বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬
স্পটলাইট

যে নারী নিজের রিদমে ইতিহাস লিখছেন

WhatsApp Image 2025-10-21 at 6.23.27 AM

জাপানের রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যোগ হয়েছে—দেশটির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির মাধ্যমে। কিন্তু তিনি শুধু রাজনীতিবিদই নন, একজন হেভি মেটালপ্রেমী ড্রামারও বটে। আয়রন মেইডেন ও ডিপ পার্পলের মতো ব্যান্ডের অনুরাগী তাকাইচি কাওয়াসাকি মোটরবাইকেরও ভক্ত। আর রাজনীতিতে তার অনুপ্রেরণা এসেছিল ‘আয়রন লেডি’ মার্গারেট থ্যাচারের কাছ থেকে। শ্রদ্ধাস্বরূপ তাই প্রায়ই তিনি নীল রঙের স্যুট পরেন।

তাকাইচির বেড়ে ওঠা জাপানের নারা অঞ্চলে—যেখানে পাহাড়, বন আর প্রাচীন মন্দিরের নীরব সৌন্দর্য মিশে আছে। বাবা গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানায় কাজ করতেন, আর মা ছিলেন পুলিশ বিভাগে। রাজনীতিবিদদের অনেকের মতো ধনী পরিবারে নয়, বরং এক সাধারণ ঘরেই তার শৈশব কেটেছে।

মা-বাবার চাপে তাকাইচি পড়াশোনা করেন কোবে বিশ্ববিদ্যালয়ে, যদিও তার মন ছিল স্বাধীনতার খোঁজে। তিনি এক সাক্ষাৎকারে স্মরণ করেছেন—“বাবা-মায়ের ধারণা ছিল, মেয়েদের উচ্চশিক্ষার তেমন দরকার নেই।” তবু মায়ের উপদেশ তাকে পথ দেখিয়েছে—“গাঢ় লাল গোলাপ হও”—অর্থাৎ সৌন্দর্য ধরে রেখো, তবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কাঁটা হয়ে দাঁড়াও।

প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা যাতায়াত করে তিনি ক্লাসে যেতেন, কারণ বিয়ের আগে বাড়ি ছেড়ে থাকার অনুমতি পাননি। সত্তরের দশকের সেই মেয়েটিই আজ জাপানের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজন।

রাজনীতিতে তিনি লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্বে উঠে এসেছেন—যা ঐতিহ্যবাদী ও পুরুষপ্রধান বলেই পরিচিত। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, অন্যদিকে ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার ইচ্ছাও জানিয়েছেন। এই অবস্থান অনেকের কাছে ‘মেক জাপান গ্রেট অ্যাগেইন’ স্লোগানের প্রতিধ্বনি মনে হয়েছে।

তাকাইচি দীর্ঘদিন ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। আবের মতোই তিনিও জাপানকে আরও ডানপন্থী নীতির দিকে এগিয়ে নিতে চান। চীনের প্রতি তার অবস্থান কঠোর, আর অভিবাসন ও পর্যটন নীতিতে তিনি কঠোর নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তবে তাকাইচির পথটা সহজ ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রে ইন্টার্নশিপ করতে গিয়ে তিনি শিখেছিলেন রাজনীতির বাস্তব পাঠ। কলোরাডোর কংগ্রেসওম্যান প্যাট্রিসিয়া শ্রোডারের অফিসে কাজ করার সময় তিনি আমেরিকান রাজনৈতিক সংস্কৃতির কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হন। পরে জাপানে ফিরে লেখক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করে ১৯৯৩ সালে নারা থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে সংসদে প্রবেশ করেন। সেই প্রচারণায় তার বাবা অবসরের সঞ্চয় ব্যয় করেছিলেন।

প্রথম সংসদ জীবনে পুরুষ সহকর্মীরা তাকে তেমন গুরুত্ব দিত না। রাজনীতির ‘ক্লাব সংস্কৃতিতে’ নারীর অংশগ্রহণ প্রায় অসম্ভব ছিল। তিনি বলেছিলেন, “পুরুষদের সঙ্গে একান্তে দেখা করা মানে গুজবের জন্ম। আমরা বিকেল পাঁচটার পরের সময়টা কাজে লাগাতে পারি না।”

তবু তিনি হাল ছাড়েননি। শিনজো আবের সঙ্গে রাজনৈতিক বন্ধন তাকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। ২০০৬ সালে আবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলে তাকাইচিকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করেন—যা জাপানি রাজনীতিতে নারীর দৃশ্যমানতার এক মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

আবের মৃত্যুর পর তাকাইচি শোকাহত হয়েছিলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছিলেন—“আজ থেকে আমাকে আরও পরিশ্রম করতে হবে, না হলে ওর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।”

২০২৫ সালে দলের নেতৃত্ব নির্বাচনে তাকাইচি আবারও প্রমাণ করলেন, তিনি শুধু ড্রামার নন—একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। চারজন পুরুষ প্রতিদ্বন্দ্বীকে পেছনে ফেলে তিনি প্রতিশ্রুতি দিলেন, জনগণের উদ্বেগকে তিনি আশায় পরিণত করবেন।

ব্যক্তিগত জীবনেও তাকাইচি আলোচিত। ২০০৪ সালে তিনি রাজনীতিক তাকু ইয়ামামোতোকে বিয়ে করেন, ২০১৭ সালে বিচ্ছেদ হয়, পরে ২০২১ সালে আবার একত্র হন। আশ্চর্যের বিষয়—এইবার স্বামী গ্রহণ করেন তাকাইচির পদবি, যা জাপানের পিতৃতান্ত্রিক সমাজে বিরল এক দৃষ্টান্ত।

তার হেয়ারড্রেসার ইউকিতোশি আরাই বলেন, “তাকাইচি চান সবাই যেন তার চোখে চোখ রাখে, যেন বোঝা যায়—তিনি শুনছেন, দেখছেন।” তিনি আরও যোগ করেন, “তাকাইচি আয়রন লেডি নন; তিনি কানসাই নারীর মতো—হাস্যরসিক ও বিনয়ী।”

নির্বাচনের পর তাকাইচিকে পাঠানো আরাইয়ের টেক্সটের জবাব ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর—
“এখন লড়াই শুরু হলো।”