বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬
নারী

সাইবার বুলিংয়ের প্রভাব কাদের ওপর সবচেয়ে বেশি

WhatsApp Image 2025-09-18 at 13.20.24_3b850b56

বর্তমান যুগ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তির বিপ্লব আমাদের জীবনযাত্রাকে করেছে আরও সহজ ও উন্নত। কিন্তু তার পাশাপাশি কিছু সংকটও তৈরি করেছে। বিশেষ করে এই সংকটের মধ্যে রয়েছে সাইবার বুলিং। যা বর্তমানে বেড়েই চলছে। বিশেষ করে নারীরা এই সাইবার বুলিং এর শিকার হচ্ছে। আবার শিশু ও কিশোররাও বুলিং এর শিকার হচ্ছে। যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে ভয়ানকভাবে প্রভাবিত করছে।

দিন দিন বেড়েই চলেছে সাইবার বুলিং

আমাদের প্রতিদিনের সময়ের একটা বড় অংশ কাটে ইন্টারনেটে। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে ইন্টারনেটের পরিসরও এখন অনেক বড়। বিনোদন থেকে শুরু করে পড়াশোনার জন্য শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেট ব্যবহার করে। প্রায় অধিকাংশ মানুষই তাঁদের কোনো না কোনো প্রয়োজনে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। ইন্টারনেট ব্যবহার করে যেমন আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় কাজ করছি অন্যদিকে বিভিন্নভাবে হেনস্তার শিকার হচ্ছি। আর দিন দিন এসব ঘটনা বেড়েই চলছে। যেমন- কৌতুক করার নামে ট্রল, আক্রমণাত্মক মিম, বডিশেমিং, মিথ্যাচার, অনলাইনের দুনিয়ায় দল বেঁধে চেহারা ও অন্যান্য শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে কটু কথা বলাসহ বিভিন্ন ভাবে হেনস্তার শিকার হচ্ছে মানুষ। আর এর প্রভাব পড়ছে মানসিক স্বাস্থ্যর উপর।

‘বাংলাদেশ সাইবার ক্রাইম ট্রেন্ড ২০২৩’–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের রিপোর্টে বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধের মধ্যে ৫২ শতাংশই ছিল সাইবার বুলিং। আর স্কুল–কলেজের শিক্ষার্থীরা বিশেষ করে এর শিকার হচ্ছে। বর্তমানে সাইবার বুলিং এমন ব্যাপক আকার ধারণ করার পিছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক আর মনস্তাত্ত্বিক কারণ। যেমন ধর্মের অপব্যাখ্যা, অতিরিক্ত রক্ষণশীলতা, সংবেদনশীলতা ও শিক্ষার অভাব ইত্যাদি। এ ধরনের হয়রানির ফলে মানসিক বিপর্যয় ঘটছে। ভুক্তভোগীরা হতাশা, মানসিক চাপ, হীনম্মন্যতা, আত্মবিশ্বাসহীনতা ও একাকিত্বসহ বিভিন্ন মানসিক রোগে ভুগছেন। নিজের ওপর আত্মবিশ্বাসও দিন দিন কমে যাচ্ছে।

মানসিক অবসাদ, উদ্বেগ, আত্মসম্মানের অভাব ও একাকিত্বের মতো সমস্যা তাঁদের ওপর স্থায়ী প্রভাব ফেলছে। যা বাহির থেকে বুঝা যায় না। একজন কিশোর বা কিশোরীর জন্য এ ধরনের মানসিক চাপ অত্যন্ত ক্ষতিকর। কেননা একজন কিশোর- কিশোরীরা এই বয়সে এ ধরনের মানসিক চাপ মোকাবেলা করতে পারে না। ফলে তাঁদের স্বাভাবিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এগুলো কখনো কখনো তাদের মধ্যে প্রতিহিংসার মনোভাব তৈরি করে। এমনকি কেউ কেউ সাইবার বুলিংয়ের কারণে আত্মহননের পথও বেছে নেন।

প্রতিরোধে করণীয় কি?

সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে ইতোমধ্যে দেশের সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে কাজ করছে। এ বিষয়ে কিছু আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে শুধু এ পদক্ষেপ গ্রহণই যথেষ্ট নয়। পদক্ষেপ বাস্তবায়নেও কাজ করতে হবে। তবে বড় একটি অংশ এখনো এই সমস্যার প্রকৃত গভীরতা বুঝতে পারেনি। এই সংকট প্রতিরোধে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রয়োজন পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে পরিবার ও সমাজকে সচেতন হতে হবে। ছোট থেকেই শিশুদের ইন্টারনেটের নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। ডিজিটাল শিক্ষার পাশাপাশি শিশুদের সহমর্মিতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার শেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হবে। দেশের বেশ কিছু স্কুলে ইতিমধ্যে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়েছে। যেমন শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে সোশ্যাল ইমোশনাল লার্নিং (এসইএল) ক্লাস চালু করেছে রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিশু ও তরুণ শিক্ষার্থীদের মানবিক ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এমন পাঠ্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাইবার বুলিং প্রতিরোধে ডিজিটাল সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। যেমন– অনলাইনে কী শেয়ার করা উচিত আর কী নয়, সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ার প্রাইভেসি সেটিংস ব্যবহার করা উচিত, ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারে সচেতন হতে হবে। ট্রল বা অপমানজনক মন্তব্যে যতটা সম্ভব রেসপন্স না করা। সন্তান সাইবার বুলিংয়ের শিকার হলে তাকে দোষারোপ না করে পাশে থাকা উচিত প্রতিটা অভিভাবকের। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে অ্যান্টি-বুলিং নীতি প্রণয়ন করা উচিত। কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রাখা যাতে ভুক্তভোগীরা মানসিক সহায়তা পায়।