সেন্টমার্টিনে দুই মাস রাত্রিযাপন

বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিন এবার নতুন নিয়মে পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর ১ ডিসেম্বর থেকে কক্সবাজার–সেন্ট মার্টিন নৌরুটে যাত্রীবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। তবে দ্বীপের নাজুক পরিবেশ রক্ষায় এবার বেশ কিছু কঠোর বিধিনিষেধ চালু হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রতিদিন ২ হাজারের বেশি পর্যটক সেন্ট মার্টিনে প্রবেশ করতে পারবেন না।
আগের মতো টেকনাফ থেকে নয় এবার নৌযানগুলো ছাড়ছে কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া জেটিঘাট থেকে। চারটি জাহাজ এমভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেস, এমভি বারো আউলিয়া, কেয়ারি সিন্দাবাদ এবং কেয়ারি ক্রুজ অ্যান্ড ডাইন এই পথে চলাচলের অনুমতি পেয়েছে। জাহাজগুলো প্রতিদিন সকাল ৭টায় কক্সবাজার ছাড়বে, আর পরদিন দুপুর ৩টায় সেন্ট মার্টিন থেকে ফিরে আসবে। এভাবে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত পর্যটকেরা দ্বীপে রাত্রিযাপনের সুযোগ পাবেন।
অনলাইনে টিকিট, ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোড বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দ্বীপে ঢোকার আগে টিকিট কেনার প্রক্রিয়া এবার আরও নিয়মতান্ত্রিক। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের স্বীকৃত ওয়েব পোর্টাল থেকেই টিকিট কিনতে হবে। টিকিটে থাকবে ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোড। কিউআর কোড ছাড়া টিকিট বাতিল করা হবে। যাচাইয়ের জন্য সেন্ট মার্টিন ও নুনিয়ারছড়ার জেটিঘাটে আলাদা চেকিং থাকবে।

সেন্ট মার্টিন একটি সুপার সংবেদনশীল ভৌগোলিক এলাকা। এখানে রয়েছে প্রবালভিত্তিক বাস্তুতন্ত্র, সামুদ্রিক কাছিম, বিরল পাখি, রাজকাঁকড়া, নানা প্রজাতির শামুক–ঝিনুকসহ অসংখ্য জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়। এগুলো টিকে রাখতে সরকার ১২ দফা নির্দেশনা জারি করেছে। আর সেই নির্দেশনাগুলো এবার কঠোরভাবে মানতে হবে।
নতুন ১২ নির্দেশনার প্রধান দিকগুলো
- রাতে সৈকতে কোনো আলো জ্বালানো যাবে না। সমুদ্রকচ্ছপ ডিম দেয় রাতে; আলো তাদের স্বাভাবিক আচরণ ব্যাহত করে।
- রাতে শব্দ বা পার্টি নিষিদ্ধ। বার-বি-কিউ, সাউন্ড সিস্টেম বা উচ্চশব্দে সঙ্গীত কোনোটাই নয়।
- প্রবাল, কাছিম, পাখি বা যেকোনো জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি কঠোরভাবে দণ্ডনীয়।
- কেয়াবনে প্রবেশ বা কেয়া ফল সংগ্রহ নিষিদ্ধ। এই বনই মূলত দ্বীপের প্রাকৃতিক বর্ম।
- সৈকতে মোটরসাইকেল বা মোটরচালিত যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ।
- পলিথিন ও একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক বর্জন। যেমন চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিক চামচ–কাঁটা, স্ট্র, সাবান–শ্যাম্পুর ছোট প্যাক, বড় প্লাস্টিক বোতল ইত্যাদি।
- নিজস্ব পানির ফ্লাস্ক নেওয়ার পরামর্শ।
এবার সময়সূচিও সুনির্দিষ্ট।
নভেম্বর: শুধু দিনের বেলায় যাওয়া–আসা।ডিসেম্বর–জানুয়ারি: রাত্রিযাপন অনুমোদিত।ফেব্রুয়ারি: দ্বীপে পর্যটক যাতায়াত সম্পূর্ণ বন্ধ। প্রকৃতিকে বিশ্রাম দেওয়ার সময়।
চলতি মৌসুমের শুরুতে রাতের থাকার অনুমতি না থাকায় জাহাজ চলাচল বন্ধ ছিল। ডিসেম্বর থেকে রাত্রিযাপন শুরু হওয়ায় পর্যটকদের আগ্রহ আবার বাড়ছে। অপারেটরদের মতে, এবার দ্বীপ ভ্রমণে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
সেন্ট মার্টিন ছোট কিন্তু অত্যন্ত ভঙ্গুর। অতিরিক্ত ভ্রমণ, আবর্জনা, বেপরোয়া নৌ–পরিবহন, রাতে আলোর উৎসব সবই গত এক দশকে দ্বীপের জীববৈচিত্র্যে বড় ক্ষতি করেছে। এই নতুন নিয়মগুলো—সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, টিকিট যাচাই, পরিবেশ–বান্ধব আচরণ দ্বীপটিকে দীর্ঘমেয়াদে বাঁচিয়ে রাখতে সহায়ক হবে।
সেন্ট মার্টিন শুধু ভ্রমণ গন্তব্য নয়। এটি বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক ইকোলজি। আমরা যদি দায়িত্বশীল থাকি, তবে দ্বীপটি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও সৌন্দর্য বজায় রাখতে পারবে।



