বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬
সাহিত্য-সংস্কৃতি

সামগ্রিক জীবনকে উপলব্ধি করেছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

সামগ্রিক জীবনকে উপলব্ধি করেছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

বাংলা সাহিত্যে উপন্যাস, ছোটগল্প, নাট্য-সাহিত্যে তারাশঙ্কর একটি বিশেষ নাম। জ্বলজ্বলে সূর্য, যার তেজোদীপ্ত কিরণ এত বছর পরও ¤øান হয় না এক বিন্দু। তারাশঙ্করের ব্যক্তিজীবন ও শিল্পীসত্তা একেবারে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কল্পনা ও হৃদয়ের মিশ্রণ, প্রতিভা ও বিনয়ের দারুণ সমন্বয় ঘটেছিল তারাশঙ্কর সাহিত্যে।

তারাশঙ্কর জন্মেছিলেন ১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ জুলাই। সূর্যোদয়ের ঠিক আগে, বীরভ‚ম জেলার লাভপুর গ্রামে তাঁর জীবনযাত্রা শুরু। ব্রাহ্মমুহূর্তে সূর্য উদিত হননি, তাঁর লাল আভা ফুটেছে পূর্বদিগন্তে। শাস্ত্রমতে এমনি সময় জন্মেছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। এক পড়ন্ত জমিদার পরিবারে জন্মেছিলেন তিনি। জমিদারি তখন প্রায় তলানিতে ঠেকেছে, কিš‘ তার ভালোমন্দ আঁকড়ে থেকেছে পরিবারের মানসিকতায়। কৈশোরে তাই তিনি দেখেছেন সামাজিক শক্তিসমূহের নতুন বিন্যাস। এক উত্তাল সময়ের মধ্যে কেটেছে পুরো সময়। দু দুটো বিশ্বযুদ্ধ, অসহযোগ আন্দোলন, স্বদেশি আন্দোলন, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, খেলাফত আন্দোলন, ভারত ছাড়ো আন্দোলন, দেশভাগ, ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষে বাংলায় ৩৫ লাখ মানুষের মৃত্যুÑএসব প্রভাব ফেলেছে তাঁর মননে ও সৃজনে। তারই ফসল এই বিপুল সাহিত্য সম্ভার। তিয়াত্তর বছর জীবনের দুই-তৃতীয়াংশ কেটেছিল সাহিত্য সাধনায়। জেল থেকে বের হয়ে এসে বলেছিলেন, সাহিত্যসেবার পথেই দেশের সেবা।

শৈলজানন্দের লেখায় একটি ঘটনার কথা জানা যায়। ১৯৩০ সালে মিছিল করার কারণে লাভপুর থেকে ধরা পড়লেন তারাশঙ্কর। তাঁর বিচার হবে। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তারাশঙ্কর। এসডিও ছিলেন মণি সেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনি বারবার অনুরোধ করলেন, আপনি একবার শুধু বলুন রাজনীতি আপনি ছেড়ে দেবেন। এসব নোংরা কাজ আর করবেন না। তাহলে আপনাকে আমি ছেড়ে দেব। তারাশঙ্কর সেই যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলেন তেমনি দাঁড়িয়ে রইলেন। মাথা হেঁট করলেন না। বললেন, দেশকে আমি ভালোবাসি। আপনি একে নোংরা কাজ বলছেন? ছিঃ! তারাশঙ্করের এক বছরের জেল হলো। (তথ্যসূত্র : বিশ্বনাথ দে সম্পাদিত তারাশঙ্কর স্মৃতি)

জেল খেটেছিলেন ছ মাস। ১৯৩০ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত। জেল থেকে ফেরার সময় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফিরেছিলেন যে, আর রাজনীতি করবেন না। জেলে থাকাকালীন রাজনীতির যে নগ্ন দলাদলি তাঁর চোখে পড়েছিল তাতে তিনি ভীষণ ব্যথিত হয়েছিলেন। সুতরাং রাজনীতি নয়, সাহিত্যের মাধ্যমে দেশসেবায় ব্রতী হন।

তারাশঙ্করের জ্যেষ্ঠপুত্র সনৎকুমার ছিলেন তাঁর লেখার প্রথম পাঠক ও প্রেরণার উৎস। সনৎকুমার লিখেছেন, ‘তারাশঙ্করের সাহিত্যপথ ধরে চলা ছিল একেবারে নিয়তি এবং বিধির নির্দিষ্ট বিধান। ১৯১০ সালে যখন তারাশঙ্করের পিতা হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ¯’ানীয় এক ধনী জমিদারের রাজকর্মচারী দ্বারা তিরস্কৃত হয়েছিলেন। এই ঘটনার পর দেওঘরে বসে কেঁদেছিলেন হরিদাস। পিতার চোখের জল পুত্র তারাশঙ্করকে ব্যথিত করেছিল। এই ঘটনা তারাশঙ্করের মনে ইংরেজদের প্রতি বিদ্বেষের বীজ বপন করে দিয়েছিল।’ তাঁর ভাষায়, ‘রাজার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী বিদ্রোহের মনোভাব এইভাবে সৃষ্টি হলো। তার সঙ্গে অন্তরের যোগসূত্র তৈরি হয়েছে স্বাভাবিকভাবেই। প্রাণে প্রাণে অনুভব করেছি এরই মধ্যে আমার জীবনের সার্থকতম বিকাশ।’

১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথের বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনে তরুণদের সাড়াÑবন্দেমাতরম ধ্বনি, কবিগুরুর কণ্ঠে ধ্বনিত হলো ‘বাংলার মাটি বাংলার জল পুণ্য হউক’। এরপর বিপ্লববাদের প্রতি আকর্ষণ। এসবই ছিল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখক হয়ে ওঠার মূলমন্ত্র। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ঘুরে বেড়ানোর নেশা। এক সাক্ষাৎকারে প্রেমেন্দ্র মিত্র জিগ্যেস করলেন, রাজনীতি, সাহিত্য ও আধ্যাত্মজীবনÑএই তিনের মধ্যে হয়তো মূলত কোনো বিরোধ নেই। তবুও ব্যবহারিক জগতে আমরা এগুলোকে আলাদা করে দেখি। তোমার মধ্যে এই তিনটির প্রবণতা আছে। তার মধ্যে সাহিত্যকে তুমি মুখ্য করে বেছে নিলে কেন?

তারাশঙ্কর উত্তরে বলেন, আমি বলব প্রেমেন যে তুমি ঠিকই ধরেছ। তিনটি জিনিসই আমার মধ্যে ছিল। কিš‘ সাহিত্যকে বেছে নিলাম আমার রুচির জন্য এ কথা বললে ঠিক হবে না। বেছে নিলাম ঘটনাচক্রে। কিš‘ বাইরের ঘটনার চাপও বটে। সংক্ষেপে বলিÑসাহিত্য ও অধ্যাত্মজীবনে কোনো বিরোধ নেই। কিš‘ আধ্যাত্মিক জীবন ও রাজনীতি ও সত্য-মিথ্যা নিয়ে কিছু বিরোধ আছে। আধ্যাত্মজীবন, রাজনীতি ও সাহিত্যÑতিনটে আমার মধ্যে থাকার জন্য রাজনীতি আমি মুখ্যভাবে নিতে পারিনি, আধ্যাত্মজীবনের জন্য, সত্য-মিথ্যার জন্য। সুতরাং আধ্যাত্মজীবন এবং সাহিত্যÑযেখানে কোনো বিরোধ নেই সেখানে সাহিত্যকে আমি বেছে নিয়েছিলাম আমার প্রকাশের জন্য। জীবন সাধনার জন্য।

তারাশঙ্করের সৃষ্টিসম্ভার প্রথম দিকে কবিতা ও নাটক দিয়ে শুরু হয়েছিল। তারপর ছোটোগল্প লেখক, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, চিত্রশিল্পী কত কী! তিনি গল্প লিখেছেন ১৯০টি আর গল্পগ্রš’ প্রকাশ হয়েছে ৬৫টির মতো। উপন্যাস ৬৭টি, আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা ৮টি, নাটক ১৩/১৪ টি। লিখেছেন অজস্র প্রবন্ধ। যা বিভিন্ন পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত হয়েছে। গান লিখেছেন ৭০টি। এর মধ্যে কিছু গান শিল্পীদের কণ্ঠে রেকর্ড করা হয়েছে। ছবি এঁকেছেন ৩০টি, ভাস্কর্য করেছেন ১০টি। এগুলোর প্রদর্শনীও করেছিলেন।

প্রথম লেখা প্রকাশ বয়স সাত পেরিয়ে আটে পড়েছে তখন। খড়খড়িওয়ালা দরজার গায়ে খড়ি দিয়ে লিখলেন প্রথম কবিতাÑ

পাখির ছানা মরে গিয়েছে

মা ডেকে ফিরে গিয়েছে

মাটির তলায় দিলাম সমাধি

আমরাও সবাই মিলিয়া কাঁদি।

এরপর ১৩১৩ বঙ্গাব্দে শারদীয় পূজা উপলক্ষ্যে যৌথ কবিতা লিখে কলকাতার কলিডেনিয়ান প্রেস থেকে ছাপিয়ে প্রতিবেশীদের মধ্যে বিলি করেন। ১৩৩২ বঙ্গাব্দে একটি সাহিত্য সম্মেলনে কবিতা পাঠ করেন। এরপর ভারতবর্ষ পত্রিকায় ‘নান্নুর পথে’ কবিতাটি ছাপা হয়। ১৩৩৩ বঙ্গাব্দে গ্রান্ট ডফের লেখা তিন খÐের মারাঠা ইতিহাস পড়ে রচনা করে ফেলেন নাটক ‘মারাঠা দর্পণ’। মঞ্চ¯’ করলেন এবং বিস্ময়করভাবে সফল হলেন। প্রথম জীবনের সাহিত্যগুরু নাট্যকার নির্মলশিব বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভরসায় আরো একখানা নাটক রচনা করেন। কিন্তু তা মঞ্চস্থ করতে রাজি হননি থিয়েটার কর্তৃপক্ষ। অভিমানে পুড়িয়ে ফেলেন সেই পাÐুলিপি। কিছুদিন নীরব থাকেন।

১৯২৫-২৬ সালে লাভপুর গ্রাম থেকে প্রকাশিত হতে শুরু করল মাসিকপত্র ‘পূর্ণিমা’। সাহিত্যগুরু নাট্যকার নির্মলশিব বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় তাঁর পুত্র সত্যনারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় হলেন প্রকাশক আর তারাশঙ্কর হলেন সহসম্পাদক। কবিতা, গল্প, সমালোচনা সবই লিখতেন এখানে। তারপর হঠাৎ পেলেন সৃষ্টির এক নতুন দিগন্ত। প্রেমেন্দ্র মিত্র ও শৈলজানন্দের লেখা পড়ে মনে হলো তিনিও এমন লেখা লিখতে পারেন।

মুর্শিদাবাদের কোল ঘেঁষে বীরভ‚মের প্রান্তসীমায় বেলেড়া গ্রামে দেখেছিলেন কমলিনী বৈষ্ণবীকে, দেখেছিলেন তার আখড়া। তাকে নিয়ে লিখলেন একটি গল্প‘র সকলি’।

নিজের লেখা কষ্টিপাথরে যাচাই করে নিতে চাইলেন। পাঠিয়ে দিলেন প্রবাসী পত্রিকায়। কি ন্তু তখন মাইকেল মধুসূদন, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র বাংলা সাহিত্যকে মহিমান্বিত করে চলেছেন প্রতিনিয়ত। তখন সমগ্র বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছে বাংলা সাহিত্য। ‘রসকলি’ প্রকাশিত হলো না প্রবাসীতে। আট মাস অপেক্ষা করে ফিরিয়ে আনলেন লেখাটি। পাঠালেন ‘কল্লোল’ পত্রিকায়। কিছুদিনের মধ্যে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের চিঠি পেলেনÑ‘আপনার গল্পটি মনোনীত হইয়াছে। ফাল্গুন মাসেই ছাপা হইবে। আপনি এতোদিন চুপ করিয়া ছিলেন কেন?’

১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়। তাই তাঁর সাহিত্যজীবনের কাল গণনা শুরু ১৯২৭ সাল থেকে। লিখে গেছেন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত। একটানা ৪৫ বছর। আর প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস চৈতালি ঘূর্ণি ১৯৩১ সালে। যার খসড়া করছিলেন জেলখানায় বসে। খুব একটা সমাদৃত হয়নি প্রথম উপন্যাসটি। স্মৃতিচারণে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘সাহিত্যজীবনের প্রথম ভাগটা আমার অবহেলার কাল।’ ইতিপূর্বে প্রথম কাব্যগ্রš’ ত্রিপত্র প্রকাশিত হয়।

সামগ্রিক সমাজজীবনকে চিত্রায়িত করেছেন গল্প-উপন্যাসে। প্রথম জীবনে কবিতা ও নাটক লিখলেও তাঁর স্বক্ষেত্র হলো গল্প-উপন্যাস। এই বিপুল সম্ভারে তিনি এঁকে গেছেন তৎকালীন সমাজচিত্র। সেখানে প্রান্তিক মানুষের জীবনযুদ্ধ মূর্ত হয়ে আছে। তাঁর ছোটোগল্প ও উপন্যাসে এলো সাঁওতাল, ডোম, কাহার, বেদে প্রভৃতি প্রান্তিক মানুষেরা। এলো বৈষ্ণব, ঝুমুরদল, কবিয়াল, উচ্চ বিত্ত চাষি থেকে বর্গাচাষি পর্যন্ত বিস্তৃত বিবিধ জীবিকার সঙ্গে যুক্ত চরিত্রসমূহ।

বৈষ্ণব সমাজের পটভ‚মিতে লিখেছেন, ‘রসকলি’, ‘রাইকমল’, ‘মালাচন্দন’, ‘হারানো সুর’। জমিদারদের জীবন নিয়ে লেখেন ‘জলসাঘর’ ও ‘রায়বাড়ি’। সামন্ততন্ত্রের শেষ ও শিল্পতন্ত্রের সূচনাকাল ছিল গল্পের পটভ‚মি। কুলিন সম্প্রদায়ের জীবন তুলে ধরেছেন ‘কুলিনের মেয়ে’, ‘মধু মাস্টার’, ‘ব্যাধি’, ‘বিষধর’, ‘রঙিন চশমা’ গল্পে। প্রকৃতি ও নিয়তির লীলা নিয়ে লিখলেন ‘অগ্রদানী’ ও ‘তারিণী মাঝি’। পূর্ণ চক্রবর্তীর পৌরহিত্যের অন্তরালে অলস পরশ্রমভোজী এক জীবন স্বভাবের গল্প ‘অগ্রদানী’। অন্ত্যজ যাযাবর মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে লিখেছেন ‘নারী ও নাগিনী’ এবং ‘বেদেনী’। সমকালীন ঘটনা ও রাজনৈতিক সমাজ নিয়ে লিখেছেন ‘ইস্কাপন’, ‘মরামাটি’, ‘শেষ কথা’, ‘পৌষল²ী’, ‘অহেতুক’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, আগস্ট আন্দোলন এসবই ছিল গল্পের উপজীব্য। এক বৃদ্ধার জটিল মনস্তাত্তি¡ক অবস্থা নিয়ে লিখেছেন ‘ডাইনী’ গল্প। এখানে ডাইনী হলো এক ডোম মেয়ে সুরধুনী।

প্রথম উপন্যাস ‘চৈতালি ঘূর্ণি’র বিষয়ব¯‘ গ্রামীণ জীবন। জমিদার ও মহাজনের শোষণে জর্জরিত কৃষক ক্রমে শহরের শিল্পশ্রমিকে পরিণত হবার কাহিনি। দ্বিতীয় উপন্যাস ‘পাষাণপুরী’ প্রকাশিত হয় ১৯৩৩ সালে। এ দুটোর খসড়া লেখেন জেলখানায় বসে। ১৯৩৩ সালে বৈরাগিতলায় প্রকাÐ মেলা বসে। সেখানে তিনি দু দিন থাকলেন। মেলা থেকে ঘুরে এসে বাস্তব পটভ‚মিকায় রচনা করলেন গল্প ‘মেলা’। গল্পটি পড়ে ‘শনিবারের চিঠি’-র সম্পাদক সজনীকান্ত মন্তব্য করেছিলেন, এ লোকটি বাংলা সাহিত্যে অনেক কথাÑএ যুগের সকলের চেয়ে বেশি কথা বলতে এসেছে। এর পুঁজি অনেক। এনেছে অনেক।

বৈষ্ণব সমাজের জীবনচিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন ‘রাইকমল’ উপন্যাসে। এটি প্রথম গল্প হিসেবে প্রকাশিত হয়। একই পটভ‚মিতে লেখেন আরেকটি গল্প ‘মালাচন্দন’। পরে দুটিকে একত্রিত করে প্রকাশ করেন উপন্যাস ‘রাইকমল’, ১৯৩৪ সালে। উপন্যাসটি পড়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘তোমার রাইকমল আমার মনোহরণ করেছে।’

তাঁর আরেকটি শক্তিশালী সৃষ্টি ‘গণদেবতা’। বীরভ‚মের কৃষিজীবী মানুষের জীবন সংগ্রামের কাহিনি গণদেবতা। ১৯৪১ সালে প্রকাশিত। এটি যখন লিখেছিলেন তখন দেশব্যাপী ভারত-ছাড়ো আন্দোলন। লেখার মাঝে বাইরে গিয়ে দেখে আসেন আন্দোলন, এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়া। ফিরে এসে আবার লিখতে বসেন। ‘গণদেবতা’ লেখা শেষ করে লেখক কেঁদেছিলেন। তাঁর মনের সেই আকাক্সক্ষা প্রকাশ করেন শেষ কিছু লাইনে। দেবু ঘোষ, কামার অনিরুদ্ধ চরিত্রগুলো সমাজের চেনা চরিত্র। গ্রামীণ অর্থনীতির দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে ‘গণদেবতা’ উপন্যাসে। দেশপ্রেমিক তারাশঙ্কর উপলব্ধি করেছিলেন গ্রামবাংলার সমস্যা সমাধানের জন্য দরকার নেতা। যে কি না সুখ-দুঃখের সঙ্গে জড়িত থাকবে সরাসরি। এই উপলব্ধি থেকে সৃষ্টি করেন দেবু ঘোষ চরিত্রটি। জননেতা কখনো আবির্ভ‚ত হন না। তিনি নির্মিত হন অভিজ্ঞতার প্রতি পরতে। এই দেবু ঘোষই হয়ে ওঠেন গণদেবতা।

আরেকটি সমাদৃত উপন্যাস ‘কবি’। কেন্দ্রীয় চরিত্র নিতাই চরণ ডোম বংশদ্ভূত। যার পূর্বপুরুষ ছিল ডাকাত। তবুও নিতাই কবি হয়েছে। কলকাতার উ”চবিত্তরা নিতাইকে কবি হিসেবে মানতে বাধ্য হয়। নিতাই ঝুমুরদলে যোগ দেয়। দুটি নারী চরিত্র কবি উপন্যাসেÑবসন্ত ও ঠাকুরঝি। ঝুমুরদলে থেকে নিতাইয়ের আত্মানুসন্ধান এক অনন্য মাত্রা পেয়েছে।

সাঁতালী গ্রামের বেদে সম্প্রদায়ের জীবনকাহিনি নিয়ে রচনা করেন উপন্যাস ‘নাগিন কন্যার কাহিনী’। বেদে সম্প্রদায়ের গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনের প্রেম, লোভ-লালসার নগ্নচিত্র এঁকেছেন এই উপন্যাসে। প্রকাশিত হয়েছে ১৯৫০ সালে।

তারাশঙ্করের এপিকধর্মী উপন্যাস ‘আরোগ্য নিকেতন’। জন্ম-মৃত্যু, ইহকাল-পরকালের এক গভীরতম বিন্যাস এটি। উপন্যাসের জীবন মশায় চরিত্র যেন তারই বিম্বিত প্রতিরূপ। জীবন মশায়কে কেন্দ্র করে ছোটো ছোটো ঘটনার মাধ্যমে গভীরতম দর্শন প্রকাশ করেছেন।

জীবনবোধের আরো একটি সার্থক রূপায়ণ ‘সপ্তপদী’। কেন্দ্রীয় চরিত্র কৃষ্ণেন্দু ও রিনা ব্রাউন। ঈশ্বরকে মানা আর না মানা নিয়ে দুজনের বি”েছদ। ঈশ্বরকে ভালোবাসে রিনা ব্রাউন। কিš‘ যখন নিজ জন্ম-পরিচয় জানতে পারে তখন প্রবল ঘৃণায় ঈশ্বরকে ছুড়ে ফেলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিজেকে উৎসর্গ করে মানবসেবায়। কৃষ্ণেন্দু ঈশ্বরের সাধনায় নিজেকে সঁপে দেয়। পাপপুণ্যের রহস্য, প্রেম বি”েছদ, পাওয়া না-পাওয়ার দ্বন্দ্বে এক আশ্চর্য ঘোরের মধ্যে ফেলে দেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘সপ্তপদী’ উপন্যাসে।

‘জনপদ’ উপন্যাসেও সমাজের বাস্তবতা চিত্রিত হয়েছে। জনপদ যারা গড়ে তোলে তারা গরিব চাষি। তাদের শ্রম তারা ঢালে জনপদে। কিন্তু‘ মহাজনের ঋণের দুষ্টচক্র থেকে বের হতে পারে না। ফলে ক্ষোভ ও অস্থিরতা তৈরি হয় জনপদে। প্রেম, ধর্ম, নতুন রাজনৈতিক শক্তির উথান এসব নিয়েই জনপদ। এখানকার তরুণ প্রজন্ম আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে সো”চার হয়, স্বপ্ন দেখে। কিন্তু‘ লোভ ও চাপে পড়ে দ্বিধান্বিত হয়। নারীচরিত্র গড়েছেন ন্যায়বিচার, মূল্যবোধ ও জনপদের বিবেক হিসেবে। একটা সমাজকে যখন ভিতর থেকে দুর্বল করে দেওয়া যায় তখন সে সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।

এভাবে প্রতিটি গল্প ও উপন্যাসে তিনি চমক দেখিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মানুষই দেখেছি আমি। মানুষ খুঁজে বেড়িয়েছি। দেখেছি প্রতিটি মানুষের মধ্যেই কখনো না কখনো এমনি একেকটি বা কয়েকটি বিচিত্র বিকাশ হয়, যা মনে করিয়ে দেয়, বুঝিয়ে দেয় তারও মধ্যে আছে সুন্দর বা মধুরের একটি প্রবাহ। সে শুধুই বালুচর নয়, হঠাৎ একদিন বালুচর ভেদ করে উৎসারিত হয় মধুরের একটি নির্ঝর। প্রতিটি মানুষের মধ্যেই হয়।’ সারা জীবন তিনি এভাবে উপলব্ধি করেছিলেন জীবনকে। যার দরুন সমকালে বেঁচে থেকেও সমকালীনতার সঙ্গে শ্বাশত রূপ ধরা পড়েছিল তাঁর দৃষ্টিতে।

সাহিত্যজীবন শুরু হয় অবহেলা পেয়ে। প্রথমে একটি নাটকের পাÐুলিপি ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তারপর ‘প্রবাসী’ থেকে প্রথম গল্প ‘রসকলি’ ফেরত আনতে হয়। এরপর প্রথম উপন্যাস চৈতালি ঘূর্ণি তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি। তাঁর পুত্র সনৎ লিখেছেন, “এ যাত্রায় তিনি যদি একজনের সাহায্য ও প্রীতি না পেতেন তাহলে বোধহয় বিরূপ সাহিত্যক্ষেত্র পরিত্যাগ করে আবার রাজনীতির জীবনে অথবা গ্রামের জীবনে ফিরে যেতেন। তাঁর নাম সজনীকান্ত দাস। সজনীকান্ত দাসের কাছে ১৯৩৩ সাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সাহিত্য-বন্ধু হিসেবে যে ভালোবাসা পেয়েছেন তা তারাশঙ্করের জীবনে অ¤øান হয়ে আছে। আরো কয়েকজন অভয়বাণী দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম রবীন্দ্রনাথ ও মোহিতলাল মজুমদার। এছাড়াও আরেকজন আছেন যিনি প্রথম দেখায় তিরস্কার করলেও পরবর্তীতে ‘কালিন্দী’ পড়ে ক্ষমা চেয়েছিলেন। তিনি হলেন শিবরাম চক্রবর্তী। ‘কবি’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হবার বলেছিলেন, ‘ইউ আর গ্রেট নভেলিস্ট। আপনার কবি নোবেল পুরষ্কার পাবে।”

সাহিত্য পুরস্কার ও সংবর্ধনায় ভ‚ষিত হয়েছেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। পেয়েছেন সম্মানসূচক ডিগ্রি। ১৯৪৭-৪৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেলেন শরৎস্মৃতি পদক। পঞ্চাশ বছরে পদার্পণ উপলক্ষ্যে সাহিত্যিকদের উদ্যোগে সম্মাননা পেলেন এ বছর। রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার পান ১৯৫৫ সালে। ১৯৫৬ সালে আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন ড. রাধেকৃষ্ণনের হাত থেকে। ১৯৫৭ সালে চীন সরকারের আমন্ত্রণ পেয়ে চীন ভ্রমণ করেন। ভারতীয় লেখকদলের নেতারূপে তাসখন্দে এশীয় লেখক সম্মেলনে যোগদান করেন। ১৯৫৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জগত্তারিণী পদক লাভ করেন। ভারত সরকার কর্তৃক পদ্মশ্রী উপাধি লাভ করেন ১৯৬২ সালে। শিশিরকুমার পুরস্কার পেলেন ১৯৬৩ সালে। ভারতের সর্বাধিক অর্থমূল্যের পুরস্কার জ্ঞানপীঠ প্রবর্তনের বছরই তিনি এটা লাভ করেন। সালটি ছিল ১৯৬৭। ভারত সরকার কর্তৃক পদ্মভ‚ষণ উপাধি লাভ করেন ১৯৬৮ সালে। এ বছরই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডিলিট উপাধি প্রদান করা হয়। সাহিত্য আকাদেমি কর্তৃক ফেলো মনোনীত হন ১৯৬৯ সালে। আর নিজ গ্রাম লাভপুরবাসীদের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেওয়া হয় ১৯৭০ সালে।

অনন্তযাত্রা : তিনি একটি ফাউন্টেন পেন কিনেছিলেন। কিš‘ লেখার অবকাশ হয়নি। কিনেছিলেন ফিয়াট গাড়ি। ১৯৭১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার সকাল ৬টা ৪২ মিনিটে ঘটে মহাপ্রয়াণ। নিমতলা মহাশ্মশানে হয় শেষকৃত্য। সন্ধ্যা ছটায় বড়ো ছেলে সনৎকুমার মুখাগ্নি প্রদান করেন।

তাঁর মৃত্যুর পর ১ অক্টোবর ১৯৭১ তারিখে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সম্মানসূচক (মরণোত্তর) ডিলিট উপাধি প্রদান করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় রাজ্যপাল শ্রীযুক্ত এ. এল. ডায়াস তারাশঙ্করের টালা¯’ বাসভবনে গিয়ে তারাশঙ্করের স্ত্রী উমাদেবীর হাতে উপাধি অর্পণ করেন।

তথ্যসূত্র :

১. তারাশঙ্কর ও সমকালীন সাহিত্য সমাজ-সরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়

২. আমার সাহিত্য জীবন-তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

৩. তারাশঙ্কর স্মৃতি-বিশ্বনাথ দে

৪. শনিবারের চিঠি তারাশঙ্কর সংখ্যা-রঞ্জনকুমার দাস

৫. স্মৃতিতে তারাশঙ্কর-সনৎকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়