বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬
সাহিত্য-সংস্কৃতি

উপহার

উপহার

কোনো মানুষ কাঁদলে তাকে এত সুন্দর লাগে, আমার ভাইকে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। টসটস করে যেন চোখ থেকে ঝরছে পাকা লিচুর রস। ওর দিকে তাকিয়ে আমার ঠিক এমনই মনে হলো। আমি মুখ নিচু করে ঘাড় বাঁকিয়ে ভাইয়াকে দেখার চেষ্টা করছি। মেঝেতে উবু হয়ে বসে কাঁদছে। কাঁদছে এটা দূর থেকে দেখলে একটুও বোঝা যা”েছ না। মনে হচ্ছে মেঝের দিকে তাকিয়ে ভাঙা মেঝের সাদা কালো টুকরো গুনছে। আমিও তার পাশে উবু হয়ে বসি। দেখি, ওমা ভাইয়ার চোখ দিয়ে টসটসে পানি ঝরছে। শরীরটুকু কাঁপছে না একটুও। কে বুঝবে দূর থেকে যে ও কাঁদছে! বলি, ‘ভাইয়া কাঁদো ক্যান?’

কিছু বলে না। দু হাত দিয়ে চোখের জল মোছে। চোখের মধ্যে এখনো কয়েক বিন্দু জল জমে আছে। টপটপ করে ঝরতে থাকে। আমি হাত দিয়ে সেই রসের মতো জল মুছে দেই ভাইয়ার গাল থেকে। আদর জমা কণ্ঠে আবার জিগ্যেস করি, ‘বল না কাঁদো ক্যান?’

আমাদের জিনিস…

‘হায় আল্লাহ, তুমি এত বোকা ক্যান ভাইয়া, আমাদের জিনিস তো আমাদেরই থাকবে। এই জন্য কেউ কাঁদে?’

দুই বছরের বড়ো ভাইকে বুঝ দিয়ে শান্ত করি। আমি যে ভেতরে কেঁপে উঠি না তা নয়। আমার কেঁপে ওঠা জলজ নয়, তাতে বরং আগুন আছে, তাপ আছে। জিতে যাবার আকাক্সক্ষা আছে। তবু আমি বাইরে ঠান্ডা বরফের মতন জমাটি। জল হই না। কারণ আমি ১২ বছর বয়সে এই নিয়মটুকু বুঝে গেছি, সামনে কেউ ভেঙে গেলে, আমাকে কঠিন হতে হবে। ততটা কঠিন যতটায় আমাকে সাহসী মনে হয়, নায়ক মনে হয়। ছোটো থেকে মা বলে ভাইয়া নরম, আমি কঠিন। কেন বলে জানি না। কিš‘ এমনটা শুনতে শুনতে কঠিন হবার এই কঠিন অভিনয় চালিয়ে যাচ্ছি। অভিনয় থেকে অভ্যাসে আমি কঠিন হয়ে উঠছি। ভেতরে কেঁপে উঠি মাঝে মাঝে, কিš‘ ভাঙি না। এই যে এখন ভাইয়া জলে ভাসছে, আর আমি ভাবছি কী করা যায়।

আসলে ঘটনাটা নাড়িয়ে দেওয়ার মতনই। আমরা মানে আমাদের পরিবার একটা উপহার পেয়েছি। আমার ধারণা ছিল উপহার হয় ছোট্টো। দুই হাতে এঁটে ফেলা যায়, সস্তা চকচকে কাগজে মোড়ানো বাক্স, বাইরেরটা যতটুকু, ভেতরে তার চেয়ে ছোট্টো কিছু। বই কিংবা ফুলদানি। উপহার যে এত বড়ো হতে পারে, আমার এ জীবনে ধারণা ছিল না। যে জীবনে আমরা থাকি, তা খুব একটা খারাপ তা নয়। এর চেয়ে ভালো থাকিনি বলে জানি না এর চেয়ে ভালো থাকা কেমন। আমরা থাকি ধানমন্ডি ৭ পার হয়ে গ্রিন রোডে ঢুকলে হাতের বাম দিকের প্রথম গলিতে। এলাকার নামের ভার অনেক। নামের গুণে মনে হয় আমরা মনে হয় এ শহরের ঝকঝকে বাসিন্দা। কিš‘ বড়ো এলাকার ভেতরে ছোটো ভাঁজগুলোতে আরো অনেকরকম মানুষ থাকে। যারা এলাকার ঝা চকচকে মানুষগুলোর জীবনকে অনেক দূরের, প্রায় চাঁদের জীবন মনে করে। যারা এ শহরের এমন ভাঁজে ভাঁজে বাস করে, তারা এবং তাদের কাছেপিঠের মানুষজনই শুধু সে গলির খবর রাখে। আমরা ঠিক তেমন এক জায়গাতে বাস করি। গ্রিন রোডের ঐ গলির শেষ মাথায় একটা ছোট্টো কলোনি আছে।

নজরে আলী স্টাফ কলোনি। সরকারি কলোনি নয়। তবে শুনেছি, মুক্তিযুদ্ধের আগে সরকারি লোকজনই থাকত। পুরোনো দালান, তিনতলা করে চারটি দালান আর এক চিলতে জমি। তারপর পরিত্যক্ত পরেই ছিল। যুদ্ধ শেষের অনেক পরে নজরে আলী নামের পুরান ঢাকার এক ব্যবসায়ী কিনে নেয় জায়গাটুকু। সে থেকে তার নামেই কলোনির নাম। এখানে যারা বাস করে তারা চাকরিজীবী। বিভিন্ন বেসরকারি অফিসের ছোটো পদের কর্মচারী। সরকারি দুই একজন লোকও থাকে, পিওন, কেরানি গোছের। প্রায় ঝুরঝুরে দালানগুলো সেই কবে একবার মেরামত করেছিল নজরে আলী। মেঝেতে মোজাইক দিয়েছিল, দেয়ালে নতুন রং। সেও বহু বছর আগের কথা। নামমাত্র মূল্যে ঠনঠনে বেতনের কর্মচারীরা এমন ঝুরঝুরে বাড়িতে থাকে। সোনার দামে দাম জমির এখানে। শুনেছি, ভালো রিয়েল এস্টেটের খোঁজ পেলেই জায়গা বিক্রি করে দেবে। ততদিন পর্যন্ত কিছু ভাড়া পাচ্ছে এমন ভেঙে ভেঙে পড়া দালান থেকে, মন্দ কী?

আমার আব্বার সূত্রে আমরা এ বাড়িতে থাকি। সে সোনালি ফাউন্ডেশন বলে একটা পাট আর কারুশিল্প বিষয়ক এনজিওর অ্যাকাউন্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট। ছোটো একটা অফিসে সামান্য চাকরি। কয়েকমাস বেতন বন্ধ থাকে, আবার প্রজেক্ট এলে টাকা পায়। আব্বা এই চাকরিতেই গেল নয় বছর ধরে কাজ করে। কারণ দুটিÑএনজিওর মানুষেরা খুব ভালো, দেরিতে হলেও বেতন দেওয়ার চেষ্টা করে, ব্যবহার ভালো। দ্বিতীয় হলো আমার আব্বা টেনেটুনে বিএ পাশ। কোনোমতে তদবিরে এই কাজ পেয়েছিল। অন্য চাকরিতে যাওয়ার যোগ্যতা এবং মানসিক শক্তি তার নেই বলে সে মনে করে। এই অফিসের বাঁধাধরা কাজ শিখেপড়ে নিয়েছে। যতদিন পারে এখানেই থাকবে। আর তাই আমাদের বেঁচে থাকাও একইরকম, চলছে।

আম্মা, আব্বা, আমি আর ভাইয়া আমাদের চারজনের সংসারে চাহিদা আর জোগান মিলেমিশে চলে। আমরা দুই ভাইবোন সরকারি স্কুলে পড়ি। বাড়ির কাছেই, দিব্যি হেঁটে যাওয়া-আসা করা যায়। আব্বার একটা পুরোনো সাইকেল আছে অফিস আর বাজারে যাওয়ার জন্য। ছুটির দিনে বেড়াতে গেলে আমরা দুইটা রিকশা নেই। আমাদের ঢাকায় আত্মীয়স্বজন তেমন নেই। মিনু খালা আছে। আব্বার দুই-একজন বন্ধু, চিড়িয়াখানা আর শিশুপার্ক। সেটাও কালেভদ্রে যাওয়া হয়। আব্বা বোনাস পেলে, এক ঈদে আমরা নতুন কাপড় কিনি। আমাদের দুই ভাইবোনের জন্মদিনে আর ঈদের দিন এক বেলা পোলাও রান্না হয় আর মুরগির কোর্মা। আমার আম্মা এইচএসসি পাশ, কিন্তু‘ ভারি বুদ্ধিমান মানুষ। সে-ই আমাদের দুই ভাইবোনকে পড়ালেখা করায়। আমাদের দুই ভাইবোনের বুদ্ধি ভালো, পড়াশোনায় কোনো ঝামেলা নেই। বাড়তি টিউশনের প্রয়োজন নেই। ভাইয়ার পুরোনো বই নোটপত্র দিয়ে পড়াশোনা করি। আমরা আম্মার বুদ্ধি পেয়েছি, আব্বা বলে। আম্মা আর আব্বা মিলে চাহিদা জোগানের যে ভারসাম্য করে সংসার চালায়, আমাদের তাতে চলে যায়। বাড়তি বলে আমাদের কিছু নেই, না-চাওয়া না-পাওয়া।

এমন এক সময়ে আমাদের চাচা, আব্বার বড়ো চাচাতো ভাই বেড়াতে এলো সৌদি থেকে। বহু বছর সৌদি থাকেন, তার সঙ্গে আমার অনেক ছোটোবেলায় দেখা হলেও কোনো স্মৃতি নেই। আমাদের বাসায় সেবার পাঁচদিন ছিলেন তিনি। হোটেলে থাকতে চেয়েছিলেন তারপর সেখান থেকে সোজা দেশের বাড়ি বাগেরহাট। কিš‘ আব্বা জোর করল, ‘ভাইজান আমি থাকতে হোটেলে থাকবেন?’

আব্বা বলল, চাচাও থেকে গেল বটে। আমার ঘরটা ছেড়ে দেওয়া হলো, আমি আম্মা-আব্বার সঙ্গে যেয়ে রাতে ঘুমাই। কিš‘ কীভাবে সেবার বাড়তি খরচ সামাল দিল আব্বা-আম্মা তারাই জানে। আমরা মাসের প্রথম শুক্রবারে মুরগি খাই শুধু, আব্বা বাজার থেকে একটা মুরগি জবাই করে আনে, আম্মা রাঁধে, সেটা আমরা দুই বেলা খাই। সেখানে চাচার জন্য এই পাঁচদিনে দুইবার মুরগি রান্না হলো। ডিম, সবজি, খিচুড়ি, পায়েস, নাড়–, নুডলস। চাচাকে আপ্যায়ন করা হলো। চাচা আমাদের একদিন চাইনিজ রেস্টুরেন্টে নিয়ে খাওয়াল। এমন ভালো সময় কি আর বারবার আসে?

একদিনকে চাচা গরমে অস্থির হয়ে ঠান্ডা পানি চাইল। আম্মা আমাকে তড়িঘড়ি করে সুমিদের বাসায় পাঠাল, এক বোতল ঠান্ডা পানির জন্য। সুমিদের বাড়িতে তালা, কই যেন বেড়াতে গেছে।

আম্মা লজ্জায় মিশে গেল, ‘ভাইজান ঠান্ডা পানি তো নাই।’

চাচা ভালো মানুষ। কিছু মনে করে না, ‘আসলে গরমে অস্থির তো, কোনো অসুবিধা নাই। ফ্রিজে এক বোতল পানি রেখে দিয়ো, ঠান্ডা হলে খাব।’

আম্মা যেন এবার লজ্জায় পুরো গলে যায়, চাচাকে বলে, ‘আমাদের কোনো ফ্রিজ নাই ভাইজান।’

চাচা মনে হলো এমন অবাক কথা জীবনে শোনেনি, ‘তোমাদের ফ্রিজ নাই তো বাজার রাখ কীভাবে? মাছ মাংস?’

এই প্রশ্নের উত্তর আম্মা দেয়নি। আসলে আমাদের প্রয়োজন হয়নি। কিংবা আমরা আমাদের প্রয়োজনকে মানিয়ে নিয়ে জীবন চলছি। আব্বা অফিসে যাওয়ার আগে সামনের বাজার থেকে প্রতিদিনের সবজি, ভাগের মাছের ৫/৬ টুকরা না হয় ছোটোমাছ এক পোঁটলা কিংবা এক হালি ডিম এনে দেয়। আম্মা তা রাঁধে। প্রতিদিনের খাওয়া তো প্রতিদিন শেষ। অল্প কিছু সময়ে মুড়ি-গুড় দিয়ে আমরা রাতের খাওয়া সারি। আমাদের জীবনে তো বাড়তি কিছু নেই, রেখে দেওয়ার মতন, ফেলে দেওয়ার মতন।

চাচা আবার রাতে খাবার সময় কথা তোলে। আব্বাকে বলে, ‘মনু তোদের ফ্রিজ যে নাই, কুরবানির ঈদে কী করিস?’

আব্বা ইনিয়েবিনিয়ে জানায়, আমাদের তো কুরবানি অমন করে দেওয়া হয় না। দেওয়া হলে পাড়া-প্রতিবেশীর দুই-একজনের ফ্রিজ আছে, সেখানে রাখি।

আসল কথা হলো, প্রতিবার কুরবানি ঈদের আগে আব্বাদের অফিসে বেতন পেতে দেরি হয়, কখনো ঈদের পরেও পায়। হাতে গুনে যে কয়বার এক ভাগ কুরবানি দেওয়া হয়েছে, প্রতিবেশীদের ফ্রিজে অনুনয়-বিনয় করে কয়েকদিনের জন্য দুই পোঁটলা মাংস রাখতে দিয়েছে। ইদানীং আর দেয় না। সুমিরাও গেল দুই বছর স্রেফ মানা করে দিয়েছে, ফ্রিজে জায়গা নেই বলে। মিনু খালা প্রতিবার মাংস পাঠায় এক পোঁটলা সেটা আম্মা জ্বাল দিয়ে দিয়ে রেখে দেয়। আমাদের তাই ফ্রিজের দরকার হয়নি, বা আমরা দরকার তৈরিও করিনি।

চাচা পাঁচদিন আমাদের সঙ্গে কাটিয়ে, রান্না খাওয়ার সুনাম করে, আমাদের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে, খুশিমনে বাগেরহাট গেলেন। যাওয়ার আগে দিয়ে গেলেন উপহার। এত বড়ো উপহার যা আমি কোনোদিন আগে দেখিনি। ঠেলাগাড়ির সঙ্গে বাঁধা সেই উপহার খয়েরি কাগজের এক বাক্সে আমাদের বাড়ি এলো। ভেতরে একটা মাখন রঙের ইয়া বড় ফ্রিজ। প্রতিবেশীদের ভিড় জমে গেছে বাড়ির সামনে। দুই-তিনজন প্রতিবেশীর বাড়ি থুরথুরে বুড়ো চেহারার ফ্রিজ আছে বটে। এত্তো বড়ো লম্বা নতুন ফ্রিজ কারো বাড়িতে নেই। তবে উপহার একা আসেনি। মাখন রঙা ফ্রিজ, জীবনকে কেমন নানা রঙে জাগিয়ে দিয়েছিল।

ফ্রিজ তো এলো, কই রাখা হবে? আমাদের এ পুরোদিনের বাড়িতে তিনটি বেখাপ্পা সাইজের খুপরি ঘর আছে। সেই ঘরে রাখবার মতন জিনিস আমাদের নেই। একটায় আব্বা-আম্মা ঘুমায়। আমি একটা ঘরে, তৃতীয় ঘরে যাবতীয় ট্রাঙ্ক জমে থাকা জিনিসের একদিকে ভাইয়ার জন্য তোশক ফেলা, আর একটা পড়ার টেবিল আছে। মিনু খালা দিয়েছিল, উনার ছেলের পুরোনো টেবিল। তাতে আমি আর ভাইয়া বসে সন্ধ্যায় পড়ালেখা করি। এখন এর মধ্যে ফ্রিজ কই রাখা যায়? আমাদের বাড়িতে ঢুকলে একটা চিকন টানা বারান্দা, যার শেষ মাথায় ছোট্টো দেয়াল তুলে রান্নাঘরের মতন ব্যব¯’া করে রেখেছে মালিক। আমরা পাটি পেতে রান্নাঘরের সঙ্গে এ বারান্দাতেই খাওয়াদাওয়া সারি। বৃষ্টির দিন হলে কিংবা অনেক শীতে, আমার ঘরে কিংবা আব্বা-আম্মার ঘরে বসে দিব্বি খাবার আয়োজন করি। বারান্দা দিয়ে ডান দিকে ঢুকলে খালি যতটুকু জায়গা তাতে আমার শৌখিন আম্মা তিনটি বেতের চেয়ার পেতেছে। ঐ যে মিনু খালা কিংবা সৌদির চাচার মতন বিশেষ অতিথিরা এলে বসতে দিতে হয় তো। আমি আগে খুব এঁকেবেঁকে অভিমান করতাম, তিনটি চেয়ার কেন? আমরা তো চারজন। আম্মা বলেছে আমরা আরেকটা চেয়ারও কিনব কখনো। কিš‘ চেয়ার এখনো কেনা হয়নি। আর আমাদেরও তিনটি চেয়ারেই কেমন করে যেন চলে যায়। আর ঐ তিনটি চেয়ারের পেছনেই আসন হলো আমাদের নতুন উপহারের, ফ্রিজের। কেউ কখনো হয়তো শোনেনি যে কারো বসবার ঘরে ফ্রিজ থাকে। আমাদের এই আপাতদৃষ্টিতে মনে হওয়া একটুকরো বসার ঘর ছাড়া ফ্রিজটা কোথাও আটল না। দিব্যি জুড়ে বসল আমাদের সংসারে মাখন রঙের এক রাজার মতন ফ্রিজ।

প্রথম দু-তিনদিন আমরা সদ্য পাওয়া উপহারের আনন্দে ঝুনঝুন করছিলাম। মা পাশের মোড়ের দোকানের ফোন থেকে মিনু খালাকে জানাল আমাদের মাখন রঙের ফ্রিজের কথা। বাবা অফিসের ফোন থেকে তার বন্ধুদের ফোন করে কথার ফাঁকে টুক করে জানাল ফ্রিজটার কথা। দু-তিনদিন এমন প্রথম প্রেমের ঘোরের মতন কেটে যাওয়ার পর মনে হলো ফ্রিজে কী রাখা যায়? আমাদের তো বাড়তি কিছু নেই। গেল বছরের কুরবানি ঈদের মাংস ছিল এক ছোট্টো আইসক্রিমের বাক্সে পাশের বাসার ফ্রিজে। সৌদির চাচা আসার পর সেই বাক্স নিয়ে আসা হয়েছিল চাচার জন্য। আব্বা বাজার থেকে সবজি, ডিম কিংবা মাছ গুনে গুনে আনে যতটুকু তা ঐদিনই খাওয়া হয়ে যায়। বাকিও থাকে না। তবে? আব্বা বুদ্ধি করে দুইদিনের বাজার একসঙ্গে করা শুরু করল। পুরো সপ্তাহের বাজার করলে একবারে অনেক খরচ পড়ে যায়, হিসাব থাকে না। তাই অনেক কায়দা করে দুইদিনের বাজার একসঙ্গে করা শুরু করল আব্বা। তাতেও ফ্রিজের খালি খালি ভাব কমে না। অত বড়ো ফ্রিজ ঠনঠন করে। আমাদের মনও কেমন খালি খালি করে, ফ্রিজের শূন্য পেটের মতন।

আমাদের ফ্রিজের শূন্যভাব দূর হলো সুমির আম্মার কল্যাণে। সেদিন এলেন, ফ্রিজের গায়ে আলতো হাত বুলিয়ে দেখলেন, বললেন, উনাদের ফ্রিজটা নষ্ট হয়ে গেছে। বরফ জমে না। মাছ-মাংস নষ্ট হয়ে যা”েছ। সুমিদের পরিবার বড়ো, সুমির ভাই, আব্বা চাকরি করে। সুমির আম্মাও কোনো এনজিওতে পার্টটাইম কাজ করে সেলাই প্রশিক্ষক হিসেবে। তাই ফ্রিজে রাখবার মতন জিনিস উনাদের আছে, অন্তত আমাদের চেয়ে বেশি আছে।

আম্মা যেন ফ্রিজের শূন্যতা দূর করতে পেরে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল, বলে, ‘ভাবি আমাদের ফ্রিজে যা ই”ছা রাখেন। এটা কোনো বিষয়? আপনাদের ফ্রিজে আমরা খাওয়া রাখসি না?’

সুমির আম্মা খুশিমনে এসে আমাদের ফ্রিজের শূন্যতা খানিকটা পূর্ণ করল, গুনে গুনে মাছ-মাংস, শাকসবজির প্যাকেট রেখে গেল। আর জানিয়ে গেল, এই মাসে সেলাই মেশিন কিনেছে দেখে হাতটান, সামনের মাসের মধ্যে ফ্রিজ কিনে ফেলবে। ততদিন একটু আমাদের ফ্রিজটা কাজে লাগবে। আর আমার আম্মা একটা নোটবই রুল টেনে গোটা গোটা করে লিখে রাখল সুমির আম্মার পোঁটলা-বাক্সের হিসাব, তাদের রং।

আম্মার ডায়েরিতে এমন হিসাবের পাতা বাড়তেই থাকল। কারণ সুমির আম্মার সঙ্গে যোগ দিল আব্বাস চাচা, উপর তলার খালাম্মা, পাশের দালানের চাচি। সেই লিস্ট বাড়তেই থাকল। আমাদের ফ্রিজ ভরপুর। প্লাস্টিকের বাক্সে কেওড়াজলের সুঘ্রাণে মাখামাখি বাসি পোলাও, ইলিশ মাছের মাথা কিংবা দেশ থেকে আনা আমের মোরব্বা, যার বাড়িতে কিছু নেই সে মুরগির দুটো ডিম কিংবা এক বোতল পানি ঠান্ডা করবার জন্য হলেও রেখে যায়। যার যা কিছু বাড়তি সঞ্চয়, আমাদের ফ্রিজে জায়গা পায়। আমাদের আশেপাশের মানুষগুলো আমাদের থেকে তেমন আলাদা নয়। আমাদের মতনই চাওয়া-পাওয়ার জোড়াতালিতে কাঁথাসেলাই করে করে চলে। তবে সবার সংসারের ধরন, আয়-রোজগার তো একইরকম নয়। অনেকের বাড়তি জমে থাকে। আমাদের ফ্রিজের দরজা খুললেই প্রত্যেকটি বাড়ির ঘটতে থাকা চালচিত্রের ঝলক দেখতে পাওয়া যায়। কোন বাড়িতে আজ উৎসব, কোন বাড়ির মন খারাপ, কিংবা পেটের অসুখ আমাদের ফ্রিজের দরজা খুললে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে দেখলেই বোঝা যায়।

আমি আর ভাইয়া প্রায়ই ফ্রিজের দরজা খুলে এই খেলা খেলি। প্রত্যেক বাড়ির প্লাস্টিকের বাক্স থেকে আমরা অনুমান করি কার বাড়ির গল্প কেমন চলছে। কিন্তু কোনোদিন আমরা সে বাক্সের খাওয়া ছুঁয়ে দেখি না। ইচ্ছেও হয় না আমার। ভাইয়ার হয় কি? মনে হয় না, আমার মতনই নির্লিপ্ত হয়ে ও এই খেলা খেলে। আর আম্মা সেই সকাল থেকে বাড়ির দরজা খুলতে ব্যস্ত থাকে, কারো বাক্স হিসাব মিলিয়ে ফেরত দেয়, কারণ নতুন বাক্সের হিসাব লিখে ফ্রিজে ঢোকায়। সংসারে বাড়তি বলতে ঢুকেছে এই কাজ। সংসারের কাজের ফাঁকে বাড়তি এই কাজ মনোযোগ দিয়ে আমরা সবাই করছি। নতুন কিছু একদম।

তবু এই ফ্রিজে আমাদের তেমন কিছু নেই। ভাইয়া একবার পুরোনো পেপসির বোতলে পানি ভরে পানি ঠান্ডা করে খেল। ব্যাস টনসিলের ব্যথায় কাতর। এরপর সেটুকুও আর করা হলো না। ঐ যে আব্বা দুইদিনের বাজার করে আনে, ঐটুকুই এমন অট্টালিকার মতন ফ্রিজে অনাথ হয়ে এক কোনায় ঝুলে থাকে। আর পুরো ফ্রিজ ঝলমল করে পাড়া-প্রতিবেশীদের খাবারের কল্যাণে আর সুঘ্রাণে।

প্রথম মাস এমন করে যাওয়ার পর দেখি, আব্বা শুকনো মুখে ঘুরে বেড়া”েছ। ফ্রিজের কারণে বিদ্যুতের বিল এসেছে ৮০০ টাকা। আমরা তীব্র গরম ছাড়া পাখা ছাড়ি না। প্রয়োজনই পড়ে না। জানালা খোলা রেখে আমাদের দিব্যি চলে যায়। সন্ধ্যায় আমি আর ভাইয়া যখন পড়তে বসি, আব্বা-আম্মা সেই ঘর বাদে বাকি ঘরের আলো বন্ধ করে রাখে। প্রয়োজন ছাড়া সন্ধ্যের পর আমরা আলোও তেমন জ্বালাই না। আমাদের বিদ্যুতের বিল আমাদের চাহিদার মতনই সংযমী ছিল। তবে এই মাখন ফ্রিজে যদি আমাদের বাড়িতে এসে রাজাসন তৈরি করে, তবে খরচও তো প্রাসাদের মতনই হবে। আম্মা বলল, ‘কাউকে কিছু বোলো না। আমাদের ফ্রিজ আমাদেরই তো টাকা দিতে হবে।’ আম্মা এক গুঁড়োদুধের জং পরা পুরানো কৌটা থেকে ৫০০ টাকা বের করে দিল আব্বাকে। আম্মার যে জমানো টাকা আছে এইটাই আমি জানতাম না। সেই মাস কেটে গেল কোনোরকম, আমরা প্রতিদিনের কাজের ফাঁকে ফ্রিজের বাক্স-পোঁটলার হিসাব রাখতে ব্যস্ত।

পরের মাসে বিদ্যুৎ বিল যখন ১০০০ টাকা এলো, আম্মার মুখও কেমন শুকিয়ে গেল। কী হবে? আব্বা বলে, ‘আমাদের তো কিছু নাই ফ্রিজে, অন্যের জন্য আমি হাতি পুষব নাকি। যারা জিনিস রাখে, ওরা বিলের টাকা ভাগ করে দিবে।’ আম্মার বড়ো লজ্জা হলো। কিš‘ মানা করতে পারল না। আব্বা প্রথমে পাড়া-প্রতিবেশীদের বুঝিয়ে বলল, সবাই মিলে যদি ফ্রিজে জিনিস রাখা বাবদ ৫০০ টাকা তুলে দেয়, তো আব্বা বাকিটা ব্যবস্থা করে নেবে। কেউ রাজি হয় না। সুমির আম্মা একদিন এসে আম্মাকে শুনিয়ে গেল, ‘এতদিন তো আমাদের ফ্রিজে খাওয়া রাখলেন, আমরা এমন ছোটো কথা বলছি? একটা ফ্রিজ এনে দেমাগ দেখান? ছি।’ আম্মা সবার কাছে মাফ চেয়ে চেয়ে সেই ছি-এর ভার সামলাতে ব্যস্ত থাকে। চারপাশ থেকে ছি। আমাদের মতন এত ছোটোলোক প্রতিবেশী নাকি কেউ আগে কখনো দেখেনি।

বিল বাড়তে থাকে। আমাদের চাহিদা জোগানের ভারসাম্য কেমন এলোমেলো হয়ে যেতে থাকল। আমরা রাতে নিয়মিত মুড়ি-গুড় খাওয়া শুরু করি। আব্বা এবার রেগে গেল। প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিটিং করে রাগ দেখিয়ে বিলের টাকা চাইল। নইলে ফ্রিজ বন্ধ করে দেবে সেই হালকা হুমকিও দিল। আর বাড়ি ফিরল প্রতিবেশীদের হাতে বেদম মার খেয়ে। ‘এমন ছোটোলোক বদমাইশ লোক’, ‘ফকিরের হাতে ফ্রিজ আসলে যা হয়’, ‘তোর বা”চা আর বউ আর আমাদের বাসায় যদি টিভি দেখতে আসে পা ভেঙে দিব’ ইত্যাদি নানা তীক্ষè তীব্র টুকরো শব্দে ভরে যায় আমাদের চারপাশ। ওরা সবাই এক, আমরা আলাদা। এ কলোনি থেকে নেওয়া আমাদের এতদিনের অন্যায্য সকল সুবিধার একটা লম্বা লিস্ট করে সবাই মিলে। তার বিনিময়ে আমাদের ফ্রিজে খাওয়া রাখা সঠিক এবং ন্যায় বলে প্রতিবেশীরা সিদ্ধান্ত নেয়। আমি আর ভাইয়া আর পাশের বাসায় টিভি দেখতে যাই না। ওরা ঠিক আসে আমাদের ফ্রিজ ভরে দিয়ে যায়। আর প্রতিমাসে হিসাবের অমিলে আম্মা-আব্বা হাঁসফাঁস করে। এমন করেই চলছিল।

আর এমন কোনো এক দিনে খবর আসে আবার দাদাজান খুব অসুস্থ, যায় যায় প্রায়। আমার ছোটো চাচা দাদাজানের সঙ্গে বাগেরহাট থাকে। চাচা ঢাকায় তার কোনো এক পরিচিত লোক মারফত আমাদের খবর পাঠায়। সেই লোক আব্বাকে অফিসে খুঁজে না পেয়ে যখন বাসায় আসে, তখন প্রায় রাত ১১টা। আমরা ব্যাগট্যাগ গুছিয়ে ভোররাতে রওনা দেই বাগেরহাটের উদ্দেশ্যে।

আম্মা এক ফাঁকে বলে, ‘ফ্রিজ ভরতি যে পাড়া-প্রতিবেশীর এত খাওয়াদাওয়া, কী হবে?’

‘আমার আব্বা মরে যা”েছ, এখন লোকজনের খাওয়া বিলাব, এই মাঝরাতে কেউ জেগে আছে?’ আব্বা ঝাঁজিয়ে ওঠে।

কথা সত্যি, এই মাঝরাতে তো আর লোকের বাড়ি যেয়ে তাদের পোঁটলা-বাক্স পৌঁছে দেওয়া সম্ভব না। আমরা তাই ভরা ফ্রিজকে অমন করে রেখেই বাগেরহাট রওনা দেই। আমার দাদাজান মারা যান। ১০ দিন শোকে কাটিয়ে আমরা ফিরে আসি ঢাকায়, আমাদের বাড়িতে। কষ্টের ঠিক পর নাকি কষ্টই আসে আবার? যতক্ষণ না সুখ না আসে? তাই হলো। বাড়ি ফিরে দেখি, আমাদের মূল দরজার তালা ভাঙা। ফ্রিজের ভেতর ফাঁকা। একসঙ্গে হয়ে তালা ভেঙে লোকজন ফ্রিজ থেকে তাদের নিজ নিজ জিনিস নিয়ে চলে গেছে। দরজার তালা অমন খুলেই গেছে। তারা ক্ষিপ্ত, ‘ফাজলামি নাকি, আমাদের জিনিস ফ্রিজে রেখে তারা ঘুরতে চলে যাবে?’

সদ্য বাপ হারানো আমার দুঃখী আব্বার ভেতরটা ফ্রিজের মতনই ফাঁকা, হাহাকার করে। আমাদেরও। আমি ঠান্ডা মাথায় এক কঠিন বুদ্ধি দেই আব্বাকে, ‘আব্বা ফ্রিজ বন্ধ করে দাও। কেউ জিগ্যেস করলে বলব ফ্রিজ নষ্ট।’ আব্বা আমার কথা শোনে। ফ্রিজের সুইচ বন্ধ করে, তার খুলে ফেলে। ধুর প্রয়োজন নাই আর ফ্রিজের। দেখি কে কী করে?

কিছুদিন বাদে ভালো দিনও আসে। আমার দাদার যে ছোট্টো একটা মাছের ঘের ছিল, তা তিনি দুই ছেলেকে কাগজে-কলমে দিয়ে গেছেন। আমার আব্বা রাজধানীর ঝিকমিকে জীবনের একজন হয়েই বাস করতে চেয়েছিল সারা জীবন, হোক সে গলির জীবন তবু শহুরে তো। আর ঐ দেশবাড়ির মাছের আধামৃত ঘের কোনো লাভজনক কাজ নয়। আব্বাকে তাই বাগেরহাট টানেনি কখনো। কিš‘ এখন, গত কিছুদিনের ঘটে যাওয়া সকল ঘটনার কারণেই হোক কিংবা আব্বার শরীরে জমতে থাকা বয়সের ভাঁজের কারণেই হোক, আব্বা বাগেরহাট চলে যেতে চাইল।

‘আমরা দুই ভাই মিলে মাছের ঘেরে মন দিলে, এখন যা কামাই তার থেকে বেশি কিছু আয় করতে পারব। আর ভিটা বাড়ি তো আছেই’, আব্বা বলল। তাই ঠিক হলো। আমরা বাগেরহাট চলে যাব। ওখানের স্কুলে ভর্তি হব। আব্বা মাছের ঘেরে মন দেবে। চাকরি আর শরীরে পোষায় না, বেতন পায় না ঠিক মতন। ঢাকার বাতাসে ময়লা। ওখানে নিজেদের থাকার জায়গা আছে। এমন নানা কারণের হিসাবনিকাশ করে ঠিক হলো, আমরা চলে যাব।

আর সেই কথা শুনেই ভাইয়া দেখি কাঁদছে। টুসটুসে লিচুর রসের মতন চোখের ফোঁটায় তার মুখ ভিজে যা”েছ। সে ভাবে, বাগেরহাট গেলে ফ্রিজ কি রেখে যাবে আব্বা? আমাদের প্রথম পাওয়া এত্তো বড়ো উপহার।

আর আমি তাই বলি, ‘হায় আল্লাহ, তুমি এত বোকা ক্যান ভাইয়া, আমাদের জিনিস তো আমাদেরই থাকবে। এই জন্য কেউ কাঁদে?’ ভাইয়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলি, ‘আমরা ফ্রিজ তো বাগেরহাট নিয়েই যাব।’

তাই হয়, আব্বা বলে, ‘বাজারে কারেন্ট আছে, মাছের আড়তের জন্য ফ্রিজটা কাজে লাগবে।’

এক সকালে ভ্যানে করে আমরা আর আমাদের মাখুনে আদুরে ফ্রিজ চাপিয়ে রওনা দেই। নজরে আলী কলোনির মানুষজন চারপাশে ভিড় করে। তাদের চোখে কেমন বিস্ময়, ঈর্ষা, খানিকটা লজ্জাও কি? তারা কি আমাদের দেখছে নাকি ফ্রিজটাকে?

আমি জানি আমার মুখ এখন কেমন কঠিন হয়ে আছে। ভাইয়ার মতন জলে ভরা নয়। আমার চোখ মেখে আছে টলটলে আনন্দ। আমাদের ভ্যান নজরে আলী কলোনি থেকে বের হচ্ছে। ভ্যানের ঝাঁকুনিতে আমার ঝুলিয়ে রাখা দুই পা দুলছে। আমি শেষ বারের মতন আনন্দে ঝলমলে চোখে, পাঁচমিশালি অনুভ‚তির সেই মানুষগুলোর দিকে তাকাই। আমার সেই আনন্দ সবাই দেখতে পা”েছ, আমি নিশ্চিত।