বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
বিবিধ

শীতের ধূসরতা থেকে রঙে ফেরা— ফাল্গুন

Ahsan31nayan_1360752125_1-5891871644_8e40c640c9_b

শীতের শেষে পৃথিবীটা যেন একটু ফ্যাকাশে হয়ে যায়। গাছের ডালে পাতা কমে, মাঠের ঘাসে রঙ ম্লান হয়, সকালের কুয়াশা সবকিছুকে একরঙা চাদরে ঢেকে রাখে। চারপাশে একটা ধূসর স্থিরতা। শব্দ কমে আসে, হাওয়া ভারী লাগে। যেন প্রকৃতি নিজেই একটু চুপ করে থাকে।

তারপর একদিন টের পাওয়া যায়—নীরবতার ভেতরেই কিছু বদলাচ্ছে।

ফাল্গুন আসার আগে কোনো ঢাকঢোল বাজে না। হঠাৎ করেই দেখা যায়, শুকনো ডালের মাথায় লাল আগুন জ্বলে উঠেছে। শিমুল ফুটেছে। পলাশের রঙ ছড়িয়ে পড়েছে পথের ধারে। যে গাছটাকে এতদিন মৃত মনে হচ্ছিল, তার গায়ে কচি পাতার সবুজ আভা। ধূসরতা ভেঙে রঙের প্রথম ঘোষণা।

এই বদলটা হঠাৎ নয়, ধীরে ধীরে। দিনের আলো একটু দীর্ঘ হয়। সকালের হাওয়া আর কাঁপিয়ে দেয় না বরং ছুঁয়ে যায় নরমভাবে। জানালা খুললে আর কুয়াশা ঢুকে পড়ে না, ঢুকে পড়ে এক ধরনের হালকা উষ্ণতা। সেই উষ্ণতার মধ্যেই থাকে নতুন ঋতুর গন্ধ—অপরিচিত, অথচ চেনা।

ফাল্গুন আসলে শুধু রঙের মাস নয়, রূপান্তরের মাস। শীতের ধূসরতা ছিল এক ধরনের বিরতি—প্রকৃতির বিশ্রাম, অপেক্ষা। সেই অপেক্ষা শেষে শুরু হয় রঙে ফেরা। এই ফেরাটা খুব নাটকীয় নয় বরং আশ্চর্যভাবে স্বাভাবিক। যেন প্রকৃতি জানে, কতদিন নিস্তব্ধ থাকা যায়, আর কখন আবার কথা বলতে হয়।

বাংলা সাহিত্যে ফাল্গুনের এই রঙিন প্রত্যাবর্তন বারবার ধরা পড়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বসন্তকে দেখেছেন নবজাগরণের উৎসব হিসেবে—গানে, কবিতায়, রঙের ছোঁয়ায়। তার বসন্ত শুধু ফুলের নয়, মন জাগানোরও। আবার কাজী নজরুল ইসলাম–এর লেখায় বসন্ত অনেক সময় আগুনের মতো—উচ্ছ্বাস, বিদ্রোহ আর শক্তির প্রতীক। এই দুই মেজাজ মিলেই যেন ফাল্গুনের সম্পূর্ণ রূপ, কোমল সবুজ আর অগ্নিলাল একসঙ্গে।

Advertisements

শহরে ফাল্গুনের রঙ কখনও একটু অন্যরকম। কংক্রিটের ভিড়ে শিমুলের গাছ খুঁজে পাওয়া যায় না সবসময়। তবু ফুটপাথের ধারে কোনো অচেনা গাছে হঠাৎ ফুল ফুটে উঠলে চোখ থেমে যায়। ধূসর দেয়ালের পাশে সেই লাল বা হলুদ ফুল যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। শহরের ব্যস্ততার ভেতরেও ফাল্গুন নিজের উপস্থিতি জানান দেয়—রোদের তাপে, বিকেলের আলোয়, হালকা বাতাসে।

গ্রামে এই রঙের উৎসব আরও খোলা। মাঠের ওপর দিয়ে দখিনা হাওয়া বয়ে যায়। কচি ধানের সবুজে নতুন ঋতুর আভাস। মাটির গন্ধ বদলে যায়। নদীর ধারেও যেন আলো একটু অন্যরকম হয়ে ওঠে। ধূসর শীতের পরে এই রঙিন বিস্তার চোখকে যেমন ভরিয়ে দেয়, তেমনি মনকেও হালকা করে।

আসলে ধূসরতা আর রঙ—দুটোই প্রয়োজন। শীতের ফাঁকা ডাল না থাকলে বসন্তের ফুল এত চোখে পড়ত না। মলিনতার অভিজ্ঞতা না থাকলে উজ্জ্বলতা এত তীব্র হতো না। ফাল্গুন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি স্থবিরতার ভেতরেই রঙের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে।

এই কারণেই হয়তো ফাল্গুনকে শুধু ক্যালেন্ডারের একটি মাস বলে মনে হয় না। এটা এক ধরনের প্রতিশ্রুতি—অন্ধকার বা নিস্তব্ধতা চিরস্থায়ী নয়। ধূসর সময় কেটে যায়। নতুন পাতা আসে। রঙ ফিরে আসে।

শীতের শেষে যখন প্রথম লাল শিমুল চোখে পড়ে, মনে হয়—প্রকৃতি নিজেই যেন বলছে, ‘সবকিছু আবার শুরু করা যায়।’ ফাল্গুন সেই শুরু করার সাহসের নাম। ধূসরতা পেরিয়ে রঙে ফেরার নাম।

আজ বাসন্তী রঙের শাড়িতে রঙিন তরুণীরা যেন হলুদের আলোয় মোড়া নিজেই এক বসন্ত। খোপায় গাঁদা ফুলের মালা, কপালে আলপনা, চোখে অপেক্ষার দীর্ঘ এক বছরের গল্প। তরুণদের কণ্ঠে গান, পায়ে পায়ে ছন্দ— সব মিলিয়ে চারুকলার পথ ধরে হাঁটা মানেই এক ধরনের আবেগী ভ্রমণ। এই দিনটার জন্যই তো সারা বছর ধরে বুকের ভেতর জমে থাকে রোদ্দুর, জমে থাকে গান, জমে থাকে না-বলা ভালোবাসা।

আজ পহেলা ফাল্গুন। ভালোবাসার রঙে, সংস্কৃতির সুরে আর ইতিহাসের গৌরবে— বাঙালির বসন্তবরণ।

Advertisements