বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬
এডিটরস পিক

কেমন ছিল মৌর্য সাম্রাজ্যের খাদ্যভ্যাস

IMG-20250924-WA0009

মৌর্য সাম্রাজ্যের সময়কাল ছিল ৩২২ থেকে ১৮৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য (খ্রিস্টপূর্ব ৩৪০-২৯৮) ও অশোকের (খ্রিস্টপূর্ব ২৭৩-২৩২) মতো শাসকদের হাতে ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের বেশির ভাগ অংশ।আমাদের উপমহাদেশের অতীতের সেই শাসনব্যবস্থার বর্তমান রন্ধনশৈলীতে কখনো পরোক্ষ আবার কখনো প্রত্যক্ষ ছাপ রয়েই গেছে। কেমন ছিল দুই হাজার বছর আগেকার আমাদের খাদ্যসংস্কৃতি আসুন জেনে নি। 

মৌর্য সাম্রাজ্যের সময়কালে অর্থনীতি নির্ভরশীল ছিল মূলত উর্বর গঙ্গা সমতটে স্থায়ী কৃষিকাজের ওপর। এ জন্যই গড়ে উঠেছিল উন্নত সেচ অবকাঠামো, সড়কপথ ও রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধান এসময়। দক্ষ পানি ব্যবস্থাপনা ও মৌসুমি ফসল আবর্তনের কারণে কৃষি উৎপাদনে ধান, গম, ডালসহ নানা ফসলের আবাদ হতো। একটি প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃত গ্রন্থ অনুসারে, মৌর্য প্রশাসন কৃষি ও খাদ্য সরবরাহ বণ্টন তত্ত্বাবধান ও খাদ্য অর্থনীতির দেখভাল করার জন্য কর্মকর্তা নিয়োগ করে থাকতো। কসাইখানা নিয়ন্ত্রণ, লবণ, চিনি ও গাঁজানো পানীয় উৎপাদন নিশ্চিত করা ছিল তাদের অন্যতম প্রধান কাজ।

ঋতুগত বৈচিত্র্য

মৌর্যদের খাদ্যাভ্যাস ঋতুর ওপর অনেক নির্ভরশীল ছিল। শীতকালে বাজরা ও ভাতের প্রাধান্য বেশি ছিল। আবার মটর, মুগ ও মসুরের মতো ডালের সঙ্গে খাওয়ার জন্য গ্রীষ্মকালে গম ও যবের গুরুত্ব বেশি ছির। পূর্ববর্তী যুগের তুলনায় এ যুগে গমের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। এ ছাড়া মুগ ডাল, মসুর, মটর সহ বিভিন্ন জাতের সাধারণ ডালও জায়গা পেয়েছিল প্রধান খাদ্যশস্যের তালিকায় সেসময়। প্রাচীন ভারতীয় অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক, রাজ-উপদেষ্টা এবং বিখ্যাত গ্রন্থের রচয়িতা কৌটিল্য ওরফে চাণক্য লিপিবদ্ধ করেছেন, মৌর্য যুগে প্রায় তিনবার ফসল ফলানো হতো, যা নিবিড়ভাবে পরিচালিত কৃষি ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়।

মসলার মিশ্রণ

মৌর্য রাঁধুনিরা বিভিন্ন ধরনের দেশীয় মসলার মিশ্রণ ব্যবহার করতেন। এগুলোর মধ্যে ছিল হলুদ, জিরা, ধনে, সরিষা, শুকনো আম আবার লম্বা মরিচ, গোলমরিচ, শুকনো আদার মিশ্রণ যা ছিল তাদের কাছে ত্রিকটু , দারুচিনি, এলাচি, তমালার মিশ্রণ ত্রিজাতক এবং পঞ্চকোলার যা ছিল লম্বা মরিচের শিকড়, আদা ও অন্যান্য শিকড়ের মিশ্রণ।

 মরিচ ও গোলমরিচ বাণিজ্যের পাশাপাশি আঞ্চলিকভাবেও উৎপাদন করারও চল ছিল। টমেটোর প্রচলন তখনো ঘটেনি সেসময় বলে আদা, গোলমরিচ ও মরিচের চাহিদা ছিল অনেক যা তারা পিপ্পালি নাম দিয়েছিল। 

দুগ্ধ, মাংস, ফল ও মিষ্টান্ন

গরু, মহিষ ও ছাগলের দুধ মৌর্যরা সবই ব্যবহার করতেন। সেই সঙ্গে মাখন, দই ও ঘি দৈনন্দিন খাবারের পাশাপাশি নানা আচার-অনুষ্ঠানেও ব্যবহারের চল ছিল; বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী ও অসুস্থতা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া ব্যক্তিদের খাদ্যতালিকায় এসব অন্তর্ভুক্ত করা হতো। এসময় সনাতন, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের নিরামিষভোজীদের প্রভাব ছিল তাই মাংস একদমই পাতে উঠত না, এমন কথা বলা যাবে না; বিশেষ করে মাছ, ছাগল ও হাঁস-মুরগির মাংস জায়গা ছিল এদের খাদ্যতালিকায়। অবশ্য মাংস ভক্ষণের অধিক চল ছিল যোদ্ধা এবং বিশেষ শ্রেণির কিছু মানুষের মধ্যে। কসাইখানার সুপারিনটেনডেন্টের মতো রাজ্যের আমলাদের কাজ ছিল মাংস সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা। মিষ্টি খাবারের ক্ষেত্রে মধু ও আখের উৎপাদিত রস, কাঁচা চিনি বা গুঁড়, চিনির মিছরি এবং পরিশোধিত রূপের ওপর নির্ভর করা হতো; বিশেষ করে অভিজাতদের মধ্যে এসব মিষ্টান্নের জনপ্রিয়তা অনেক বেশি ছিল। ফলের মধ্যে আম, কলা, ডালিম ও মৌসুমি ফল ছিল উন্নত খাবার। আর ব্যবসায়ীরা বাজারে ঋতুভেদে ফলের ভিন্নতা রাখতেন তাদের দোকানে।

রান্নার পদ্ধতি ও আসবাবপত্র 

মৌর্য যুগে রান্নার জন্য মাটির ও ধাতব পাত্র ব্যবহার করা হতো। এর মধ্যে ছিল মাটির চুলা ও তন্দুরের মতো চুলা, পেষণকারী পাথর, তাওয়া এবং ব্রোঞ্জ বা তামার তৈরি কংস চুলা। সাধারণ রান্নার পদ্ধতির মধ্যে ছিল ভরজিতা যা হল স্কিউয়ারে মাংস ভাজা, পিশতা মানে মাংসকে প্যাটি করা, প্রতাপ্ত বা মসলা দিয়ে মাংস ভাজা এবং শুল্য মাংসের গ্রিল করে তারা খেত। 

ভাত বিভিন্নভাবে তৈরি করা চল ছিল সেসময় যেগুলোর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ক্ষীরৌদন সাধারণ দুধ দিয়ে ভাত যা ক্ষীর নামে আমাদের কাছে পরিচিত , খিচুড়ি ডাল দিয়ে ভাত যা আমরা এখনো করি, মাংসৌদন মাংস দিয়ে ভাত যা আমরা বিরয়ানী ডাকি, তিলৌদন তিল দিয়ে ভাত, দধিওদন দই দিয়ে ভাত। তাহলে দেখতেই পাচ্ছেন কতটা ছাপ রয়েছে এখনো সেইআমলের রন্ধন শিল্পের এযুগেও।

সাধারণ ও রাজকীয় ভোজ

মৌর্যরা বেশির ভাগ মানুষই প্রতিদিনের খাবারের মধ্যে  ভাত বা বাজরা রাখত, ডালের স্যুপ বা ডাল, দই, শাকসবজি ও অল্প পরিমাণে ঘি বা মাখন রাখত। ধনী বা অভিজাত পরিবারে ফল, মিষ্টি, মধু বা চিনিযুক্ত ক্যান্ডি ও মাঝে মাঝে মাংস বা মাছ যোগ করত।প্রায়শই মেঝেতে বসে, হাতে খাওয়ার রেওয়াজ ছিল সেসময়। এছাড়াও তারা কলা পাতা, সাধারণ মাটির বা ধাতব থালায়ও পরিবেশন করত খাবার। 

আর রাজকীয় ভোজগুলোতে ছিল মহা আয়োজন। সেখানে মসলাদার তরকারি, মধু-চিনিযুক্ত মিষ্টান্ন, বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার, সুরা নামের পানিয় ও আমদানি করা ওয়াইন পরিবেশনের চল ছিল। গ্রিকদের কাছে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য পরিচিত ছিলেন সান্দ্রোকোত্তোস বা আন্দ্রাকোত্তাস নামে।

খাদ্য এবং ধর্মীয় প্রভাব

সনাতন, বৌদ্ধ ও জৈনদের নীতিগত শিক্ষা মৌর্য খাদ্য সংস্কৃতিকে রূপ দিয়েছে। অহিংসার ধারণা এবং খাদ্যতালিকাগত ব্যবস্থা গরুর মাংস বর্জনকে প্রভাবিত করেছিল। শিক্ষিত ও আধ্যাত্মিক শ্রেণির মধ্যে মূলত নিরামিষ জীবনধারাকে উৎসাহিত করা ছিল। একই সময়ে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র নিয়ন্ত্রিতভাবে মাংস খাওয়ার অনুমতি এবং পশু জবাইয়ের জন্য প্রশাসনিক কাঠামো নির্দিষ্ট করার প্রসঙ্গ তুলে ধরেছে। এটি নিরামিষভোজী এবং যারা উভয় ধরনের খাবার খান, তাদের বাস্তবসম্মত সহাবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।আয়ুর্বেদিক খাদ্যাভ্যাস, বিশেষ করে মিতাহার নীতি, ছয়টি স্বাদ তথা মিষ্টি (মধুর), টক (অম্ল), নোনতা (লবণ), ঝাল (কটু), তেতো (তিক্ত) ও কষার পরিমিতকরণ এবং ভারসাম্য বজায় রাখার সুপারিশ করেছিল। ঋতুগত সমন্বয় ও মেজাজ, বয়স, পেশা এবং স্বাস্থ্যের সঙ্গে খাবারের সামঞ্জস্যের মতো বিষয়গুলো মৌর্য যুগে ব্যাপকভাবে বিবেচিত হতো।

মৌর্য সাম্রাজ্যের খাদ্যসংস্কৃতিকে পরবর্তীকালের ভারতীয় উপমহাদেশীয় রন্ধনপ্রণালি অনেকটাই অনুকরণ করা হয়েছে। সনাতন, বৌদ্ধ ও জৈন ঐতিহ্যের মাধ্যমে প্রতিদিনের খিচুড়ি-ধাঁচের খাবার, মসুর ডালের স্যুপ, ভাতের বৈচিত্র্য ও দুধকেন্দ্রিক খাবারগুলো টিকে আছে এখনো। মসলার ধরন ও মিশ্রণ আয়ুর্বেদিক ও ধর্মীয় গ্রন্থে পাওয়া প্রাথমিক রেসিপিগুলোর প্রতিধ্বনি। পরবর্তী মধ্যযুগীয় ইসলামিক যুগ ও মোগল শাসনকালে নতুন নানাবিধ সবজি ও পারস্যের রান্নার কৌশল প্রবর্তিত হলেও মৌর্য রন্ধনসম্পর্কীয় ভিত্তি শস্য, ডাল, দুগ্ধজাত পণ্য, মসলা, মধু ভরতীদের খাদ্যসংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়ে গেছে।