বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ১০ জুন, ২০২৬
ভ্রমণ

পুরাতন ঢাকার ঐতিহাসিক নিদর্শন রোজ গার্ডেন

IMG-20251012-WA0019

ঢাকার পুরান অংশের গলি-ঘুপচি পেরিয়ে যখন হৃষিকেশ দাস লেনে পৌঁছানো হয়, তখন চোখে পড়ে শ্বেতশুভ্র এক প্রাসাদ ‘রোজ গার্ডেন প্যালেস’। এটি এমন একটি স্থাপনা যেটি সময়ের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসের যেন এক জীবন্ত দলিল। একদিকে রাজকীয় স্থাপত্যের সৌন্দর্য, অন্যদিকে রাজনৈতিক ইতিহাসের ছোঁয়া সব মিলিয়ে রোজ গার্ডেন যেন এক ঐতিহাসিক মহিমার প্রতীক।

রোজ গার্ডেনের গল্প শুরু হয় বিংশ শতকের ত্রিশের দশকে। ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ঋষিকেশ দাস ছিলেন এই প্রাসাদের স্বপ্নদ্রষ্টা। জনশ্রুতি আছে, বলধা গার্ডেনে আয়োজিত এক সামাজিক অনুষ্ঠানে অপমানিত হয়ে তিনি ঠিক করেন নিজের জন্য নির্মাণ করবেন এক অনন্য অট্টালিকা। সেই অট্টালিকায় জাঁকজমক, সৌন্দর্য ও মর্যাদা মিলেমিশে থাকবে একাকার। সেই স্বপ্ন থেকেই গড়ে ওঠে ‘রোজ গার্ডেন’।

প্রায় ২২ বিঘা জমির ওপর তৈরি এই প্রাসাদ ঘিরে একসময় ছিল রঙিন গোলাপের বাগান। সেখান থেকেই নামের উৎপত্তি ‘রোজ গার্ডেন’। আজও নামটি ঢাকার ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। যদিও সেই বিশাল গোলাপবাগান এখন শুধু ইতিহাসের পাতাতেই বিদ্যমনা।

রোজ গার্ডেনের স্থাপত্যরীতি যেন ইউরোপীয় প্রাসাদের এক প্রতিচ্ছবি। পুরো ভবনজুড়ে দেখা মেলে নব্য ধ্রুপদী (Neo-Classical) শৈলীর প্রভাব। প্রকাণ্ড করিন্থীয় স্তম্ভ, অর্ধবৃত্তাকার খিলান, অর্ধচন্দ্রাকৃতির ব্যালকনি এবং শ্বেতপাথরের মার্বেল সিঁড়ি মিলিয়ে সৃষ্টি করেছে এক রাজকীয় আভা।

প্রাসাদের প্রতিটি দরজা ও জানালায় রয়েছে জটিল জ্যামিতিক ও লতাপাতার নকশা, রঙিন বেলজীয় কাঁচের অলংকার, কাঠের কারুকাজে ফুটে ওঠা প্রাণীর অবয়ব। ভবনের প্রবেশমুখে দু’পাশে স্থাপিত নারী ভাস্কর্য যেন সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

অট্টালিকার ভেতরে রয়েছে বিশাল বলরুম। এই বলরুমে একসময় সঙ্গীত, নৃত্য ও সামাজিক আসর বসত। সাদা ও সবুজ কাচে তৈরি ফুলেল নকশার সিলিং সেই রাজকীয় দিনের স্মৃতি বহন করে। বলরুমের পাশেই রয়েছে ঘূর্ণাবর্ত সিঁড়ি। এই সিঁড়ি দিয়েই ছাদে ওঠার পথ, যদিও এখন দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ।

প্রাসাদের সামনে রয়েছে শানবাঁধানো পুকুর, ফোয়ারা এবং মার্বেলভিত্তিক ভাস্কর্য। সবুজ ঘাসে ঘেরা চত্বর, তাল ও নারকেল গাছের ছায়া, আর ভাস্কর্যের নিস্তব্ধ উপস্থিতি মিলিয়ে রোজ গার্ডেনকে করে তুলেছে ঢাকার এক শান্ত, ঐন্দ্রজালিক কোণ।

রোজ গার্ডেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরও এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এখানেই ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন অনুষ্ঠিত হয়েছিল এক সভা। সেই সভায় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই দল পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে রূপ নেয়।

এই প্রাসাদে বহু সময় রাজনৈতিক নেতাদের মিলনমেলা ঘটেছে। বলা হয়ে থাকে, তৎকালীন ঢাকার অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এখানেই গৃহীত হয়েছিল। সেই সময়ের অতিথিদের মধ্যে ছিলেন দেশবরেণ্য রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক ও সমাজনেতারা। তাই রোজ গার্ডেন বাংলাদেশের ইতিহাসের এমন এক অংশ যা স্বাধীনতার পথরেখার সাক্ষী।

প্রাসাদটির মালিকানা একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে। নির্মাতা ঋষিকেশ দাস আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়লে বাড়িটি বিক্রি করেন কাজী আবদুর রশীদের কাছে। পরবর্তীতে তাঁর পরিবার, বিশেষ করে তাঁর পুত্র কাজী হুমায়ুন বসির যিনি তৎকালীন ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান ছিলেন বাড়িটিকে পরিণত করেন “হুমায়ুন সাহেবের বাড়ি”-তে।

১৯৬৬ সালে এই বাড়িটি বেঙ্গল স্টুডিও-কে ভাড়া দেওয়া হয়। এরপর সেখানে অনেক বাংলা সিনেমার শুটিং হয়েছিল। “হারানো দিন” ও “চিরন্তন” চলচ্চিত্রের দৃশ্য ধারণ হয় এখানেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রাসাদটি তার পুরোনো মহিমা হারায়, ধীরে ধীরে জরাজীর্ণ হতে থাকে।

তবে ১৯৮৯ সালে এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রায় ৩৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে রোজ গার্ডেন অধিগ্রহণ করে। বর্তমানে এটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে সংরক্ষিত এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে চলছে পূর্ণাঙ্গ সংস্কারকাজ। নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে ভবনের বাইরের দেয়াল, কারুকাজ পুনর্গঠন ও বাগান পুনরুদ্ধার। পরিকল্পনা রয়েছে এটিকে একটি ‘জাতীয় হেরিটেজ জাদুঘর’ হিসেবে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার।

রোজ গার্ডেন অবস্থিত পুরান ঢাকার টিকাটুলিতে অবস্থিত কে. এম. দাস লেনে। মতিঝিল বা গুলিস্তান এলাকা থেকে সহজেই রিকশা বা সিএনজি করে পৌঁছানো যায়। ভবনের মূল প্রবেশদ্বারে এখন টিকিট কাউন্টার রয়েছে। সংস্কার কাজ শেষে দর্শনার্থীদের জন্য পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে।

চত্বরে ঢুকলেই চোখে পড়ে সবুজ লন, ফোয়ারা ও নারী ভাস্কর্য। মৃদু হাওয়ায় দুলতে থাকা গাছের ছায়া আর মার্বেল পাথরে পড়া রোদ যেন এক অন্যরকম প্রশান্তি এনে দেয়। ভবনের ভেতর ঘুরতে ঘুরতে দেখা যায় লাল গালিচা, কাঠের রেলিং, মার্বেল সিঁড়ি, আর বলরুমের ছাদের ফুলেল নকশা দর্শনার্থীদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় এক বিস্মৃত সময়ের ভেতর।

রোজ গার্ডেন এখন নতুন সাজে সেজেছে। তবু তার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক পুরনো কালের মায়া। ঢাকার ব্যস্ততার ভিড়ে এই প্রাসাদ যেন একটুখানি নীরবতা, একটুখানি অতীতের গন্ধ।

রোজ গার্ডেনে ভ্রমণ মানে সময়ের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়া। এটি একাধারে শিল্প, ইতিহাস আর সৌন্দর্যের সংমিশ্রণ। যখন সূর্যের আলো পড়ে মার্বেল দেয়ালে, তখন পুরো প্রাসাদ যেন জ্বলে ওঠে সোনালি আভায়। সন্ধ্যার আলোয় ফোয়ারার শব্দে, পুকুরের জলে প্রতিফলিত স্থাপত্য দেখে মনে হয় এই শহরের কোলাহলেও এখনো আছে শান্তির এক কোণ।