বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬
এডিটরস পিক

নারী অধিকার ও বাক্‌স্বাধীনতার অদম্য সৈনিক—হ্যারিয়েট ফ্লেইশল পিলপেল

IMG-20251128-WA0007

হ্যারিয়েট ফ্লেইশল পিলপেল ছিলেন আমেরিকার বিশ শতকের অন্যতম প্রভাবশালী নারী অধিকারকর্মী, অ্যাটর্নি এবং নাগরিক স্বাধীনতার শক্ত কণ্ঠস্বর। ১৯১১ সালের ২ ডিসেম্বর নিউ ইয়র্কে জন্ম নেওয়া হ্যারিয়েট শৈশব থেকেই ছিলেন যুক্তিবাদী ও সামাজিক ন্যায়বিচারে বিশ্বাসী। পরবর্তীতে আইনকে তিনি নিজের সংগ্রামের অস্ত্র হিসেবে বেছে নেন। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষে ১৯৩৬ সালে কলম্বিয়া ল’ স্কুল থেকে আইন ডিগ্রি অর্জন করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে নারী আইনজীবীদের প্রথম সারির নেতৃস্থানীয় মুখ হয়ে ওঠেন।

১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (ACLU)-এর নেতৃত্বের বড় অংশই ছিলেন পুরুষ। তাঁদের অনেকেই মনে করতেন গর্ভপাতের অধিকার বা জন্মনিয়ন্ত্রণ আইনকে ACLU–র কর্মকাণ্ডের আওতায় আনা উচিত নয়। কিন্তু হ্যারিয়েট পিলপেল সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ করেন।

গর্ভপাতবিরোধী আইন মূলত দরিদ্র নারী, অবিবাহিত নারী ও সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক। নারী নিজের শরীর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা না পেলে নাগরিক স্বাধীনতার ধারণাই অসম্পূর্ণ।

হ্যারিয়েট এবং তাঁর সহকর্মীরা বিষয়টিকে “শ্রেণিভিত্তিক বৈষম্যমূলক আইন” বলে উল্লেখ করে ACLU–এর নীতিনির্ধারকদের রাজি করাতে সক্ষম হন। তাঁদের চাপ ও যুক্তির ফলে ACLU অবশেষে প্রজনন অধিকারকে তাদের অগ্রাধিকারকৃত ইস্যু হিসেবে গ্রহণ করে।

মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রায় Roe v. Wade মামলার আগে হ্যারিয়েট আইনজীবীদের জন্য একটি কঠোর Mock Court বা মহড়ার আয়োজন করেন। সুপ্রিম কোর্টে জটিল সাংবিধানিক প্রশ্ন, নারী অধিকার, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং চিকিৎসাবিদ্যার নৈতিকতার সংমিশ্রণে যে বিতর্ক তৈরি হবে, তার জন্য প্রস্তুত করাটাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।

বিদ্যায়তনিক জ্ঞান ও আইনি কৌশল—দুটোই মিলিয়ে হ্যারিয়েটের করা এই প্রস্তুতি ছিল মামলার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। পরবর্তীতে Roe v. Wade যুক্তরাষ্ট্রে নারীর গর্ভপাত-সংক্রান্ত সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় মৌলিক ভূমিকা রাখে।

বাক্‌স্বাধীনতার ক্ষেত্রে অবদান

হ্যারিয়েট শুধু নারীর শরীরের অধিকার নিয়েই কাজ করেননি; তিনি ছিলেন বাক্‌স্বাধীনতা, শিল্পী-স্বাধীনতা ও প্রকাশনার স্বাধীনতার একজন জ্বলন্ত রক্ষক।

বিখ্যাত লেখক, পরিচালক, গবেষক ও প্রকাশকদের তিনি আইনি সুরক্ষা দিয়েছেন। তাঁর ক্লায়েন্টদের মধ্যে ছিলেন—

আলফ্রেড কিনসে   মানব যৌনতা নিয়ে প্রথাবিরোধী গবেষণার পথিকৃৎ বেটি ফ্রিডান  নারীবাদী আন্দোলনের প্রভাবশালী লেখিকা, NOW (National Organization for Women)–এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা মেল ব্রুকস  বিখ্যাত কমেডিয়ান, চলচ্চিত্র নির্মাতা স্ভেতলানা অ্যালিলুয়েভা  সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্তালিনের কন্যা, যিনি যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় চান হ্যারিয়েটের আইনি ভূমিকা শুধু আদালত পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি প্রকাশনা শিল্পে সেন্সরশিপ, আপত্তিকর বলে গণ্য করা শিল্পকর্ম, এবং যৌনতা নিয়ে গবেষণার বিরুদ্ধে উঠা নানা অভিযোগ থেকে লেখক ও প্রকাশকদের রক্ষা করেছেন। তার কাজের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আরও দৃঢ় ভিত্তি পায়।

নাগরিক স্বাধীনতার বিস্তৃত ক্ষেত্রজুড়ে কাজ

নারী অধিকার ও বাকস্বাধীনতা ছাড়াও তিনি জন্মনিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করেন, নাবালক ও কিশোরদের যৌনশিক্ষা সংক্রান্ত অনেক মামলায় কাজ করেন, প্রকাশনা শিল্পের আইনি কাঠামো নির্মাণে অভিজ্ঞ পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন, ACLU–র নীতিনির্ধারণে দশকের পর দশক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তার আইনি লেখালেখি, নীতি প্রণয়নে পরামর্শ এবং আদালতবিষয়ক গবেষণা—সব মিলিয়ে তিনি আমেরিকার নাগরিক স্বাধীনতার ইতিহাসে এক অনিবার্য নাম।

ব্যক্তিজীবন ও উত্তরাধিকার

হ্যারিয়েটের মৃত্যু হয় ১৯৯১ সালের ২৩ এপ্রিল। মৃত্যুর পরও তাঁর কাজের প্রভাব অক্ষুণ্ণ নারী অধিকার, প্রজনন স্বাধীনতা, প্রকাশনার স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার নিয়ে যেসব আইনি যুদ্ধ আজও চলছে, তার ভিত্তি তিনি বহু আগেই তৈরি করে গেছেন।

তাঁকে আজও স্মরণ করা হয়  নারী অধিকার আন্দোলনের পথপ্রদর্শক হিসেবে, আইনি কৌশলের অসাধারণ স্থপতি হিসেবে, বাকস্বাধীনতার দৃঢ়তম রক্ষক হিসেবে, প্রজনন অধিকারকে মূলধারার নাগরিক স্বাধীনতার আলোচনায় এনে বিপ্লব ঘটানোর নেত্রী হিসেবে, হ্যারিয়েট ফ্লেইশল পিলপেল ছিলেন এমন এক নারী যিনি নিজের বুদ্ধি, দৃঢ়তা ও ন্যায়বোধকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক স্বাধীনতার ইতিহাসে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন।