সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি, শিশুর মানসিক ও সামাজিক সুস্থতা নিশ্চিত, স্বাস্থ্য সচেতনতা, নিরাপদ খাদ্য ও পরিবেশ নিশ্চিত, পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ, গর্ভকালীন মায়ের যত্ন, খাদ্য ও জীবনধারার সচেতনতা নিয়ে কাজ করলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দেশে এখনও জাতীয় ক্যান্সার নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু হয়নি। ফলে কোন এলাকায় কী ধরনের ক্যান্সার বেশি, মৃত্যুহার কত– এসব নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর নীতিনির্ধারণ ও প্রতিরোধমূলক কর্মসূচির জন্য জাতীয় নিবন্ধন জরুরি। দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নবজাতক, শিশু ও কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ. কে.এম আমিরুল মোরশেদ খসরু বলেন, সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ না থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জীনগত কারণ, ভাইরাস, খাদ্যে ভেজাল, ক্যামিকেলস, পরিবেশগত সমস্যায় শিশুদের ক্যানসার হয়। তবে প্রাথমিকভাবে এই রোগ শনাক্ত করা গেলে বেশিরভাগ শিশুরই ভালো হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। এই অবস্থায় শিশুদের ক্যানসার মোকাবিলায় সবার আগে সচেতনতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।



