‘শহর জুড়ে তুমি আসার কোলাহল’

মাধবী আমেরিকা থেকে আসে। প্রায় দশ বছর পর নিজ মাতৃভূমিতে পা রাখে। তার প্রথম গন্তব্য—পিত্রালয় ঢাকার লালমাটিয়া। কিন্তু মন বিষন্ন। আমেরিকায় থাকাকালীন বাবার ফোন পেলেই ছুটে আসতে চাইতো।
মাধবীর বাবা সোবহান এবং মা রোকেয়া। রোকেয়াও আমেরিকা যাওয়া-আসার মধ্যে থাকেন। মাধবীর বড় বোন শিউলীও স্বামী এবং সন্তান নিয়ে আমেরিকায়। বাবার ব্যবসা বাংলাদেশের বিধায় তাকে থাকতে হয় এখানে। মাধবী চায় এবার বাবাকে জোর করে সাথে নেবে।
“কী যে বলিস মা, তা কি হয়?”—সোবহান সাহেব এতদিন পর মেয়েকে পেয়ে কপালে আদর বুলান।
মা রোকেয়াও এসেছেন। রীতিমতো অনুযোগ আর উৎকন্ঠার সুর।
“এই মাধবী, শোন, তোর বাবার কথা একদম শুনবি না।”
ওপাশ থেকে ম্যাসেঞ্জার কলে শিউলীর আর্তি,
“বাবা একা থাকতে থাকতে তুমি কি একেলাকেই সঙ্গী করেছো? মা কিন্তু তোমাকে অনেক মিস করে। বোঝো না তুমি? কিছুতেই মা এবার তোমাকে না নিয়ে ফিরবে না।”
দুই মেয়ে একত্রে বলে।
মা কিছুটা লজ্জা পান, ফের বলেন,
“ইশ, বয়েই গেছে? এমন বুড়ো ভীমরতিতে আর পারি না। কী দরকার আছে তোদের বাবার এখানে একলা পড়ে থাকার?”
মাধবী কন্ঠে শ্লেষ করে বলে,
“তোমারই বয়ে যাবে মা। কারণ তিনি তোমার স্বামী। তুমি হলা পতিব্রতা বউ। তুমিও এতো বাড়তি কথা বলো না। জানো বাবা, মা এক ফোঁটা তোমার জন্য স্থির থাকতে পারে না।”
“কেন কেন?” বাবার জিজ্ঞাসা।
“সারাটাক্ষন তুমি কী করছো, কী খাচ্ছো, ওষুধ নিচ্ছো কী না ঠিক করে—এসব নিয়েই অস্থির।”
“আমি অস্থির??তোর বাবা স্থির থাকে কেমন করে একবার জিজ্ঞেস কর তো?”
মাধবী এবং শিউলীকে একসাথে বলে,
“আরে বোকারা, আমি জানি তোরা সবাই আমাকে নিয়ে ভাবিস। আল্লাহর কাছে দোয়া করিস, তাই হয়তো আমি স্থির। আল্লাহ সব ব্যালান্সড করেন। তা না হলে সিস্টেমে সমস্যা হতো। তোদের মা, আমার চিন্তায় যেন অসুস্থ না হন, তাই উপরে আল্লাহ আমাকে মজবুত বানিয়েছেন।”
বাবার কথায় সবাই হাসে। খাবার টেবিলে পারিবারিক আলাপের স্বর্গীয় অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু মাধবীর মন কিছুটা বিষন্ন। হঠাৎ কারো কথায় মন উদাস হয়। ফয়সাল—সে সেই ব্যক্তি, যার আচরণে মাধবী আঘাত পেয়েছিলো,অকারণ ঘৃণা সেজন্যে।
মাধবী ভালোবেসে পালিয়ে যেতে চেয়েছিলো। টাকা এবং গহনা নিয়ে এসেছিলো। কিন্তু ফয়সাল আসেনি। তার প্রতি তীব্র ঘৃণা থেকেই বাংলাদেশের প্রতি মায়া কমে গিয়েছে। মাধবী দেখতে পায়, মা-বাবার ভালোবাসা, শিউলীর সুখী সংসার—সত্যিকারের স্যাটলড জীবনই ভালো।
দেশে আসার পর খালাতো বোন পাখীর বিয়েতে হঠাৎ ফয়সালের মুখোমুখি হয়। সে দেশের খ্যাতনামা ম্যারেজ মিডিয়ার সিইও।
বিয়েতে ফয়সালকে দেখে মাধবী তাকে অপমান করে।
“তুমি বেসিক্যালি কি ভাবো? সব ভুলে গেছো?এখানে কী, কেন এসেছো?
ফয়সাল নিশ্চুপ। যথারীতি প্রস্থান করে।
মাধবী ফিরে আসার চার মাস পর। পাখী এবং তার স্বামীর তার কাছে আসে।শুনতে পায় কিছু জানতে পায়। ফয়সাল মাধবীর দুঃসম্পর্কের আত্মীয় ।কিছুদিন বাসাতেও থাকতো।ওর বাবা,মাকে মামা,মামী ডাকতো।
মাধবীর সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার সময় টাকা ও গহনা নিয়ে আসবে এটা শুনে, ফয়সাল অনুশোচনার ভোগে। মাধবী তার কথা শুনতে প্রস্তুত নয়।তার আগে,ফয়সালের মা-র চিকিৎসায়, সোবহান সাহেব সহযোগিতা করেন।
ফয়সাল মাধবীর ব্যপারে বলে,
“আমার পক্ষে এমন প্রতারণা সম্ভব নয়। মুরব্বীদের না জানিয়ে কষ্ট দেওয়া, বদদোয়া কামানো—তার জন্য আমি মাধবীর চোখে আজ খলনায়ক! তবু ও ভালো থাকুক, ওর সুন্দর পরিবার নিয়ে।”
মাধবীর বিয়ে অবশেষে তার দেশে হয়। মেয়েরা সাধারণত বরের সঙ্গে আমেরিকায় যায়, কিন্তু এবার বর-বউয়ের কল্যাণে তারা আমেরিকায় যেতে পারবে।বাড়ীতে অতিথি আলাপন,মনে হলো শহরে অনেকদিন পর আলো ঝলমলে কোলাহল। মাধবী বোঝার চেষ্টা করে, তার বিষন্নতার কারণ কী কেবল ফয়সাল?
বাসর ঘরে চুপচাপ বসে মাধবী। হঠাৎ ফয়সাল প্রবেশ করে।
“তুমি এখানে?”—মাধবী বিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করে।
“অন্য কোথায় যাবো? আজ তো আমার বিয়ে। আচ্ছা, তুমি আমার বাসর ঘরে কী করছো?”—ফয়সাল রহস্যময় হাসি দিয়ে বলে।
ফয়সাল, মাধবীকে সব সত্যি জানায়।মাধবীর বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার সময় ফয়সাল উপস্থিত থেকে সাহায্য করেছে—হাসপাতালে নেওয়া থেকে শুরু করে মায়ের রান্না করা খাবার প্রদান পর্যন্ত।সেসময় সবাই আমেরিকায়।
মাধবী বলে,
“ঋণ শোধ?
“না।একদমই না।দেখো মাধবী, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ভালোবাসা ঠিক ততখানিই নিঃস্বার্থ। ঋণ ফিরিয়ে নিতে হয় এমন তো নয়? মানুষ মানুষের জন্য এমন সত্য সুন্দর অনুভূতি রাখে।”
মাধবী চোখে সত্যটা দেখল—ফয়সালের ন্যায়পরায়ণতা, সেবা এবং আন্তরিকতা।এছাড়া পরিবারের ওপর দায়িত্ব, মায়ার ভারে সব অবসান। সে শান্ত হলো। সব ভুল বোঝাবুঝি, ঘৃণা, প্রতারণা—সবকিছু যেন ধুলো হয়ে গেল।
শহর জুড়ে তার আসার কোলাহল শেষ, কিন্তু হৃদয়ের শান্তি শুরু হল নতুন রূপে।


