বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬
স্পটলাইট

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব—শিশুদের চোখে উপকূলের বাস্তব ছবি

WhatsApp Image 2025-10-09 at 12.40.46_65d07c43

বাংলাদেশ প্রায় প্রতি বছরই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে। আর এই দুর্যোগের কবলে পড়ে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে বয়স্ক ও শিশুরা। দুর্যোগকালীন সময়ে বিদ্যালয় বন্ধ থাকে, ফলে শিশুদের পড়াশোনায় ক্ষতি হয়। অনেকেই আর স্কুলে ফেরে না।

গতকাল বুধবার (৮ অক্টোবর) প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআইবি) সভাকক্ষে ‘সংকটাপন্ন শৈশব: জলবায়ু পরিবর্তন ও উপকূলীয় শিশুদের ওপর এর প্রভাব’ শীর্ষক আয়োজিত অ্যাডভোকেসি সভা হয়। সেখানে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা থেকে আসা শিশু নাওশীন ইসলাম বলেন, ‘দুর্যোগে নারী ও পুরুষের সংখ্যা গোনা হয়, কিন্তু শিশুদের হিসাব রাখা হয় না। শিশুবান্ধব আশ্রয়কেন্দ্রও নেই। দুর্যোগের সময় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে শিশুরা। আর তাদের হাসি শুকিয়ে যাচ্ছে নোনাজলে, খেলাঘর ভেসে যাচ্ছে জলোচ্ছ্বাসে।’

‘জাগ্রত যুব সংঘ (জেজেএস)’ ও ‘উপকূলীয় শিশু ফোরাম’ যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। নাওশীনদের এমন গল্প নতুন নয়। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা আর বেড়িবাঁধ ভাঙনের মধ্যে বড় হওয়া এই প্রজন্মের শৈশব প্রতিদিন একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে। নদী, বৃষ্টি আর দুর্যোগের সঙ্গে জন্মের পর থেকেই তাদের সম্পর্ক।

উপকূলের পরিবারগুলো জানে না, পরের বছর তাদের গ্রাম মানচিত্রে থাকবে কিনা। নদীভাঙনে যাদের বাড়িঘর হারায়, তারা আশ্রয় নেয় অন্যের জমি বা বাঁধের পাশে। ফসল নষ্ট হয়, গবাদিপশু মারা যায়, আর বেঁচে থাকার দায় এসে পড়ে শিশুদের কাঁধে। স্কুলের বইয়ের বদলে জীবনে আসে কোদাল বা ইটভাটার চুল্লি।

খুলনার দাকোপের মুন মণ্ডল সংগ্রামের কথা তুলে ধরে। তিনি বলেন, প্রতি ঘূর্ণিঝড় শেষে একই দৃশ্য– ছিন্ন বেড়িবাঁধ, কাদামাখা স্কুল, হারানো খাতা। একসময় যে স্কুলে সকালের ঘণ্টা বাজত, সেটা ধীরে ধীরে আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়। বই ভিজে যায়, ক্লাস বন্ধ থাকে মাসের পর মাস। অনেকেই আর স্কুলে ফেরে না। শিশু তানজিলা আক্তার মুক্তি অভিযোগ করেন, বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের সময় তারা আশ্রয় নেয় অস্থায়ী শেল্টারে, যেখানে নিরাপদ পানি, টয়লেট বা আলাদা জায়গার ব্যবস্থা নেই।

শিশুদের মধ্যে বাল্যবিয়ের ভয়, নির্যাতনের আশঙ্কা, স্কুলছুট হওয়া– সব মিলে এক অদৃশ্য ট্রমা তৈরি হচ্ছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনায় শিশুদের কথা প্রায় অনুপস্থিত। অথচ তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 

অনুষ্ঠানে শিশু ফোরামের সদস্যরা দুর্যোগকালীন সময়ে বিদ্যালয় বন্ধ থাকা ও পড়াশোনায় ক্ষতির বিষয় তুলে ধরেন। জলবায়ু ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় শিশুদের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা। এছাড়াও সভায় উপকূলীয় অঞ্চলের শিশুরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ১৭ দফা দাবি উপস্থাপন করে। এর মধ্যে রয়েছে-

*টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ;

*মাল্টিপারপাস স্কুল-শেল্টার;

*নিরাপদ স্যানিটেশন ও

*বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করাসহ নানা প্রস্তাব রয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক নিতাই চন্দ্র বলেন, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার সময় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তাই ভবিষ্যতে স্কুলগুলোকে মাল্টিপারপাস শেল্টারে রূপান্তর করা হবে। তিনি আরও বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে শিশুদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করব।

পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ পরিবেশকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, মা ভালো না থাকলে যেমন শিশুরা ভালো থাকে না, তেমনি পরিবেশ ভালো না থাকলে আগামীর শিশুরা ভালো থাকবে না। তিনি আরও বলেন, আমরা ছোট বেলায় একটা ভালো পরিবেশ পেয়েছি। কিন্তু বর্তমানে আমরাই আমাদের শিশুদের জন্য ভালো পরিবেশ নষ্ট করছি।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক উম্মে সালমা সুমি, শাপলা নীরের কান্ট্রি ডিরেক্টর ইউমি ইয়াগাসিতো, জেজেএসের নির্বাহী পরিচালক এটিএম জাকির হোসেন এবং শিশু ফোরামের সভাপতি নুর আহমেদ জিদান।