বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬
সাহিত্য-সংস্কৃতি

ছায়ার নিমন্ত্রণ

ছায়ার নিমন্ত্রণ

রাতের দিকে এজতেবান যখন ঘুম ভেঙে জেগে উঠলো, আবিষ্কার করলো সে কোনো
ঘরের মধ্যে নেই—মাটিতে শুয়ে রয়েছে—ভেজা কাদায়, কুয়াশার চাদরে মোড়া এক
নির্জন মাঠে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অগণিত ছায়ার মাঝে। তার বুকের ওপর একটা কাক
বসে ছিল, সে জেগে উঠতেই কাকটা ধীরে ধীরে উড়ে গিয়ে একটা মৃত বটগাছের ডালে
বসলো। গাছটা কেমন যেন দুঃখী, যেমন শহরের পরিত্যক্ত বৃদ্ধাশ্রমের জানালায়
দাঁড়িয়ে থাকা কোনো বিশীর্ণ বৃদ্ধ।
এজতেবানের স্মৃতির খিমচে ধরা দিনলিপির পাতাগুলো যেন খুলে খুলে পড়তে
লাগলো—হাসপাতালের করিডোর, ফিকে আলো, রোগীর শেষ নিঃশ্বাস, নিজের হাতের
কাঁপুনি, কারো একটানা বলে চলা—সব ভুল হয়ে গিয়েছে, ডাক্তার সাহেব।
তুমি তো ডাক্তার?—শব্দটা হাওয়ার মতো এসে কানে লাগলো। সে চমকে
তাকালো—সামনে বসে আছেন একজন বৃদ্ধা। চোখের মণি গলে যেন নেমে পড়েছে গালের
কোঠায়। চামড়াটা কাগজের মত পাতলা। পিঠ বাঁকা। হাতে এক জোড়া কাঁচা হলুদের গুচ্ছ।
বৃদ্ধা আবারো বললেন, তুমি তো মৃতদের নাড়ি ধরতে পারো, তাই না?—বৃদ্ধার ঠোঁটে
এমন এক হাসি যা প্রাচীনকালের শোকসংবাদের মতোই অচেনা।
এজতেবান চুপ করে রইলো। হঠাৎ খেয়াল করলো, চারপাশে অনেক মানুষ, কিন্তু
তারা কেউ নড়ছে না। মাঠ জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছায়াগুলো মানুষ হয়ে উঠে কাদায় গেঁথে
আছে, যেন মাটি থেকে গজিয়ে উঠেছে।
তারা মরে নি—এজতেবান বলল, তারা অপেক্ষা করছে।
বৃদ্ধা হাসলেন। বললেন, তোমরা ডাক্তারেরা সব সময় ভাবো, যার নাড়ি আছে সে-ই
জীবিত। কিন্তু যারা সময়ের কাছে ঋণী, তারা তো কেবল একেকটা ভুল মুহূর্তে আটকে
পড়ে রয়েছে। ওরা সময়ের কাছে ঋণী। তোমার মতো। তুমি এসেছ ঋণ শোধ করতে।
এজতেবান তখনো জানে না এই গ্রাম সময়ের এক ব্যর্থ খসড়া। এখানে যাদের নাম
কেউ মনে রাখে না, যারা ভুল ট্রেনে উঠে ভুল স্টেশানে নেমে যায়, তাদের স্থান হয়
এখানে। আর এই বৃদ্ধা তাদের সব কিছু মনে রাখেন।
সে দেখলো দূরের এক আবছা এক ছায়ামূর্তি স্পষ্ট হতে হতে এদিকেই এগিয়ে
আসছে। সে যেন হেঁটে এলো, আবার যেন সব সময় সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল।
বৃদ্ধা তাকে সেদিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বললেন, ও এই স্থানের প্রহরী। ওর নাম
প্রহরী।
প্রহরী ধীর পায়ে এগিয়ে আসতে লাগলো। এরপর কাছে এসে বলল, সময়ের ঋণ
কখনো শোধ হয় না, এজতেবান। এখানে আসা মানেই ভুল। তবু সবাই আসে। কিছু না

জেনেই আসে। তুমিও এসেছ, তবে দেরি করে ফেলেছ, ডাক্তার। আর এই দেরি থেকেই
রোগের শুরু হয়।
এজতেবান তার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার হাতে তো ঘড়ি নেই। তুমি সময় দেখো কী
করে?
প্রহরী হেসে ফেলল। বলল, যারা ভুল সময়ে জন্মায়, তাদের প্রতিটা নিঃশ্বাসই
একেকটা দেরি। আর আমি সেই দেরির হিসেব রাখি।
বৃদ্ধা বললেন, তুমি কি তোমার জন্মের কথা মনে রেখেছ, এজতেবান?
এজতেবান নিশ্চুপে কিছুক্ষণ ভাবলো। তারপর বলল, না—শুধু মনে পড়ে, মায়ের
চোখে ভয় ছিল। আমার জন্মে সবাই চুপ হয়ে গিয়েছিল।
প্রহরী বলল, ভয়ের মধ্যে জন্মায় যারা, তারা শেষ পর্যন্ত ডাক্তার হয়। কেন
জানো?
এজতেবান অস্ফুটে স্বগতোক্তির মতো করে বলল, কারণ তারা নিজেকে সারাতে
জানে না।
বৃদ্ধা এজতেবানের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, এসো, আমি তোমায় একটা
জায়গা দেখাবো।
তারা তিনজন মাটি কেটে একটা পুরোনো কুয়োর কাছে পৌঁছলো। কুয়োর ভেতরে
তাকাতেই এজতেবান দেখলো, তার নিজের ছায়া পড়ে রয়েছে কুয়োর ভেতরে, সেই ছায়া
তাকে দেখছে। হ্যাঁ, দেখছে। আর একটা মৃদু কণ্ঠ দূর থেকে তার নাম ধরে
ডাকছে—এজতেবান! এজতেবান!!
কুয়োর মুখে এজতেবান স্থাণুবৎ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার ছায়া নিচে তাকিয়ে নেই,
বরং তাকে দেখছে। চোখ জোড়া কুয়োর জলপৃষ্ঠে নয়, যেন অনেক গভীরে গেঁথে আছে
সময়ের কোনো থমকে থাকা ফ্রেমে।
তুমি কাকে দেখলে?—বৃদ্ধা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন।
এজতেবানের ঠোঁট, গলা কেঁপে উঠলো। বলল, সে আমাকে ডাকছিল। কিন্তু তার মুখ
মনে নেই। শুধু মনে আছে, সে আমার দিকে তাকিয়ে বলছিল—তুমি বাঁচাও, কিন্তু নিজেকে
ছাড়তে পারো না। সে কে?
প্রহরী হঠাৎ করেই এক পাথরের উপর বসে পড়লো। তার দৃষ্টিতে ক্লান্তি নেই,
কেবল এক অদ্ভুত কৌতূহল, যেন সে এজতেবানের সব কথা বহু আগে থেকেই জানে।
কিছুক্ষণ এভাবেই পেরিয়ে গেলো। তারপর সে বলল, তুমি জানো না তুমি মারা গিয়েছ কি-
না। কারণ মৃত্যুর পর মানুষ প্রশ্ন করে না—সে উত্তর খোঁজে। আর তুমি এখনো প্রশ্ন
করছ। তুমি জীবন আর মৃত্যুর মাঝামাঝি আটকে আছো। তুমিই ‘সে’। তুমি নিজেই নিজেকে
ডাকছ।
এজতেবানের মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। এটা কি তবে মৃতদের গ্রাম? না-কি
জীবিতদের দুঃস্বপ্ন?

বৃদ্ধা তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, এখানে যারা আসে, তারা কেউ পূর্ণভাবে জীবিত
নয়, আবার মরেও নি। তোমরা সবাই সেই ‘মাঝখানের মানুষ’—জন্ম আর অন্ত্যেষ্টির
মাঝে ঝুলে থাকা আত্মা। তুমি চিকিৎসা করো, কিন্তু তোমার আত্মার চিকিৎসা কে
করবে?
এজতেবান তীব্র এক মনোযন্ত্রনায় কাতর হয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। চোখ মেলে
দেখলো—যারা মাঠ জুড়ে দাঁড়িয়ে ছিল, সেই সব স্থবির মানুষের দল, তারা এখন ধীরে
ধীরে নড়ছে। তাদের শরীর কাদা গিলে ফেলেছে, মুখে অদ্ভুত শান্তি। কেউ কেউ তার নাম
ধরে ডাকছে—এজতেবান.. ডাক্তার.. বাবা.. ভাই.. রোগী..
তার মাথার ভেতর একটা কণ্ঠ দুলতে শুরু করলো। খুব চেনা কণ্ঠ—তুমি আমায়
দেখতে যাও নি, ডাক্তার সাহেব। তুমি বলেছিলে সময় নেই। আমার সময় কি কম ছিল?
এজতেবানের চোখে ঝাপসাভাবে ফুটে উঠলো সেই দৃশ্য। সে বুঝতে পারছে, সে হয়তো
একজনের মৃত্যুর দায় এড়িয়ে এসেছে। হয়তো কারো মৃত্যু ঘটেছে তার অবহেলায়। সেই
অনুতাপ তাকে এই গ্রামে এনে ফেলেছে—জীবনের এক ভুল মোড়ে, যেখান থেকে ফেরার
ট্রেন যায় না।
সে আকুল কণ্ঠে বলল, আমি ফিরে যেতে চাই। আমি তাকে দেখতে চাই। আমি জানতে
চাই সে আমাকে ক্ষমা করেছে কি-না।
প্রহরী উঠে দাঁড়ালো। তার কণ্ঠে কোনো বিদ্রূপ নেই, কেবল সময়ের কর্কশ
নির্লিপ্ততা। সে বলল, ক্ষমা পেতে হলে মরে যেতে হয়, এজতেবান। তুমি এখনো বেঁচে
আছো, তাই ভুগছ।
এজতেবান আবারো কুয়োর দিকে এগিয়ে গেলো। জলের ভেতর নিজেকে দেখতে পেলো।
তখনই বৃদ্ধা বলে উঠলেন, কিছু আত্মা ডাক্তার হয়, কারণ তারা জানে কীভাবে ব্যথা
ছুঁয়ে যেতে হয়। কিন্তু কিছু ব্যথা ছুঁয়ে দিলে তা কেবল ছড়িয়ে পড়ে। ভেবে নাও, তুমি কোন
ধরনের ডাক্তার?
কুয়োর জলে এজতেবান যখন ছায়ার দিকে হাত বাড়ালো, জলটা যেন দুলে উঠলো
না—বরং কেঁপে উঠলো তাকে পরিবেষ্টন করে রাখা চারপাশ। হঠাৎ, চারদিক থেকে
শোনা যেতে লাগলো ভাঙা কাচের শব্দ—যেন বাস্তবতা ভেঙে ভেঙে চূর্ণ হয়ে ঝরে
পড়ছে। একটা শব্দ ছড়িয়ে পড়লো বাতাসে—‘তুমি আমার মৃত্যুর সাক্ষী, ডাক্তার সাহেব।
তবু তুমি এলে না।’
কুয়োর মুখটা অকস্মাৎ গায়েব হয়ে গেলো। বৃদ্ধা আর প্রহরী পাশে নেই। এজতেবান
নিজেকে আবিষ্কার করলো এক অন্ধকার ঘরে—চিকিৎসালয়ের মতো, কিন্তু দেয়াল
ভেজা, জানালায় পচা কাগজ সাঁটা, বাতাসে ব্যথানাশকের গন্ধ। বেডে কেউ শুয়ে আছে, মুখ
পর্যন্ত চাদর টানা। ছায়ায় কেউ দাঁড়িয়ে আছে, পেছন দিকে ঘুরে। এজতেবান বলল, তুমি
কে?

ছায়াটা বলল না কিছু। ধীরে ধীরে তার দিকে ঘুরলো। একটা মুখ—অর্ধেক পুড়ে
যাওয়া। চোখ দুটো ঠিক তার দিকে তাকানো, কিন্তু সে জানে—এই চোখ কোনো কিছুকে
আর দেখে না।
ঘরের নিস্তব্ধতাকে চূর্ণ করে ছায়াটি কিছুক্ষণ পর বলে উঠলো, আমি তোমার
রোগী ছিলাম। তুমি বলেছিলে, সকাল হলে দেখবে। সকাল তো এসেছিল, এজতেবান। কিন্তু
তুমি আসো নি।
এজতেবানের ঠোঁট শুকিয়ে গেলো। হাতজোড়া তিরতির করে কাঁপতে লাগলো। সে বলে,
আমি ভুল করেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, তুমি ভালো আছো। আমি ক্লান্ত ছিলাম..
ছায়াটা হাসলো। বলল, তুমি মানুষ, তুমি ভুল করতেই পারো। কিন্তু কিছু ভুল মানুষকে
মারে না, মানুষের ভেতরের ডাক্তারটাকে মেরে ফেলে।
জানালার বাইরে কী একটা গর্জন শোনা গেলো। বিদ্যুৎ ঝলকে উঠে ছায়াটি সরে
গেলো। বেডটা খালি। ঘরে এজতেবান দাঁড়িয়ে রয়েছে একা, নিঃসঙ্গ।
আর ঠিক তখনই সেই বৃদ্ধার কণ্ঠ ফিরে এলো—এজতেবান, তোমার সময় শেষ হয়
নি। তুমি যদি ক্ষমা চাও, তবে ফিরে যেতে পারো। কিন্তু মনে রেখো, ক্ষমা মানে মুক্তি
নয়। ক্ষমা মানে বোঝা বহন করার অধিকার।
চারপাশের কুয়াশা আরো গাঢ় উঠছে। এজতেবান হাঁটছে সেই কুয়াশার মধ্যে দিয়ে,
বুকের ভেতরে আগুন আর বরফ এক সঙ্গে পুড়ছে। তার পায়ের নিচে তখন মাটি
নয়—স্মৃতি। তার সামনে দরজা খুলে যাচ্ছে—একটা গ্রামের মাঠ, একটা ছায়া হাতছানি
দিয়ে ডাকছে, আর কেউ একজন তীক্ষ্ণ স্বরে বলছে, ওর দিকে চোখ রাখিস..