কোরিয়ানরা কেন কালো–সাদা পোশাকেই স্বচ্ছন্দ?

সিউলে ঘুরতে গেলে পর্যটকদের চোখে প্রথম যে বিষয়টি ধরা পড়ে তা শুধু কিমচি বা কেপপ নয়। বরং রাস্তাঘাটে হাঁটতে হাঁটতে অনেকেই অবাক হন কোরিয়ানদের পোশাকের রঙ দেখে। চারপাশে তাকালেই দেখা যায় কালো, সাদা আর ধূসর রঙের আধিক্য। যেন পুরো শহরটাই একরঙা। পরিসংখ্যান বলছে, কোরিয়ায় পরা মোট পোশাকের ৬০ শতাংশের বেশি এই তিনটি রঙের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু কেন এমনটা?
৩২ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক ইসাবেল স্মিথ প্রথমবার সিউলে এসে বিষয়টি স্পষ্টভাবে টের পান। তিনি বলেন, “চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম, প্রায় সবাই কালো, সাদা বা ধূসর পোশাক পরেছে।” যুক্তরাষ্ট্রে রঙিন পোশাক ও গাঢ় মেকআপে অভ্যস্ত স্মিথ সিউলের ভিড়ে নিজেকে একটু আলাদা মনে করেছিলেন।
একবার তিনি কমলা রঙের কানের দুল কিনতে গিয়ে শুনলেন, কোরিয়ায় সেই রঙের ডিজাইন রাখা হয় না। কারণ খুব সহজ। এই রঙের চাহিদাই নেই।সিজে লজিস্টিকসের ‘এভরিডে লাইফ রিপোর্ট’ অনুযায়ী, কোরিয়ায় পোশাকের মধ্যে কালো রঙের অংশ ৩৮ শতাংশ, সাদা ১৫ শতাংশ এবং ধূসর ৯ শতাংশ। সব মিলিয়ে একরঙা পোশাকের হার দাঁড়ায় ৬২ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিসংখ্যান কোরিয়ানদের বাস্তব পছন্দকেই তুলে ধরে।৩৪ বছর বয়সী কওন ইউন-জির আলমারিতে বেশির ভাগ পোশাকই কালো, সাদা আর নেভি ব্লু। একসময় লাল ডোরা দেওয়া একটি শার্ট তাঁর পছন্দ হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি নেভি রঙটাই কিনেছিলেন। কারণ, লাল রংটা বেশি চোখে পড়বে, এই ভয়।
একদিন অফিসে হলুদ কার্ডিগান পরে যাওয়ার পর সহকর্মীদের মন্তব্য তাঁকে অস্বস্তিতে ফেলে। কওন বলেন, “আমি চাই না কেউ আমার পোশাক নিয়ে আলাদা করে কথা বলুক। শুধু সবার সঙ্গে মিশে থাকতে চাই।”একটি জরিপে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের ৪১ শতাংশ ইচ্ছাকৃতভাবেই একরঙের পোশাক বেছে নেয়, যেন তারা আলাদা করে নজরে না পড়ে। দলগত মূল্যবোধে বিশ্বাসী সমাজে খুব আলাদা পোশাক অনেক সময় নীরব সামাজিক চাপ তৈরি করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে রয়েছে কোরিয়ান সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাস। নিরপেক্ষ রং এখানে বিনয়, সংযম ও সামঞ্জস্যের প্রতীক। একসময় কোরিয়ানদের বলা হতো ‘সাদা পোশাকের মানুষ’। কারণ, ঐতিহ্যবাহী সাদা হানবক ছিল তাদের দৈনন্দিন পোশাক।সময় বদলেছে, রুচিও বদলেছে। আজ সাদা রঙের জায়গা নিয়েছে কালো ও ধূসর। এই রংগুলো এখন পরিশীলন, স্থিরতা ও আধুনিকতার প্রতীক।
আধুনিক জীবনের ব্যস্ততাও এই প্রবণতাকে শক্ত করেছে। ৩৩ বছর বয়সী অফিসকর্মী পার্ক নাম-জিন বলেন, “এক রঙের পোশাক সহজে অন্য পোশাকের সঙ্গে মেলে। সকালে তৈরি হতে সময় কম লাগে, আবার দেখতেও গোছানো লাগে।”ফ্যাশন বিশেষজ্ঞদের মতে, কালো ও সাদা পোশাক কখনোই দ্রুত পুরোনো হয়ে যায় না। ট্রেন্ড বদলালেও এই রংগুলো সব সময় মানানসই থাকে।
শীতকালে সিউলের রাস্তায় তাকালেই চোখে পড়ে কালো লং প্যাডেড জ্যাকেটের সারি। কারণ খুব বাস্তব। এই জ্যাকেটগুলো দামি, বারবার কেনা হয় না। আর কালো রং সহজে ময়লা ঢেকে রাখে।একজন ফ্যাশন বিশেষজ্ঞের ভাষায়,“কোরিয়ায় রং শুধু ফ্যাশনের বিষয় নয়, এটি মানিয়ে চলার প্রতীক। আপনি কী পরছেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনি চারপাশের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।”



