বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬
স্বাস্থ্য

ফ্যাকটিসিয়াস ডিজঅর্ডার মানেই অসুস্থতার অভিনয়

IMG_6925

আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আমরা সবাই যেন কিছু না কিছুভাবে নজর কাড়ার প্রতিযোগিতায় বন্দি। বাস্তব জীবনের কথা অজুহাত করে, সেখানে নানা মায়াজাল ও ছদ্মবেশের পেছনে এক অনবরত দৌড় চলছে। এই দৌড়ের মাঝে চোখ বুলালে বোঝা যায়, মানুষ দুটি রকম মৃত্যুর মুখোমুখি হয় একটি শারীরিক, আরেকটি মানসিক। শারীরিক মৃত্যু যেমন অল্পবয়সী বা প্রবীণ সবার সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে, তেমনি মানসিক মৃত্যু কিন্তু আমাদের মাঝে অনেক সময় অজান্তে ক্রমশ ঘটতে থাকে।

কখনো ভেবেছেন, মানুষ কীভাবে ও কখন মানসিকভাবে মরে যায়? এর গূঢ় ব্যাখ্যা অনেক, তবে প্রধান কারণ একটাই যখন একজন মানুষ নিজের কাছে আর জবাবদিহি করতে পারে না, নিজের সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করে, তখন ধীরে ধীরে তার মানসিক শক্তি স্তিমিত হতে থাকে। এ এক ভয়ানক পরিণতি, যেখানে ব্যক্তি নিজের শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। শরীর হয়তো বেঁচে থাকে, কিন্তু মানসিকভাবে সে এক অর্থে মৃতপ্রায়।

এই নিজস্ব শত্রুত্বের জালে অনেকেই আটকে পড়ে, আর কেউ কেউ আবার হন্যে হয়ে অন্যের নজর কাড়ার জন্য বেদনা ও দুর্দশার নাটক সাজাতে শুরু করেন। নজর কাড়ার এই তাড়না কখনো কখনো মানুষের জীবন নিয়ে ভয়াবহ দিকেও ঠেলে দিতে পারে। যেখানে ব্যক্তি নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে খেলায় লিপ্ত হয় এই মনের জটিলতায় জন্ম নেয় এক ভয়ঙ্কর মানসিক রোগ, যার নাম ফ্যাকটিসিয়াস ডিজঅর্ডার। 

ফ্যাকটিসিয়াস ডিজঅর্ডার আসলে কী? 

নিজেকে নিয়ে ভয়াবহ ফাঁদ পাতা এই রোগীরা যেই রোগে আক্রান্ত, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় সেটি ফ্যাকটিসিয়াস ডিজঅর্ডার। ‘ফ্যাকটিসিয়াস’ শব্দটি লাতিন; যার অর্থ, ‘মানুষের তৈরি’। তার মানে বুঝতেই পারছেন, রোগটি রোগী নিজেই নিজ শরীরে তৈরি করেন নিজের একান্ত ইচ্ছাতেই!

এটি এমন এক মানসিক রোগ, ফলে একজন ব্যক্তি বারবার অসুস্থ হয়ে চিকিৎসা নিতে চান। শুধু তা-ই নয়, এরা রোগের ভয়াবহতা বোঝানোর জন্য ইউরিন পরীক্ষায় অন্যের ইউরিনকে নিজের বলে চালিয়ে দেন! শরীরে ফোড়া বা ক্ষত তৈরি করতে নানা উপায় অবলম্বন করেন। এমনকি মলদ্বারে ইনজেকশন দিয়েও নানা রোগের লক্ষণ তৈরি করতে পারেন

Advertisements

হাসপাতালের জন্য মায়া

ফ্যাকটিসিয়াস ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত অনেকেই অসুস্থতার ভান করে হাসপাতালে যাওয়ার জন্য অজানা কোনো কাণ্ড ঘটাতে দ্বিধা করেন না। এ কারণে এই রোগকে “মুঞ্চহাউসেন সিনড্রোম” বা হাসপাতাল আসক্তি হিসেবেও চেনা যায়। রোগীরা চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিল টার্ম ও বিভিন্ন রোগের লক্ষণ সম্পর্কে বিস্ময়করভাবে ভালো জ্ঞান রাখেন। এর ফলে তারা যে কোনো রোগে আক্রান্ত হওয়ার অভিনয় খুব দক্ষতার সঙ্গে করতে পারে, এমনকি চিকিৎসকদের বিভ্রান্ত করতেও সক্ষম। অস্বাস্থ্যকে নিয়ে পরিবার-পরিজনের সামনে কথা বলার পরিবর্তে তারা প্রায়ই নিজে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পছন্দ করেন, যাতে তাদের অসুস্থতার গোপনীয়তা বজায় থাকে। শুধু তাই নয়, ছোটখাটো অসুখকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বড় করে তোলার মাধ্যমে নিজের অসুস্থতার নকশা যেন ক্রমশ গভীরতর হয়। এই রোগের প্রকোপ যখন অতিরিক্ত মাত্রায় পৌঁছায়, তখন রোগীরা নিজেদের ওপর অতিরিক্ত চিকিৎসা বা পরীক্ষার ঝুঁকি নিতে বাধ্য হন, যা কখনো কখনো গুরুতর ক্ষতি বা অকালমৃত্যুর কারণও হয়ে দাঁড়ায়।

ফ্যাকটিসিয়াস ডিজঅর্ডারের সঠিক কারণ এখনও মনোবিজ্ঞানের বিশ্বে সম্পূর্ণরূপে বুঝে ওঠা যায়নি। তবে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবেই কোনো শারীরিক বা মানসিক আঘাত, অবহেলা কিংবা অস্বাভাবিক পরিবেশ এই রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ ছাড়াও মানসিক জগতের নানা জটিল কারণ ফ্যাকটিসিয়াস ডিজঅর্ডারের পেছনে কাজ করতে পারে, যেমন—

চিকিৎসা পদ্ধতি ও চিকিৎসার প্রতি এক ধরনের উত্তেজনা বা রোমাঞ্চ অনুভব করা এবং অন্যদের মনোযোগ আকর্ষণের বাসনা থাকা।

চিকিৎসা পেশায় নিযুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রতারণা করা যেন একটি ‘সাফল্য’ মনে হওয়া।

পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে নিজেকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করা।

শৈশবে যথাযথ যত্নের অভাব থাকা ও সেই অভাব পূরণের আকাঙ্ক্ষা থাকা।

অতীতের কোনো ভুল বা অপরাধের জন্য নিজেকে শাস্তি দেওয়ার মানসিকতা।

শৈশবকালে মানসিক বা শারীরিক নির্যাতনের অভিজ্ঞতা থাকা।

অস্থির ও অস্বাভাবিক শৈশবজীবন।

আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং নিজেকে সামাজিক বৈষম্যের শিকার মনে করা।

প্যারেন্টিংয়ের ত্রুটি এবং সামাজিক বিকাশে বাধা।

কেউ কেউ স্বভাবগতভাবেই এই ধরনের আচরণ প্রদর্শন করতে পারেন।

এছাড়াও পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার, ইমপালস কনট্রোল ডিজঅর্ডার, ওসিডি, ডিমেনশিয়া, মাদকাসক্তি ইত্যাদি সমস্যার সঙ্গে জড়িত কিছু ক্ষেত্রে এমন আচরণ দেখা দিতে পারে।

ফ্যাকটিসিয়াস ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই নিজেকে আলাদা ও বিশেষভাবে অসুস্থ হিসাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন। এর ফলে তারা নানা জটিলতা ও সংকট তৈরি করেন, যা অনেক সময় চিকিৎসকদেরও বিভ্রান্ত করে। তবে এ রোগের মূল বৈশিষ্ট্য হলো—এই রোগীরা অসুস্থতার ভূমিকায় থেকে যেতে একটি নিয়ন্ত্রণহীন তাড়না অনুভব করেন, যা এক ধরনের আচরণগত আসক্তির মতো।

ফ্যাকটিসিয়াস ডিজঅর্ডারের সমাধান: 

ফ্যাকটিসিয়াস ডিজঅর্ডার কখনই সহজ বা ইতিবাচক কোনো বিষয় নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি গুরুতর বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই এই রোগের চিকিৎসার প্রথম ধাপ হলো সঠিকভাবে রোগীকে শনাক্ত করা, অর্থাৎ আসলেই সে ফ্যাকটিসিয়াস ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত কিনা তা নির্ণয় করা। এই কাজে বিশেষ দক্ষতা সম্পন্ন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের—যেমন সাইকিয়াট্রিস্ট, সাইকোলজিস্ট বা ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কারদের সাহায্য নেওয়া অত্যাবশ্যক। তারা রোগীর আচরণগত মূল্যায়ন করেন, অতীত অভিজ্ঞতা ও পারিবারিক চিকিৎসা ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করেন এবং সম্ভাব্য লক্ষণগুলো বিশ্লেষণ করে রোগ নির্ণয় করেন। রোগ নির্ণয়ের পর যথাযথ চিকিৎসার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ফ্যাকটিসিয়াস ডিজঅর্ডার থেকে মুক্তির জন্য বিভিন্ন পথ অবলম্বন করা হয়, যার মধ্যে অন্যতম হলো কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপি। বিশেষ করে ফ্যামিলি থেরাপি এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফ্যামিলি থেরাপির মাধ্যমে রোগী ও তার পরিবারের মনোভাব গভীরভাবে বোঝা যায় এবং পরিবারকে অনুরোধ করা হয় যেন তারা রোগীর নেতিবাচক আচরণকে প্রশ্রয় না দেয় বা পুরস্কৃত না করে। কারণ, পরিবার যদি সহযোগিতা না করে, তাহলে শুধুমাত্র রোগীর চিকিৎসায় সঠিক ফল পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। সুতরাং, ফ্যাকটিসিয়াস ডিজঅর্ডারের সফল চিকিৎসা শুধুমাত্র রোগী নয়, তার পরিবার এবং আশেপাশের মানুষের সচেতনতা ও সহযোগিতার ওপরও নির্ভরশীল।

এ রোগের চিকিৎসায় আরেক কার্যকর পদ্ধতি হলো সাইকোথেরাপি। এই সেশনগুলোতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা রোগীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন এবং তা বজায় রাখার ওপর ফোকাস করেন। এ ধরনের সম্পর্ক ফ্যাকটিসিয়াস ডিজঅর্ডারের লক্ষণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হতে পারে। মনিটরিং এমন একটি ফর্ম, যা ফ্যাকটিসিয়াস ডিজঅর্ডার রোগীর নিজের ভালোর জন্যও নির্দেশিত হতে পারে, যোগ করেন তিনি।ফ্যাকটিসিয়াস ডিজঅর্ডার এমন এক জটিল মানসিক রোগ, যা শুধু আক্রান্ত ব্যক্তির জন্যই নয়, তার পরিবার ও আশেপাশের মানুষের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। তাই রোগের সঠিক চিন্তাভাবনা, সময়মতো শনাক্তকরণ এবং একাত্ম সহযোগিতাই এই রোগ থেকে মুক্তির একমাত্র পথ। সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সমাজে এ রোগের ভুল ধারণা দূর করা জরুরি, যাতে আক্রান্তরা লজ্জাবোধ না করে চিকিৎসা গ্রহণের জন্য আগ্রহী হয়। পরিবার ও চিকিৎসক একসাথে কাজ করলে ফ্যাকটিসিয়াস ডিজঅর্ডারকে পরাস্ত করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে, শারীরিক নয়, মনোযোগ ও ভালোবাসাই এই রোগের সঠিক চিকিৎসা এবং আরোগ্যের মূল চাবিকাঠি। তাই আসুন, সচেতন হই, বোঝাপড়া বাড়াই এবং পাশে দাঁড়াই তাদের, যাঁরা এই কঠিন যুদ্ধে লড়াই করছেন।

Advertisements