ফেলে দেওয়া কুমড়ার খোসা দিয়েই তৈরি হলো পরিবেশবান্ধব ফুড প্যাকেজিং

খাবার সংরক্ষণে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছেন জাপানের গবেষকরা। সাধারণত ফেলে দেওয়া কুমড়ার খোসা ব্যবহার করে তারা এমন একটি জৈব-বিয়োজ্য (বায়োডিগ্রেডেবল) খাদ্য প্যাকেজিং উপাদান তৈরি করেছেন, যা ফল ও সবজিকে দীর্ঘ সময় সতেজ রাখতে সক্ষম। একই সঙ্গে এটি প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশ দূষণও হ্রাস করতে পারে।
জাপানের কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়ের (Kyushu University) একদল গবেষক এই উদ্ভাবন করেছেন। গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ফুড রিসার্চ ইন্টারন্যাশনাল (Food Research International)-এ প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে উৎপাদিত ফল ও সবজির প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায়। সঠিক প্যাকেজিং ব্যবহারে এই অপচয়ের বড় একটি অংশ রোধ করা সম্ভব হলেও বর্তমানে ব্যবহৃত প্লাস্টিকভিত্তিক প্যাকেজিং পরিবেশের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের অধ্যাপক ফুমিহিকো তানাকা বলেন, তাদের গবেষণাগার দীর্ঘদিন ধরে এমন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে, যা একদিকে কৃষিপণ্যের সংরক্ষণকাল বাড়াবে, অন্যদিকে পেট্রোলিয়ামভিত্তিক প্লাস্টিকের ওপর নির্ভরতা কমাবে।
এই লক্ষ্যেই গবেষকরা কৃষিজ বর্জ্যকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেন। তারা কুমড়ার খোসা ব্যবহার করেন, যা সাধারণত ফলটির মোট ওজনের প্রায় ১০ শতাংশ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফেলে দেওয়া হয়।
গবেষণায় কুমড়ার খোসাকে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে কার্বন কোয়ান্টাম ডটস (Carbon Quantum Dots বা CQDs) নামের অতিক্ষুদ্র ন্যানোকণা তৈরি করা হয়। প্রায় ১০ ন্যানোমিটার আকারের এই কণাগুলোতে রয়েছে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ও অতিবেগুনি রশ্মি প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্য। ফলে এগুলো ফল ও সবজির পৃষ্ঠে জীবাণুর বৃদ্ধি কমাতে এবং অতিরিক্ত আলোজনিত ক্ষয় ও রঙ পরিবর্তন রোধে সহায়তা করে।
পরে এই ন্যানোকণাগুলোকে কার্বক্সিমিথাইল সেলুলোজ ও জেলাটিনের সঙ্গে মিশিয়ে একটি বিশেষ কম্পোজিট ফিল্ম তৈরি করা হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, এতে ৩ শতাংশ CQDs যোগ করার ফলে প্যাকেজিংয়ের শক্তি প্রায় ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে এটি জলীয় বাষ্পের প্রবেশও কমিয়ে দেয়, ফলে পরিবহনের সময় ধাক্কা, কম্পন ও আর্দ্রতার কারণে ফল-সবজির ক্ষতি অনেকটাই কমে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ফুমিনা তানাকা জানান, প্রচলিত অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল খাদ্য প্যাকেজিংয়ে সাধারণত জিঙ্ক অক্সাইড বা রুপার মতো ধাতব ন্যানোকণা ব্যবহার করা হয়, যা পরিবেশের ওপর তুলনামূলক বেশি প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে কুমড়ার খোসা থেকে তৈরি CQDs সম্পূর্ণ জৈব উৎস থেকে তৈরি হওয়ায় এটি পরিবেশবান্ধব এবং খাদ্যের সংস্পর্শে ব্যবহারের জন্যও নিরাপদ।
এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাই করতে গবেষকরা চেরি টমেটো সংরক্ষণের ওপর পরীক্ষা চালান। পরীক্ষায় CQDs-যুক্ত প্যাকেজিংয়ে রাখা টমেটো সাধারণ বা প্রচলিত প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের তুলনায় দীর্ঘ সময় সতেজ থাকে। এতে জীবাণুর বৃদ্ধি কমে, ওজন হ্রাস ধীর হয় এবং ফল নরম হওয়ার প্রক্রিয়াও উল্লেখযোগ্যভাবে বিলম্বিত হয়।
গবেষণার প্রধান লেখক এম.এ. রেশাকা কাভিন্দি জানান, নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বিভিন্ন পরীক্ষা চালানো হয়েছে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট মাত্রার নিচে এই উপাদান মানবদেহের জন্য বিষাক্ত নয়। এছাড়া প্যাকেজিংয়ের আবরণ অত্যন্ত পাতলা হওয়ায় এর সংস্পর্শও খুবই সীমিত। প্রয়োজন হলে ফল ধুয়ে বা খোসা ছাড়িয়েও ব্যবহার করা যাবে।
গবেষকদের মতে, এই উপাদান শুধু প্যাকেট তৈরিতেই নয়, ফল বা সবজির ওপর সরাসরি স্প্রে করেও ব্যবহার করা সম্ভব। এতে পুরো ফল ঢাকার পরিবর্তে কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ অংশে প্রলেপ দেওয়া যাবে, যা প্যাকেজিং উপকরণের ব্যবহার ও খরচ দুটিই কমাবে।
ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির সঙ্গে প্রাকৃতিক অ্যান্টিফাঙ্গাল উপাদান, যেমন এসেনশিয়াল অয়েল যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে ছত্রাক প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও বাড়ানো যায়।
অধ্যাপক ফুমিহিকো তানাকা বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এক শিক্ষার্থীর ধারণা থেকেই এই গবেষণার সূচনা। এশিয়ার অনেক অঞ্চলে এখনও কোল্ড-চেইন বা শীতল পরিবহন ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। তাই সাধারণ তাপমাত্রায় খাদ্য দীর্ঘদিন সংরক্ষণে সক্ষম এই প্রযুক্তি উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্য অপচয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষকরা আরও আশা করছেন, ভবিষ্যতে এই উপাদান ব্যবহার করে অতিবেগুনি আলোয় দৃশ্যমান লেখা বা নকশা তৈরি করা সম্ভব হবে, যা খাদ্য প্যাকেজিংয়ে নতুন মাত্রা যোগ করবে।



