শিক্ষাভাবনা

মানুষের চিন্তাচেতনা, যুক্তি ও বুদ্ধির বিকাশ ঘটায় শিক্ষা। শিক্ষার আলোই মানব
জাতিকে আলোকিত করতে পারে। শিক্ষার আলোয় আলোকিত মানুষজন আঁধারে
ডোবেন না কিংবা আঁধারে ডুবে যেতে যেতেও ভেসে ওঠেন ডুবুরির মতো।
শিক্ষা ব্যতীত কোনো জাতির উন্নয়ন অসম্ভব একথা সর্বজন বিদিত। শিক্ষার
সৌরভ ব্যতীত পৃথিবীর সকল সুগন্ধিই মূল্যহীন।
আমাদের দেশের শিক্ষাব্যববস্থাদুর্ভাগ্য বরণ করেছে বহুদিন আগেই নানা পরীক্ষা-
নিরীক্ষা, ব্যবচ্ছেদের মধ্য দিয়ে। শিক্ষাব্যবস্থার শরীর ছিন্নভিন্ন হয়েছে। এহেন
অবস্থার বিপরীতে কিছু বলতে যাওয়া কতটা শোভনীয় ভাবনার বিষয়। কতটা
বিশৃঙ্খলাপূর্ণ শিক্ষাব্যববস্থাতা একটু মনোযোগ সহকারে দেখলে বোঝা যায়।
রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক নানা ধরনের সমস্যা আমাদের লেগেই
আছে। মনস্তাত্তি¡ক দিক থেকে প্রথমেই চোখে পড়ে অসুস্থ
প্রতিযোগিতা শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত মায়েদের মধ্যকার প্রতিযোগিতা।
আড়াই-তিন বছরের বাচ্চাদের কিন্ডারগার্টেন নামক শিক্ষালয়ে ভর্তি করে শিশুর
শৈশব চুরির প্রতিযোগিতা বর্তমান সময়ের অন্যতম সমস্যা। ব্যাঙের ছাতার
মতো গজিয়ে ওঠা শিশুশিক্ষালয়গুলো যেনতেন প্রকারেই গাদা গাদা বই শিশুর কাঁধে
চাপিয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাঁচ বছর বয়সে শিশুদের মস্তিকের ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত বিকাশ ঘটে।
তাই এর আগে স্কুলে ভর্তি করলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। অথচ এর বিপরীত চিত্রই
পরিলক্ষিত হয়। কার বা”চা কত ভালো মুখ¯’ করতে পারে, কার বাচ্চা প্রথম হলো, ১
নাম্বার ২ নাম্বারের ব্যবধানে কেন প্রথম অধিকার করল না এ নিয়ে শুরু হয়
বচসা। সবচাইতে বেশি চড়াও হন মায়েরা নিজ বাসায়। প্রথমস্থান অধিকার না
করার অপরাধে বাচ্চার ওপর অমানুষিক অত্যাচার করেন। যা এক প্রকার বিকার বললেও
অত্যুক্তি হয় না।
দেশে প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকার বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করেছেন বিগত
কয়েক দশক ধরেই। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো নিন্মমানের পাঠদান (বেশির
ভাগ ক্ষেত্রেই) করায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য কিন্ডারগার্টেন। পাশাপাশি গড়ে
উঠেছে প্রাইভেট স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, বিশ্ববিদ্যালয়। সরকারি-বেসরকারি
প্রতিষ্ঠানে সিলেবাসের ভিন্নতা। বলা চলে, এক জগাখিচুড়ি মার্কা
শিক্ষাব্যবস্থা। যে প্রতিষ্ঠানে যত বেশি ফি গ্রহণ করে সে প্রতিষ্ঠানই সবচেয়ে
ভালো মানের বলে মনে করেন অভিভাবকরা। আপন সামর্থ্যরে বাইরে গিয়ে দামি স্কুলে
পড়ালেই বাচ্চার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত সুন্দর বলে তাঁদের ধারণা। বহু সরকারি প্রাথমিক
বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিজ বা”চাকে নামি-দামি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করেন। তাঁদের বক্তব্য
সরকারি স্কুলে পড়াশোনার মান ভালো হয় না। তাহলে এই শিক্ষকরা স্কুলে কী করতে
যান? প্রশ্নটা থেকেই যায়। এ দেশের বা”চার ওজনের চেয়ে বইয়ের ওজন বেশি।
হেসেখেলে আনন্দের সঙ্গেথ শিক্ষা গ্রহণের বিপরীতে শিশুদের মনে জেগেছে
শিক্ষাভীতি!
বেশির ভাগ অভিভাবকই বাচ্চাকে অলরাউন্ডার বানাতে চান। নাচের টিচার, গানের
টিচার, আবৃত্তির টিচার ভাবখানা এমন যে, সব গলাধঃকরণ করাবেন এক
লোকমাতেই। বেশির ভাগ বাবা-মাকেই গর্ব করে গল্প করতে শুনি তার সন্তান বহুবিধ
জ্ঞানের অধিকারী। এ+ পাওয়া সন্তানের বাবা-মা পাশের বাড়ির ভাই-ভাবিকে গলা
উঁচিয়ে বারবার জানান দেন তাঁদের সন্তানের প্রতিভা।
মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বিদ্যমান সমস্যাগুলো থেকে বেরিয়ে আসা
দুরূহ হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক গন্ডগোলে আক্রান্ত মাধ্যমিক সিলেবাস
কারিগরি ব্যবহারিক শিক্ষার অপ্রতুলতা আমাদের অনেকখানি পিছিয়ে দিচ্ছে।
গৎবাঁধা পড়াশোনা, বহুবিষয় সারা দিনমান পাঠদান, প্রাইভেট পড়া, কোচিং
ইত্যাদি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের অন্তরায়। অত্যাধুনিক
এই যুগে স্মার্ট ফোন মহামারির মতো সব নিঃশেষ করে দিচ্ছে। স্মার্ট ফোনের
অপব্যবহার শিক্ষার্থীদের প্রতিভা বিকাশের অন্তরায়। এ বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর
বিপরীতে শিক্ষক স্বল্পতা অন্যতম সমস্যা। এক্ষেত্রে গুণগতমানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদানও
অসম্ভব সরকারি-বেসরকারি শিক্ষকের বেতন-বৈষম্যে। যা শিক্ষকদের হতাশাগ্রস্ত করে।
এতে শিক্ষাদান ব্যাহত হয়। তর্কের খাতিরে কেউ কেউ বলবেন যে, শিক্ষকরা কোচিং
বা প্রাইভেট পড়িয়ে অনেক পয়সা উপার্জন করেন। অবশ্যই করেন তবে তা
হাতেগোনা কয়েকজন। অনেক অসাধু, অদক্ষ, ফাঁকিবাজ শিক্ষকও রয়েছেন এ কথা
অনস্বীকার্য। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট বা কোচিং না করলে ফেল
করানোর হুমকিও দিতে দ্বিধাবোধ করেন না।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা চাকরিনির্ভর। এ+ সাটিফিকেট
পাওয়ার প্রতিযোগিতার দৌড়ে আজ প্রকৃত শিক্ষাই মুখ থুবড়ে পড়েছে। এ+
আর অলরাউন্ডার হবার প্রতিযোগিতার ভিড়ে মানুষ হওয়ার শিক্ষাটাই আজ
ব্যাপকভাবে অনুপস্থিত। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, অভিভাবক ও শিক্ষকের সমন্বয়ের
অভাব বহুলাংশে দায়ী। ন্যায়-নীতি, আদব-লেহাজ আজ হারিয়ে গিয়েছে।
এতদসত্তে¡ও আশার কথা, কিছু সংখ্যক নীতিবান ও আদর্শ শিক্ষকের নিরলস
প্রচেষ্টায় মানুষরূপে গড়ে তোলার শিক্ষা পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়নি। এক্ষেত্রে
রাষ্ট্রের শিক্ষানীতি নির্ধারকদের জরুরি নজরদারি আবশ্যক। নতুবা সেদিন বেশি
দূরে নয় যেদিন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংসের পথে পা
বাড়াবে। শুধু রাষ্ট্র নয় অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। অসুস্থ প্রতিযোগিতা
থেকে বেরিয়ে মানুষ রূপে গড়ে তোলার শিক্ষায় ব্রতী হতে হবে।


