সুখের ঠিকানা

বারবার ফোনের শব্দে নাদিয়ার বিরক্তি যেন এবার সীমা ছাড়িয়ে গেল! ফোনটা
সাইলেন্ট করে ডেস্ক থেকে উঠে হাতে কফি নিয়ে করিডোরের জানলার সামনে
দাঁড়াল সে! সামনে রাস্তার অগণিত চলন্ত গাড়ির দিকে তাকিয়ে নাদিয়ার মনে
হলো সবকিছু যদি কিছু মুহূর্তের জন্য একদম থেমে যেত, সবকিছু মানে
সবকিছু! এই ব্যস্ত দৈনন্দিন জীবন, আশেপাশে বসে থাকা মানুষগুলোর অবান্তর
বাক্যালাপ, জীবনের ওপর এই নতুন প্রযুক্তির নিরন্তর টহলদারি, সবকিছু থেকে যেন
মুহূর্তের জন্য হলেও মুক্তি চায় নাদিয়া!
হঠাৎ মনি আপা তার পিঠে হাত রেখে বলল, ‘কী রে নাদিয়া! এখানে একা একা
দাঁড়িয়ে আছিস যে? মন খারাপ?’
একদম কথা বলতে ই”ছা করছে না নাদিয়ার আর বিশেষ করে মনি আপার সঙ্গে তো
নয়ই, অন্যের জীবনের ওপর সবসময় মনি আপার এই অদম্য কৌত‚হলের কোনো কারণ
এতদিনেও খুঁজে পায়নি নাদিয়া। যথাসম্ভব ভদ্রতার হাসি মেখে সে জবাব দিল,
‘কই না তো। এই একটু ক্লান্ত বলতে পার।’
এবার মনি আপা মুখে সবজান্তার হাসি মেখে বলল, ‘আমি সব শুনেছি রে
নাদিয়া। এবার তোদের টিমে নীলিমা আর বদরুল ছাড়া আর কারোর প্রমোশন
হয়নি, তুই ওদের চেয়ে অনেক বেশি যোগ্য কিš‘ তোর নিশ্চই জানতে বাকি নেই
নীলিমার সঙ্গে এমডির মাখামাখির কথা আর বদরুলের কথা যদি বলিস, ও তো
শুনেছি এমডি স্যারের রোজের ফাইফরমাশ খেটে দেয়! তাহলে কেন তুই এই নিয়ে
বেকার এত মন খারাপ করছিস?’
এবার চেষ্টা করেও নাদিয়া আর হাসতে পারল না, মনি আপার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘আমি তো তোমাকে আগেই বললাম আমার মন খারাপ নয়। নীলিমার সাথে আমার
খুবই অল্প কথা হয়, কাউকে না জেনে তার চরিত্র নিয়ে কোনো মন্তব্য করা অন্যায়
হবে আর বদরুলের সাথে আমি অনেকদিন কাজ করছি, শুধু কলিগ বললে ভুল হবে, ও
আমার খুব ভালো বন্ধু, তাই ওর প্রমোশন পাওয়ার যোগ্যতা নিয়ে অন্য কারো প্রশ্ন
থাকতে পারে কিš‘ আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।’
মনি আপা আবার কিছু বলতে যাওয়ায় নাদিয়া একটু হেসে বলল, ‘এখন আমাকে
ডেস্কে ফিরতে হবে মনিপা, একটা মিটিং আছে একটু পরে, আবার পরে কথা
বলছি তোমার সাথে।’
অফিস বাসের জানলা দিয়ে বাইরে দেখতে দেখতে নাদিয়া আবার ভাবনায় তলিয়ে
গেল। রোজকারের একঘেয়েমি নিয়মের ঘেরাটোপে নিজেকে কোথায় যেন হারিয়ে
ফেলছে, তার নিজের মতো বাঁচতে চাওয়া মন যে কী পেলে খুশি হবে, এত চেষ্টা
করেও তার উত্তর কিছুতেই সে খুঁজে পায় না। ভালো রেজাল্টের পর ভালো চাকরি, স”ছল
আর্থিক অব¯’া, অল্প সময়ে পাওয়া এত সাফল্যে নাদিয়া তার বয়সি অনেকের থেকে
অনেক বেশি এগিয়ে গেছে। তবু তার মনের সেই অজানা অদৃশ্য আকাক্সক্ষা কোনো
কিছুতেই মিটছে না। কোথাও তার অতৃপ্তি রয়ে গেছে? মনি আপার কথা
অনুযায়ী এবারে প্রমোশন না-পাওয়াই যদি তার মন খারাপের কারণ হয় তাহলে এর
আগে যখন প্রমোশন পেয়েছে সে, সেই খুশির হাসিতে আশেপাশের সকলে তার
উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে আশ্বাস দিলেও একটিবারও কেন সে সাড়া পায়নি তার ভিতরের
মনটা থেকে। একমাত্র বাবাই তার এই নিরন্তর অস্বস্তি বুঝতে পেরে বলে, ‘মনের
খিদে মেটানো কি আর অত সহজ রে মা? বেশির ভাগ মানুষই তো সেই খিদের
সাথে আপস করে কাটিয়ে দেয় সারাটা জীবন। কিš‘ তুই চেষ্টা ছাড়িস না। শেষ
মুহূর্ত পর্যন্ত খুঁজে বেড়াতে থাক কীসে তার মুক্তি, কোথায় তোর চিরন্তন
আনন্দ, হাতে সময় যে খুব কম।’
শনিবারের সকালে নাদিয়ার ঘুম ভাঙল ফোনে অনীকের গলার আওয়াজে, ‘উঠুন
ম্যাডাম, সূর্যদেবের ওপর কৃপা করুন এবার।’
নাদিয়া চোখ না খুলেই হেসে বলল, ‘তুই বাড়িতে এসেছিস বুঝি?’
‘তা নয় তো কী? তোর মতো তো বাড়িতে থেকে আরামের ১০টা-৫টা অফিস না
আমার, সপ্তাহের বাকি দিনগুলোয় কোনো রকমে মেসের খাবার গলা দিয়ে নামালেও
শুক্র-শনিতে আর পারলাম না, তাই ভোর ভোর চলে এসেছি বাড়ি, মা-র হাতের রান্না
খেতে। ছাপোষা, অতিসাধারণ, ঘরকুনো বাঙালি আমি বুঝলি।’
নাদিয়া এবার চোখ বুজে আবার পাশ ফিরে শুয়ে বলল, ‘সবই তো বুঝলাম, শুধু
অতিসাধারণ বিশেষণটা পিএইচডি করা ছেলেকে মানায় না।’
অনীক জোরে হেসে উঠল, ‘তাই বুঝি? তোর কি তবে আশেপাশের ডিগ্রিধারী
সব মানুষকেই খুব অসাধারণ বলে মনে হয়? যত বেশি তাগড়াই ডিগ্রি


