বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬
এডিটরস পিক

প্রাচীনকালে যেমন ছিলো বাংলার বিবাহভোজ

food-ancient-nov-1

বিয়ের দাওয়াত পেলে সব চেয়ে কৌতুহলের বিষয় থাকে বিয়ে বাড়ির ভোজ টা নিয়ে। কি কি থাকবে দাওয়াতের ভোজে তা নিয়ে যত মাতামাতি মেহমানদের। এত ডেকোরেশন কত আলোকসজ্জা তা নিয়ে এতটা মাথাবেথা নেই কারওই তবে যদি বিবাহভোজটা খারাপ হয়ে যায় তা হয়ে যায় বিরাট সমস্যা। কেননা বিয়ে বাড়ির প্রধান আকর্ষণ বিবাহভোজটা-ই। তাই চলুন আজকে যেনেনি কেমন ছিল অতীতের বিবাহভোজ আমাদের ? কী কী খাওয়ার চল ছিল তখন?  

সাহিত্যে ঘাটলেই যানা যায় আমাদের অতীতের বিয়েবাড়ির দাওয়াতগুলো কেমন ছিলো। ‘ভারতের বিবাহের ইতিহাস’ বইয়ে উল্লেখ, বৈদিক যুগে ভারতীয়  বিয়েতে বিশেষ কোনো আচার-অনুষ্ঠান হতো না। তখনকার দিনে আজকের মতো খাবারের এত ধুম পড়ত না। তখন ভারতে জাতপাতের কারণে সবার হাতের রান্না সবাই খেত না। বিয়েতে বাহারি আনুষ্ঠানিকতার চল শুরু হয় গৃহসূত্রসমূহের যুগে। তাই এই অঞ্চলে প্রাচীনকালে বিয়ের খাবারের সম্পর্কে জানতে হলে, গৃহসূত্রসমূহ ও অথর্ববেদ যুগের পর থেকে কথা শুরু করতে হবে। 

ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন রায়ের ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’ বইয়ের কিছু অংশে খুজে পাওয়া যায় প্রাচীনকালের বিয়ের খাবার কেমন ছিল এই অঞ্চলের। উচ্চকোটির বিয়ের ভোজে ঘি সহযোগে ধূমায়িত ভাত খাওয়ার চল ছিল বলে বই থেকে জানা যায়। সমাজের এই স্তরের মানুষেরা বিয়ের অনুষ্ঠানে এত বেশি পদের নিরামিষ ও আমিষ পরিবেশন করতো যে, গুনে শেষ করা যেত না! মাছ ও মাংসে ভরা থাকতো বিয়ের পুরো পাত।

আরেকটি গ্রন্থ, শ্রীহর্ষ লিখিত ‘নৈষধচরিত’ থেকে জানা যায় প্রাচীন বিবাহভোজে মাছ, হরিণ, ছাগল ও পাখির অসংখ্য পদ থাকত। খেয়ে শেষ করা তো দূরের কথা, অতিথিরা ডিশের সংখ্যা গুনেও শেষ করতে পারতেন না! সেকালে বাঙালির বিয়েতে হরিণের মাংস ছিল প্রায় বাধ্যতামূলক। এছাড়া পিঠাপুলিরও আয়োজন থাকতো ব্যাপক।  আরও একটি জিনিস জানা যায় যে, সেকালে  বিয়ের খাবারের উপকরণ আসত নিজেদের চাষাবাদ থেকেই। নিজেদের খেতের চাল, পুকুরের মাছ এবং জমির সবজি দিয়েই তৈরি হতো নানান পদ। বাইরে থেকে কিছু আনা হতো না বা বাজার করা হতো না। 

সাহিত্য থেকেই মেলে আরও তথ্য, বেহুলা-লখিন্দরের বিয়েতে নিরামিষের পাশাপাশি আমিষও। এই বিয়ের নিরামিষের তালিকায় ছিল ঘি কিংবা তেলে ভাজা বেতের কচি ডগা, বারোমাসি বেগুনভাজা, ঘি দিয়ে ভাজা হেলেঞ্চাশাক, তেলে ভাজা পাটশাক, কচি লাউ শাকভাজা, মুগ ডাল, তিলুয়া, ঘিয়ে ভাজা মুগের বড়ি, তিলের বড়া, তিল দিয়ে মিষ্টিকুমড়ো, ঝাল দিয়ে চই, মেটে আলুর তরকারি, পাকা কলার অম্বল বা টক ও আদা দিয়ে রান্না করা শুক্তো। এই শুক্তো অবশ্য বর্তমানের মতো ছিল না। তখন একে ‘তিতো’ বলা হতো। বেগুন, কাঁচা কুমড়া, কাঁচকলা ও মোচাবাটা মসলা কিংবা বেসনের সঙ্গে মেখে রান্না করা। যুক্ত করা হতো হিং, জিরা ও মেথি। এবার বলা যাক মাছের পদের কথা। ছিল চিতল, মহাশোল, মাগুর, কই, ছোট চিংড়ি, রুই, পোনা মাছ, কাতল, পাবদা, খলশে, বোয়াল ও ইলিশ। রান্না হয়েছিল চিতলের কোল, ঝাল দিয়ে মাগুর মাছের ঝোল, মহাশোলের অম্বল, কই মাছ ভাজা, রুই মাছের মাথা দিয়ে মাষকলাইয়ের ডাল, পাবদা মাছ দিয়ে শুক্তো, আম দিয়ে কাতল মাছ, আমচুর দিয়ে শোল মাছের পোনা, খলশের অম্বল, বোয়াল মাছের ঝাঁটি, ইলিশ ভাজা ইত্যাদি।লখিন্দরের জন্য রান্না হয়েছিল হরিণ, খাসি, কবুতর, ভেড়া, কচ্ছপ—এই পাঁচ প্রাণীর মাংস। সে সময় তরকারি রান্না করা হতো তেল ও ঘি দিয়ে। তার জন্য ছিল পিঠাও। চন্দ্রপুলি, দুধ ক্ষীরশা, মনহরা, চন্দ্রকাতি, লাল বড়া, রুটি পিঠা, দুধ চুহির উপস্থিতি ছিল ওই বিয়ের মেনুতে।লখিন্দরের পাতে প্রথমে তুলে দেওয়া হয়েছিল তেলে ভাজা শাক। পরে শুক্তো এবং ঝাল খাবার। এরপর অম্বল ও পিঠেপুলি। সবশেষে মুখশুদ্ধির জন্য দেওয়া হয়েছিল পানসুপারি। তখনকার দিনে নিরামিষ পদ চাখতে চাখতেই অতিথিদের পেট ভরে যেত। তাই মাংস-মাছ বেশি খাওয়ার যায়গাই থাকতো না আর পেটে। এ পর্যন্ত আমরা যা শুনলাম তা ছিলো বিয়েতে কনেপক্ষের আপ্যায়নের চালাকি। 

১৮০০ সালের আগে বাংলায় হিন্দু বিয়েবাড়িগুলোতে রান্না করা খাবারের প্রচলন তেমন ছিল না। ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণ যে বাড়িতেই বিয়ে হোক, ব্রাহ্মণ ভোজই ছিল আবশ্যিক। যদিও সেকালে ব্রাহ্মণকে রান্না করে খাবার দেওয়া হতো না। যে পদ্ধতিতে দেওয়া হতো, সেটিকে বলা হয় ‘সিধা’। এর মধ্যে থাকত বিভিন্ন সবজি, বাতাসা ইত্যাদি। 

ঊনবিংশ শতাব্দীর দিকে বিয়ের প্রধান খাবার হিসেবে থাকত ফলাহার। মূল উপকরণগুলো ছিল চিড়া, দই, ঘি, আম, কাঁঠালি, কলা, মণ্ডা, বাতাসা ইত্যাদি। তখন ব্রাহ্মণেরা অন্য জাতের রান্না করা খাবার না খেলেও বিয়ের অনুষ্ঠানে বসেই ফলাহার করতেন। এ সময় কিছু ধনী বাঙালির বাড়ির বিয়েতে নিরামিষ খাবার রান্না শুরু হয়েছিল। 

১৮৭০ সালের দিকে বাংলায় ময়দার প্রচলন ঘটে। তাতে বদলে যায় বিয়ের খাবারের ধরন। ময়দার লুচির সঙ্গে আলুনি কুমড়ার ছক্কা তুলে দেওয়া শুরু হয় অতিথিদের পাতে।

এর কিছু সময় পর থেকে বাংলায় ‘বিলাতি কুমড়া’ নামে একটি সবজির প্রচলন ঘটে। তখন ধনী বাড়ির বিয়েতে ওই কুমড়ার ঘন্ট লুচির সঙ্গে দেওয়ার চল শুরু হয়। ঠিক তখনই বাঁধাকপির প্রচলনও শুরু বাঙালির বিয়েরভোজে। আর লুচি পরিবর্তিত হয়ে রূপ নেয় কচুরিতে। কলাইয়ের ডালবাটা, আদা ও মৌরি যোগে ময়দার ভেতরে পুর দিয়ে বিয়ের অতিথিদের জন্য তৈরি হতো কচুরি। পরিবেশন করা হতো বড় মাটির সরায়। তাতে আরও থাকত নিমকি, মতিচুর, খাজা, চারকোনা গজা ইত্যাদি। শেষ পাতে দেওয়া হতো দই ও ক্ষীর। 

১৮৭৩ সালের পরে বিয়েবাড়ির মেনুতে ঢুকে বিখ্যাত রসগোল্লা। সঙ্গে দেওয়া হতো তিলকুট ও বিভিন্ন সন্দেশ, যেগুলোর মধ্যে ছিল কামরাঙা সন্দেশ, আম সন্দেশ, কড়া পাঁকের সন্দেশ প্রভৃতি।

ইংরেজি শিক্ষা প্রচলনের পর থেকে বদলে যায় বিয়েবাড়ির খাবারের আয়োজন। কুমড়োর ছক্কার জায়গা দখল করে নেয় ছোলার ডাল ও আলুর দম। এই শতকের শেষ দিকে বিয়ের খাবারের তালিকায় যোগ হয় চাটনির সঙ্গে পাঁপর। তো এই ছিলো অতীতের বিয়ে বাড়ির ভোজের আয়োজন। যা ধিরে ধিরে বদলাতে থাকে কালের বিবর্তনের সাথে সাথে।  আর এখনতো পুরোই বদলে গিয়েছে কলকাতার বিয়েরভোজ একরকম আবার বাংলাদেশের বিয়েরভোজ আরেকরকম। আনেকে আবার ইংরেজি বিবাহভোজও বেছে নেন তাদের দাওয়াতের মেনুতে।