বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬
সাহিত্য-সংস্কৃতি

বিহ্বল

বিহ্বল

শুভ পরেছে এক মহা বিপদে গত মাসেই বাড়িঅলাকে সে বাড়ি ছাড়ার কথা বলে দিয়েছে, ইতিমধ্যে নতুন বাসাও ঠিক করে নিয়েছে। কিন্তু গত দুই-তিন দিন আগে সেই নতুন বাসার মালিক শুভকে জানিয়েছেন আগের ভাড়াটিয়া খুব করে অনুরোধ করেছে সে বাসা ছাড়বে না তাই বাসা ভাড়া হবে না। অন্য আরেকটা নতুন বাসা খুঁজে উঠি উঠি করেও ছুটির অভাবে সেটা শুভর করা হয়ে ওঠেনি। কালকে ঈদ আর আজকে সে ছুটি পেয়েছে, গতকাল অফিস থেকে বের হয়ে শুভ খেয়াল করে শহরের মানুষ কমে গেলেও জ্যাম তো কমেইনি, তার ওপর ঈদের শেষ শপিংয়ের জন্য মনে হচ্ছে সমস্ত মানুষ একসঙ্গে রাস্তায় নেমেছে। দুনিয়ার সব গ্যাঞ্জাম ঠেলে বাসায় ফেরার পর এমন অবস্থা হয়েছিল যে কোনোভাবেই তার মন চাইছিল না বের হয়ে বাসা খুঁজতে। তারই শাস্তিস্বরূপ ভোরবেলা নতুন ভাড়াটিয়ার ধুপধুপ ধাক্কাধাক্কিতে ভয়ানক খিঁচরে যাওয়া মেজাজ নিয়ে সে ঘুম থেকে উঠে বেকুব হয়ে গিয়েছে।

বাসার মালিক শালা অন্য আরেকজনকে ইতিমধ্যে ভাড়াও দিয়ে ফেলেছে সেটা সে জানেও না। ভেবেছিল ঈদের দিনটা পার করে সে নতুন বাসায় উঠবে। ওদিকে এই বাসায় নতুন যিনি উঠবেন তিনি পরেছেন আরেক বিপদে, তাঁর নাকি বাসের টিকিট কাটা। ঘণ্টাখানেক পর শুভ বের হলেই তিনি তাঁর জিনিসপত্র রেখে বাসস্ট্যান্ডে চলে যাবেন। শুভ কোনোরকম বুঝিয়ে শুনিয়ে নিজের জিনিসপত্রের পাশাপাশি তাঁর সব জিনিসপত্র বাসার ভেতরে ঢুকিয়ে রেখেছে। আর এই উপকার পাওয়ার জন্য শুভকে আবার হাত লাগাতে হয়েছে তাঁর ফ্রিজ এবং শ্বশুরবাড়ি থেকে পাওয়া সেগুনকাঠের দশাশই আলমারিখানার জন্য। কোনো রকম কাঁইকুঁই করে চার তলায় জিনিসপত্র তোলা হলে হাঁপাতে হাঁপাতে শুভ যখন তালা লাগাতে যাবে, ভদ্রলোক আর সেটা দেবেন না, কেনই বা দেবেন? এই বাসা এখন তাঁর, তিনি কেন নিজের বাসায় আরেকজনকে তালা লাগাতে দেবেন?

শুভ নানানভাবে অনুরোধ করেও নতুন তালা থেকে নিজের জন্য যখন কোনো চাবি পাওয়া যাবে না বুঝতে পারল তখন নিজের বেশকিছু জামাকাপড়সহ কিছু জিনিস আর জরুরি কাগজপত্র সার্টিফিকেট একটা ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়ে নিল দুই-তিনটা দিন কোনো না কোনো বন্ধুর বাসায় কাটিয়ে দেবে এই আশায়। কিš‘ সে আশায় গুড়ে বালি পড়ল যখন গ্যারেজ থেকে বাইক বের করে একে একে দুই-তিনজন বন্ধুকে কল দিল। একজন জানাল সে গ্রামে চলে গিয়েছে। আর একজন জানাল তার বাসায় আব্বা-আম্মা গ্রাম থেকে এসেছেন ঈদ করতে। শেষের জনের এক্সকিউজটা শুনে শুভর মাথায় রক্ত উঠে যায়। ওর গার্লফ্রেন্ড নিজের হোস্টেল ছেড়ে এসে উঠেছে ওর বাসায় সে নাকি অন্য কাউকে বাসায় এলাও করছে না এমনকি কাজের বুয়াকেও না। তার নাকি মেঝেতে চুল পড়ে থাকা দেখলে মাথা গরম হয়ে যায়; কদিন আগে এক ছোটোভাই এক ঘণ্টার জন্য এসেছিল বাসায়, সে বের হয়ে চলে যেতেই ডাইনিংয়ের বেসিনে চুল পড়ে থাকতে দেখে মহা খেপা ওর গার্লফ্রেন্ডÑএরপর থেকে আর কাউকে বাসায় নো এন্ট্রি। এসব কিছু মিলিয়েই শুভ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যেভাবেই হোক আজই একটা বাসা খুঁজে নিয়ে সে উঠবে আর সেই থেকে সারা দিন ধরে বাসা খুঁজে বেড়া”েছ। বের হয়েছে সকাল সাতটায় এখন বাজে দুপুর তিনটা। দুপুরে খাবার পর্যন্ত খায়নি, সে কারণেই বোধয় মেজাজটা আরো এক কাঠি উপরে চড়ে আছে।

অনেক ঘোরাঘুরি করে বেশ অনেকগুলো বাসা দেখল শুভ। কিš‘ বেশির ভাগই ব্যাচেলর ভাড়া দেবে না আর বাকিগুলো আগামী মাস অথবা তার পরের মাসে ভাড়া হবে। ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে রাস্তার পাশের টং দোকানে দাঁড়িয়ে সিগারেট জ্বালিয়ে দোকানদারকে একটা চা দিতে বলে শুভ। সিগারেটে একটা টান দিয়ে আশেপাশে ভালো করে লক্ষ করে দোকানদারকে জিগ্যেস করে, মামা, আশেপাশে বাসা ভাড়া হবে? বলতে পারবেন?

দোকানদার চা বানাতে বানাতে বাড়িঅলার মতো একটা ভাব নিয়ে জিগ্যেস করে, ব্যাচেলর নাকি পরিবার আছে?

শুভ এক মুহূর্ত না ভেবে ঝট করে বলল, পরিবার আছে।

দোকানদার শুভর দিকে চা এগিয়ে দিয়ে বলল, তাইলে হবে নাÑব্যাচেলর হইলে থাকতে পারবেন।

পরিবার আছে বলেছি, আমার সাথে থাকবে তা তো বলিনি। আব্বা-আম্মা এখানে থাকে না। কোন বাসা? ভাড়া কত? দেখা যাবে ব্যব¯’া করতে পারবেন?

একটা খবরের কাগজের ছোটো টুকরা ছিঁড়ে নিয়ে সেটা ভিজিয়ে অন্য একটা চা ভরতি ছোটো গøাসের ওপরে বসিয়ে মুখটা আটকে দিয়ে রওনা হওয়ার সময় শুভকে চায়ের দোকানদার বলল, আপনি এখানে দাঁড়ান ঐ বাসার কেয়ারটেকাররে নিয়ে আসতেসি, কিš‘ একটা শর্ত আছে। এক মাসের বাসাভাড়ার অর্ধেক টাকা আমারে দিতে হবে এক্সট্রা। রাজি?

শুভ খানিকটা হতভম্ভ হয়ে গেল; মনে মনে বললÑশালা বলে কী? কিš‘ মুখে কিছু না বলে হাসিমুখে সে বলল, আরে সেটা দেখা যাবে।

দেখা যাবার দরকার নাই আমার, কাইল ঈদ টেকা লাগবো। যদি রাজি হন তো আনি না হইলে আপনি নিজে খুঁইজা নেন।

দোকানদারের ভাবভঙ্গি দেখে শুভ বুঝতে পারল মিষ্টি কথায় এই মালকে ফিটিং দেওয়া যাবে না। সুতরাং চায়ে চুমুক দিতে দিতে তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে বোঝাল সে রাজি কেয়ারটেকারকে আনা হোক। শুভর মাথা নাড়ানো দেখে ভরসা করেছে এমন মনে হলো না দোকানদারকে দেখে তবে সে বেশি কথার লোক নাÑহনহন করে হেঁটে একদিকে রওনা হলো লোকটা। শুভ একবার ওপর দিকে তাকিয়ে ছোট্ট একটা দীর্ঘশ^াস ছেড়ে মুচকি হেসে আবার চায়ে চুমুক দিল। দুই মিনিটের মধ্যেই একটা রোগা পটকা লোক সঙ্গে নিয়ে হনহন করে হাঁটতে হাঁটতে দোকানদারকে আসতে দেখে হাতের সিগারেটটা ফেলে সোজা হয়ে দাঁড়ালো শুভ। লোকটা এসে ঠিকমতো না দাঁড়াতেই শুভকে জিগ্যেস করল, আপনি বাসা দেখতে আসছেন? আসেন আমার সাথে।

শুভ চায়ের কাপটা দোকানে রেখে কেবল এক কদম বাড়িয়েছে, অমনি দোকানদার বলে ওঠে, ভাইজান টাকাডা?

শুভর দারুণ মেজাজ খারাপ হলো তা সত্তে¡ও দোকানদারের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল, আগে বাসাটা নেওয়া হোক তারপর না টাকা।

খুব শান্ত গলায় দোকানদার বলল, সেই টাকা না দিয়ে আপনি এই মহল্লায় থাকতেও পারবেন না, আপনি চায়ের টাকাডা দেন।

শুভ খানিকটা হচকিয়ে গেল আসলেই মনের ভুলে চায়ের টাকা না দিয়েই চলে যা”িছল সে। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, আপনার সামনেই আমার বাইকটা রাখা আছে খেয়াল রেখেন, আমি কথা বলে বাসা দেখে এসে আরেক কাপ চা খেয়ে বিল দিয়ে যা”িছ।

তাহলে চাবিডা দিয়া যান।

এবার শুভ আর নিজেকে সামলাতে পারল না; কিছু একটা বলতে যাবে এমন সময় সেই রোগা পটকা লোকটা খানিকটা ধমকের সুরে বলে ওঠে, কী রে? উনি টাকা না দিলে আমি দিমু তোরে যাহÑভাইয়া আপনি আসেন আমার সাথে।

শুভ এক মুহূর্ত নিজেকে সামলে নিয়ে পকেট থেকে এক শ টাকা বের করে চায়ের দোকানদারকে দিয়ে শান্ত গলায় বলল, বাকি টাকার চা খেয়ে শোধ করে দেব। বাইকটা খেয়াল রেখেন।

আপনার হয়ে যাবে এই বাসা, যান।

শান্তভাবে ঠোঁট চেপে একটু হাসার ভঙ্গি করে হাঁটতে শুরু করল শুভ। কয়েক পা এগোতেই রোগা লোকটা বলল, ওর কথায় কিছু মনে নিয়েন না ভাইয়াÑখুব ভালো লোক। মহল্লার সব বাটপারগুলান দি”িছ দিবো করে ওর বহু টাকা হজম করে বসে আছে, কেউ টাকা দেয় না। ওর বা”চা মেয়েটা সকাল থেকে এসে দোকানের পাশে মাটিতে গড়াগড়ি করে কান্নাকাটি করছে। এই কিছুক্ষণ আগে বাড়ি চলে গেলÑকাইল ঈদ, বাপের কাছে একটা লাল রঙের ঈদের জামা কিনে চাইছিল, বাপ দিতে পারেনি। ও কী কষ্ট বুকে চেপে আছে তা আর কেউ জানে না।

মনে হচ্ছিল কোনো একটা সমস্যায় আছে। যাই হোক, ভাইয়া আমার নাম শুভ। আমি একটা এজেন্সিতে চাকরি করি। আব্বা-আম্মা বাড়িতে থাকেন।

বাড়ি কোথায়?

নাটোরে। ভাইয়া বাসাটা কয় রুমের?

এক রুমের বাসা চিলেকোঠায়Ñতবে বাসাটা কিš‘ খুব নিয়ম-কানুন মেনে চলে। মাসের শুরুতে ভাড়া দেওয়ার নিয়ম, গ্যাস বিল ভাড়ার মধ্যেই, বিদ্যুৎ বিলÑআপনার মিটার আলাদা করা আছে। খুব নিয়ম-কানুন মেনে চলা বাসা। ভালো ফ্যামিলির লোকজন সব থাকে।

কয় তলায়?

ছয় তলা। কিš‘ ঘটনা হ”েছ আপনাকে যে বাসাটা দেখাব সেখানে আগে একজন থাকত। সে মেলা দিনের ভাড়া না দিয়ে ফুড়–ৎÑসে কারণে বাসায় তার কিছু জিনিসপত্র আছে, আপনি চাইলে সেগুলো ব্যবহার করতে পারবেন?

ভাড়া কত বললেন না?

আরে ভাড়ায় কিছুই আটকাবে না, আপনি আগে দেখেন। ভাইজান ওমান পাঠাইতে কত টাকা নেন? মানে চাকরিবাকরিসহ আর কী, ওয়ার্কিং ভিসা?

শুভ খানিকটা হচকিয়ে গিয়ে অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, বুঝলাম না কী?

বললেন যে এজেন্সিতে চাকরি করেন।

হা হা হা, আরে না না সেই এজেন্সি না আমি একটা মার্কেটিং এজেন্সিতে চাকরি করি।

আ”ছা বুঝছি রি-পেজেন্টেটিক?

আরে না না, এটা অন্য ধরনের একটা মার্কেটিং কোম্পানি।

ওঃ।

শুভর কথা শেষ না হতেই একটা বাসার সামনে এসে তার দিকে একবার তাকিয়ে বাড়িটা দেখিয়ে দেয় লোকটা। তারপর বাড়ির ভেতরে রওনা হয় সে। শুভ এক মুহূর্ত বাড়িটা দেখে নিয়ে লোকটার পিছু নেয়। সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে ওঠার সময় ওপর থেকে এক লোককে নামতে দেখে শুভ তাকে সাইড দিতে গিয়ে খেয়াল করে লোকটাই দুই সিঁড়ির বিরতির জায়গায় নিজেই এক কোনায় দাঁড়িয়ে শুভদের সাইড দি”েছÑসে তার দিকে একবার তাকাতেই দেখতে পায় লোকটা দাঁত কেলিয়ে শুভর দিকে তাকিয়ে হাসছে। শুভও একটু মুচকি হাসার চেষ্টা করে আবার ওপরে উঠতে শুরু করে।

চিলেকোঠার ঘরের দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে যে ভ্যাপসা একটা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ নাকে এলো তাতেই শুভ বুঝতে পারল কমপক্ষে ছয় মাস এক বছর এই ঘরে কেউ আসেনি। লোকটা ভেতরে ঢুকে টুক করে একটা লাইট জ্বালাতেই সবকিছু খানিকটা পরিষ্কার হলো, তবে অন্ধকার কাটল না। শুভ ভালো করে লক্ষ করল ঘরের এক পাশে বেশ পুরোনো ধাঁচের ডিজাইন করা একটা বড় খাট পাতা আছে। তার পাশেই একটা ছোটো ফ্রিজ, দুটো ভিক্টোরিয়ান ডিজাইনের কাঠের চেয়ার এবং তাতে বেশ দামি চামড়ার গদি আঁটা, দরজা বরাবর দেয়ালে একটা অনেক পুরনো লম্বা গ্র্যান্ড ফাদার ক্লক ধুলোয় একদম ধূসর হয়ে গেলেও পেন্ডুলাম এখনো আপন শক্তিতে মৃদু কটকট শব্দে দুলছে। শুভ চোখটা ঘরের ভেতর আরেকটু ঘোরাতেই দেখতে পেল বইপত্র ভরতি একটা পড়ার টেবিল আছে, খাট বরাবর ঠিক উলটা পাশের দেয়ালের জানালা সমান উঁচু তাকের মতো বানানো যেখানে রান্না করার একটা সিঙ্গেল চুলা বসানো আর তাকের নিচের দিকে পানি ব্যবহারের ব্যব¯’া। দুই-তিনটা পাতিল, ফ্রাই প্যান, প্লাস্টিকের বড়ো ডিব্বা আর কিছু তেল-মসলার প্যাকেট। ঘরে কোনো সিলিং ফ্যান নেই তবে একটা বকের মতো লম্বা স্ট্যান্ড-ফ্যান আছে খাটের পাশে। শুভ বেশ খানিকটা অবাক হলো জিনিসপত্র দেখে মৃদু স্বরে জিগ্যেস করল, কে থাকত এখানে?

ছিল একজন।

এত চমৎকার সব জিনিসপত্র নিয়ে যায় নাই কেন?

জিগ্যেস করার সময় পাইলাম কই? হুট করে একদিন হাওয়া।

কথা বলতে বলতে লোকটা ঘরের ভেতরের এক পাশের একটা জানালা খুলে দিল আর তাতেই বিকেলের মিষ্টি একটুখানি রোদ এসে ঘরে পড়তেই সবকিছু যেন জাদুর মতো একটা অন্যরকম আরামদায়ক চেহারা পেয়ে গেল। আর মুহূর্তেই শুভর ভালো লেগে গেল ঘরটা। শুভর মনের কথা বুঝতে পেরেই কি না কে জানে লোকটা বেশ কনফিডেন্সের সঙ্গে বলে উঠল, ভাড়া আট হাজার টাকা। এক টাকাও কম না এক টাকাও বেশি না, এই বাসা খুব নিয়ম-কানুন মেনে চলা বাসা।

শুভ এক মুহূর্ত ভেবে লোকটার দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করল, আপনার নাম কী?

আমার নাম সাইফুল আমিই এই বাসার কেয়ারটেকার, সব দেখাশোনা করি।

সাইফুল ভাই আমার পছন্দ হয়েছে অ্যাডভান্স এখুনি করতে হবে?

করলে ভালো না করলেও অসুবিধা নাই। ঈদের পর এসে বাসা ভাড়া আর অ্যাডভান্স একসাথেই দিয়েন লাগে।

আমি ঈদে বাড়ি যা”িছ না। আজই এখুনি উঠব।

তাহলে তো হইলোই। জিনিসপত্র নিয়ে আসেন।

জিনিসপত্র ঈদের পর আনব।

অহ তাহলে ভাইয়া টাকা দিয়ে দেন। আর আপনার ভোটার আইডি কার্ডটা দেন ফটোকপি করায় নিয়ে আসি নাকি আছে করা?

করাই আছে।

শুভ পকেট থেকে টাকা বের করে গুনে নিয়ে সাইফুলের হাতে দিয়ে বলে, এখানে উনিশ হাজার পাঁচ শ টাকা আছে। আপনার এক মাসের ভাড়া, এক মাসের অ্যাডভান্স আর বাকি তিন হাজার টাকা ঐ চায়ের দোকানদারকে দিয়ে বলবেন মেয়েকে দুইটা জামা কিনে দিতে একটা লাল একটা গোলাপি। বাকি পাঁচ শ আপনার।

সাইফুল কিছুক্ষণ শুভর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর তাকিয়ে থাকা দেখে শুভ হেসে উঠে জিগ্যেস করে, আপনি বাইক চালাতে জানেন?

অকস্মাৎ টাকা পাওয়ায় খুশিতে উত্তেজনায় সাইফুল বলে ওঠে, জানি মানে! জীবনের অর্ধেক তো পার করছি মোটরসাইকেলে ভাইয়া।

এই নেন আমার বাইকের চাবি। নিচে গ্যারেজে রাখা যাবে না বাইক?

যাবে না মানে? পুরা গ্যারেজই আপনার।

গ্রেট! যান তাহলে আমি এগুলো খানিকটা পরিষ্কার করি।

আরে কন কী? আপনার করতে হবে না আমি করায় দিচ্ছি, পাঠাইতেসি একজনরে আপনি রেস্ট নেন।

এর মাঝে আবার রেস্ট নেব কোথায়?

বাইরে একটা সুন্দর দোলনা আছে।

আ”ছা ঠিক আছে আপনি যান।

চলে যেতে যেতে দরজার কাছে গিয়ে আবার ঘরে ঢুকে সাইফুল বলে, ভাইয়া আপনি আজ কাল পরশু রান্নাবান্না করার কথা ভাইবেনও না আমার ছোটোডায় সেইরাম রান্না করে। আপনি খাইলে খুশি হয়ে যাবেন।

ঠিক আছেÑতবে আপনি একটা কাজ করেন চায়ের কাপ আর নতুন চাপাতা চিনি দিয়ে যান, এই নেন টাকা নিয়ে যান। আর এক বোতল পানি।

না না টাকা লাগবো না ভাইয়া।

সাইফুল ঘর থেকে বের হয়ে যেতেই কাজে লেগে যায় শুভÑএকটা খবরের কাগজ ভাঁজ করে রাখা ছিল পড়ার টেবিলেÑসেটায় হাতে তুলে একবার চোখ বুলিয়ে দেখল বেশ পুরোনো খবরের কাগজ, আপাতত এটা দিয়েই কাজ চালানো যাক ভেবে সেটা দিয়েই জানালার পর্দায় একটা বাড়ি দিতেই শুভ বুঝতে পারল এটা দিয়ে কাজ হবে না। খুঁজে খুঁজে সে একটা পুরোনো ঝাড়– বের করল ঘরের দরজার পেছন থেকে, তারপর প্রথমে সেটাকেই বাইরে নিয়ে ঝেড়ে ঝেড়ে পরিষ্কার করে নিয়ে এসে ঘরের জানালার পর্দাগুলো ঝাড়ে, এরপর বিছানা ঝেড়ে পরিষ্কার করে। সারা ঘর ঝাড়– দিয়ে ধুলোবালি ঝেড়ে বাইরে বের করে ফেলে দেয় ছাদের এক কোনায়। এমন সময় সাইফুল এসে নতুন এক সেট চায়ের কাপ, চাপাতা, চিনি আর পানির বোতল রেখে যায় ঘরে। যাওয়ার সময় কান পর্যন্ত লম্বা একটা হাসি দিয়ে বলে, নিজেই কইরা ফেললেন ভাইয়া। আমি লোক পাঠাইতেসি আর কিছু কইরেন না। পানির বোতল থাকল, লাগে সকালে আবার পানি দিয়া যাব।

উত্তরে শুভ শুধু মুচকি হাসে। ঘরে ঢুকে শুভ দেখতে পায় টেবিলের ওপর একটা বাক্সে নতুন এক সেট সিরামিকের কাপ-পিরিচ, সেইসঙ্গে চায়ের পাতা, চিনি, মোটা একটা পানির বোতল। নিজের ব্যাগ থেকে একটা ধবধবে বিছানার চাদর বের করে বিছানায় পেতে নেয় সে। তারপর লম্বা হয়ে কেবল বিছানায় শুতে যাবে এমন সময় দরজায় কে যেন ঠকঠক করে নক করে। শুভ চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে দরজায় এক মাঝবয়সি সম্ভ্রান্ত চেহারার লোককে দেখে কিছুটা হচকিয়ে যায়, পর মুহূর্তেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তাঁকে সালাম দেয় সে শান্তভাবে, ¯øামালিকুম।

সালাম দিলে সম্পূর্ণ দিতে হবে,স্লামালিকুম কী? যাই হোক ওয়ালেকুম সালাম। নতুন এসেছ? তুমি করে বললাম তুমি আমার ছোটো ভাইয়ের বয়সি হবে।

না না ঠিক আছেÑতুমি করেই তো বলবেন।

বাইরে এস দুটা কথা বলি।

আপনি প্লিজ ভেতরে এসে বসুন না।

ভদ্রলোক গম্ভীর মুখে এক মুহূর্ত কী যেন ভেবে ‘হুম’ জাতীয় একটা শব্দ করে ঘরের ভেতরে এলেন। শুভ চেয়ারটা এগিয়ে দিল। তিনি বসে শুভর দিকে তাকিয়ে দেখলেন শুভ তখনো দাঁড়িয়ে আছেÑগম্ভীর গলায় শুভকে বসতে বললেন, বস।

শুভ নিজের বিছানায় শান্ত হয়ে বসে পড়ল। ভদ্রলোক এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, আমার নাম আজম খান। এই বাড়িটা আমারইÑকে এসেছে সেটা একবার দেখতে এলাম। এসেই টাকা-পয়সা উড়িয়ে সবাইকে হাত করে তখুনি থেকে যাওয়াটাÑতার ওপর এমন একটা দিনে। আসল ঘটনা কী সেটা জানতেই আসা?

জি মানে আসলে আমি আগে যেখানে থাকতাম সেখানে অন্য একজন উঠে পড়েছে, আমার আজকের মধ্যেই কোথাও উঠে যাওয়া দরকার ছিল সে কারণেই…

তোমাদের মতো ছেলেপেলের এই একটা সমস্যা। একদম তলার কাছে না এলে তোমরা কিছু করতে চাও না। বাবা-মা আছে?

জি আলহামদুলিল্লাহÑআসবেন উনারা ঈদের পরে। এসে কদিন থেকে যাবেন।

হুম। কী করেন বাবা?

জি উনি ফার্স্টক্লাস কনট্রাক্টর ছিলেন, এখন অবশ্য কিছু করেন না।

তুমি কী কর?

আমি একটা মার্কেটিং এজেন্সিতে আছি।

ওঃ বেসরকারি কোম্পানি। বিদেশি?

জি নাহ।

হুম, শোন ব্যাচেলরদের অনেক ঝামেলাÑযা আমার পছন্দ না। এই বাড়ি সম্পর্কে সবকিছু জানো?

জি এটা একটা কঠিন নিয়ম-কানুন মেনে চলা বাড়ি। আংকেল চা খাবেন?

ভদ্রলোক এক মুহূর্ত শুভর দিকে তাকিয়ে থাকেনÑশুভ উনার চোখের দৃষ্টি দেখে কিছুটা মিনমিন করে বলে, না মানে আমার খেতে ই”ছা করছে তাই জিগ্যেস করলাম আর কী। আপনি খেলে আপনার সাথে আমারও খাওয়া হয়ে যাবে।

ভদ্রলোক আরো এক মুহূর্ত শুভর দিকে তাকিয়ে থেকে ঘাড় ফিরিয়ে চুলার দিকে একবার দেখে আবার শুভর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠেন, তুমি বানাবে?

জি আংকেল একদম নতুন এক সেট কাপ আনিয়েছি, আপনি উদ্বোধন করবেন।

বানাও তাহলে চিনি ছাড়া।

জি।

শুভ খানিকটা স্বস্তি পেল বিছানা থেকে উঠতে পেরে। শুভ চা বানাতে শুরু করতেই ভদ্রলোক আবার কথা বলতে শুরু করেন, ব্যাচেলরদের অনেক সমস্যা যা আমার পছন্দ না। মেয়ে বন্ধু আছে?

শুভ পানি গরমে দিতে দিতেই বলে, না আংকেল।

কেন? এত চমৎকার সুদর্শন একটা ছেলের মেয়ে বন্ধু নেই কেন? অবশ্য না থাকলেই ভালো, তবে যদি থাকে সেটা যেন একজনই হয়, বাসায় দ্বিতীয় কাউকে যেন না দেখি।

আসলে আংকেল সময় করে উঠতে পারি না। আর আপনি কাউকেই দেখবেন না। আমার আসলেই মেয়ে বন্ধু নেই।

সেটাও তো ভালো কথা না। যাই হোক, ঈদে বাড়ি যা”ছ না কেন?

ততক্ষণে শুভর চা বানানো শেষ। চায়ের কাপ আজম খানের হাতে দিতে দিতে উত্তর দেয়, ছুটি কম আংকেল। আসলে আমাদের কাজই বাড়ে যে সময় সাধারণ মানুষের ছুটি হয়। আজ কাল আর পরশু এই তিনদিন ছুটি সে কারণেই যাব না ঠিক করেছি।

চায়ে চুমুক দেওয়ার পর আজম খানের মনে হলো সামান্য মনটা নরম হয়েছে। তিনি খানিকটা নরম সুরে জিগ্যেস করলেন, চায়ের এই মসলা কোথায় পেলে?

চাপাতা আনিয়ে নিয়েছি আর বাকিগুলো আমার সাথেই ছিল।

একটা ছোট্ট দীর্ঘশ^াস ছেড়ে আজম খান বললেন, এই ঘরটায় আমি থাকতাম। বাবা যুদ্ধের আগে আগেই এই বাড়িটা কিনেছিলেন। তোমাকে দেখে আমার নিজের কথা মনে পড়ে গেল। আমি চাই কেউ একজন থাকুক।

আমার সৌভাগ্য আংকেল।

হঠাৎ চায়ের কাপটা এক পাশে রেখে উঠে দাঁড়ালেন আজম খান। তারপর আবার আগের মতো গম্ভীর গলায় বললেন, হইহুল্লোড় করা যাবে না বাড়িতে। আরো মানুষ থাকে তারা ছাদে আসে। কোনো রকম কোনো কমপ্লেন এলে ঐদিনই বাসা ছাড়তে হবে। যেখানে সেখানে সিগারেটের ফিল্টার পরে থাকতে দেখলে ঐদিনই বাসা ছাড়তে হবে। আর গাঁজার গন্ধ পেলে তো…

শুভ মুখ শুকনো করে বলে ওঠে, ঐদিনই বাসা ছাড়তে হবে।

হুম আমি আসছি। কাল এস আমার বাসায়।

জি।

ভদ্রলোক ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার পরে শুভর মনে হলো বুকের ওপর থেকে একটা পাথর নেমে গেল ওর। বড় করে একটা শ্বাস নিয়ে উঠে গিয়ে কাপ-পিরিচগুলো ধুয়ে সুন্দর করে চুলার পাশে একটা র‌্যাকে সাজিয়ে রাখল। তারপর আবার বিছানার কাছে এসে লম্বা করে কেবল শুতে যাবে সে, এমন সময় বা”চা একটা ছেলের কণ্ঠ শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখতে পায় দরজায় একটা দশ-বারো বছরের বাচ্চা ছেলে হাতে একটা ফুটবল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটা শুভকে জিগ্যেস করে, তুমি কি নতুন এসেছ?

শুভ তার দিকে তাকিয়ে মুচকি একটু হেসে উত্তর দেয়, হ্যাঁ।

তুমি কি আমার সাথে ফুটবল খেলবে?

ফুটবল খেলা যেতে পারে, তবে তুমি আগে ভেতরে আস। তোমার নাম কী?

ঘরে ঢুকতে ঢুকতে ছেলেটা উত্তর দেয়, রুদ্র। এই বলটা বাবা কিনে দিয়েছে এক মাস হয়, কিš‘ এখন পর্যন্ত খেলার সুযোগই পাইনি। খেলবে?

কেন সুযোগ পাওনি কেন?

স্কুল কোচিং তারপর যখন স্কুল ছুটি হলো। তখন আম্মুর শুরু হলো ঈদের শপিংয়ের টর্চার। এক জামা কিনতে সাতবার মার্কেটে নিয়ে যায়।

হা হা হা তাই নাকি?

হ্যাঁ। আমার তো প্রথম দিনই কেনা শেষ। কিš‘ আম্মু পর্দা কিনতে গিয়ে তিন ঘণ্টা ঘুরে ঘুরে পর্দা না কিনে এক জোড়া স্যান্ডেল কিনে আনে। তারপরের দিন বিকেলে আবার মার্কেটে যেতে হয় পর্দা কিনতে, এভাবে করে সব ছুটি শেষ হয়ে গেল। বন্ধুরা সব চলে গিয়েছে দাদু বাড়ি নাহয় নানু বাড়িÑআমরা তো যাই না। তুমি আমার সাথে খেলবে? প্লিজ চল না খেলি।

শুভর বুকের মাঝে কেমন যেন করে ওঠে বা”চাটার জন্য। সে উঠে দাঁড়াতেই বুঝতে পারে সে ভয়ানক ক্লান্ত। ফুটবল খেলার মতো অবস্থায় একদম নেই। এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে ব্যাগের পকেট থেকে একটা চকলেট বের করে রুদ্রর হাতে দিয়ে শান্তভাবে শুভ বলে, রুদ্র আমি আজ ভয়ানক ক্লান্ত ভাইয়া। আজ খেলতে পারব না। তবে কথা দি”িছ কাল থেকে প্রতিদিন তোমার সাথে ফুটবল খেলব, ঠিক আছে?

সামান্য মন খারাপ হলেও চকলেট পেয়ে রুদ্র কিছুটা খুশি হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। সে হাসিমুখে ঘাড় কাত করে চকলেট নিয়ে বিদায় হতেই শুভ আড়মোড়া ভেঙে টেবিলে রাখা হাতঘড়িতে সময় দেখতে প্রায় পাঁচটা বাজতে চলেছে। ঘড়িটা রেখে শুভ বিছানার দিকে এগিয়ে যায়। লম্বা হয়ে কেবল শুতে যাবে বিছানায় এমন সময় দরজায় কে যেন কথা বলে উঠতেই শুভ ঘাড় ঘুড়িয়ে তার দিকে তাকায়…

আরে সব তো দেখি চকচকা ফসসা। সাইফুল তো কইলো ঘরে ময়লার ঢিবি?

শুভ খানিকটা বিরক্তি নিয়ে জিগ্যেস করে, তুমি কে?

আমি রুস্তম। সিটি করপোরেশনে চাকরি করি, ঐ রাস্তাঘাট কিলিনিংয়ের। পিছেই আমার বাসা। সাইফুল ডাকলে টুকটাক কাজ-কাম করে দিয়ে যাই। ইট্টু আগে ডাক দিল তাই আইলাম। কী করা লাগবি কন?

কিছুই করতে হবে না তুমি যাও।

শুভ কথা বলতে বলতে রুস্তম ঘরে ঢুকে সোজা বাথরুমের দিকে চলে গিয়েছে আর এতক্ষণে শুভর মনে পড়েছে ওয়াশরুমটা তো চেক করা হয়নি।

আ”ছা হ্যাঁ এসেছ ভালো করেছ ওয়াশরুমটা ক্লিন করে দিয়ে যাও।

বাথরুমের ভেতরে এক মুহূর্ত দেখে নিয়ে দাঁত বের করে হাসতে হাসতে রুস্তম এসে শুভর সামনে মেঝেতে বসে বলে, একদম কিলিন আছে তারপরেও আমি আবার কিলিন করে দিয়ে যাচ্ছি। আমিই কিলিন করে দিছিলাম আগের জন যে ছিল উনারে। কঠিন লোক ছিল, আমারে সব সময় বিড়ি-সিগারেট খাওয়াই তো, কোনোদিনও বুঝি নাই এইরম বাটপার লোক আমার পঞ্চাশ টাকা না দিয়ে একদিন ফুড়–ৎ।

আমি তোমারে এক শ টাকা দিচ্ছি, ক্লিন করে দিয়ে যাও।

আ”ছা ভাইজান ঘরের সাতে পায়খানা থাকলে অসুবিধা হয় না?

মানে?

না মানে বাথরুম…আমার তো জীবনেও বাইর হবে না। আরাম করে তো বায়ু দেওয়াই যাবে না ঠিক না?

কী নোংরা কথাবার্তা বলছ? তুমি যাও তো।

হে হে হে…বায়ুতে আবার নোংরা কী, সবাই দেয় সালমান খানও মাধুরীও দেয়। হে হে হে আপনি দেন না?

আশ্চর্য! এই তুমি যাও তো তোমাকে ক্লিন করতে হবে না। এখুনি যাও।

সরি সরি ভাইজান রাগ হইলেন? সরি আপনের কাছে বিড়ি আছে?

ভয়ানক মেজাজ খারাপ হলেও শুভ খানিকটা শান্ত হয়ে বলে, না নেই।

সিগারেট? সিগারেট হলেও চলবে, দেন না একটা খায়া কামডা কইরা দিয়া যাই। ঘরে বিড়ি খাইতে পারি না। বিড়ি খাইলে মাইয়াডা কাছে আসে না। খালি কয় গু গু…। হে হে ছোটো তো কেবল কতা ফুটছে মুখে। তাই বউ রাগ হয়। দেন না ভাইয়া।

শুভর আর কোনোভাবেই কথা বাড়াতে ই”ছা করছিল না। প্রচÐ রাগ চেপে রেখে শান্তভাবে নিজের ব্যাগের পকেট থেকে নতুন সিগারেটের প্যাকেট বের করে সেখান থেকে একটা সিগারেট বের করে রুস্তমের হাতে দিয়ে বলে, আর একটা কথাও বলবা না। ওয়াশরুম ক্লিন করে চলে যাও। যাবার সময় যদি দেখ আমি ঘুমিয়েছি তবে ডেকে তুলে রেখে যেও।

কথা শেষ করেই শুভ ধপাস করে বিছানায় শুয়ে বালিশে মাথা দিয়ে একটা আরামের নিঃশ্বাস ছাড়ে চোখ বন্ধ করে। কেবল শুভর চোখজুড়ে ঘুম নামি নামি করছে, এমন সময় এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে আবার রুস্তম কথা বলে ওঠে, ভাইজান একটা কই? নোংরা কতা না ভালো কতাÑআমার এক শেস্টো ঘটনা যা পিথিবিতে আর ঘটে নাই বোদয়।

চোখ বন্ধ থাকা অব¯’াতেই শুভ বুঝতে পারল এই লোক আসলে নাছোড়বান্দা। ছোটো একটা শ্বাস ছেড়ে বলল, বল।

রুস্তম খুশি হয়ে গলগল করে এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে বলতে শুরু করল, একবার হইছে কী আমার শালার বিয়া আমি তো যামু না। কারণ গেলেই হুদাই খরচ হইবো মেলা টেকা। না চাইতেও খরচ হইবো আবার বিয়ার শেষে কেউ জানবোই না আমার কত টেকা শ্যাষ। যামু না যামু না কইরাও বউয়ের পিড়াপিড়িতে শ্যাষম্যাশ গেছি, কিš‘ মনে মনে ঠিক কইরা রাখছি বিয়াত তো নিছোস শালির ঘরের শালি আমি যদি ঠিকমতো সম্মান না পাই তো বিয়ার গুষ্টি আমি মাইরা দিমুÑবরযাত্রী গিয়া আমারে সম্মানের সাতেই এক টেবিলে খাইতে দিছে। একে তো আমি জামাইয়ের দুলাভাই, তার উপর সরকারি চারকি করা লোকÑখাইতে খাইতে একজনরে কইছি ভাই আর এক পিস গোশত দেন তো। সে ত্যাজ দেখায়া আরেকজনরে কয়, ‘ওয় উনারে দুই গামলা গোশত দে তো কত খাইতে পারে দেখি!’ হেই বেটা আমারে দুই গামলা গোশত খাইতে দিয়া ভাবছে খাওয়াইয়া আমারে শায়েস্তা করবো আমিও সেই মাল শুরু করছি আল্লার নাম নিয়া খাওয়া দুই গামলা খাইয়াও যখন আরো এক গামলা গোশত আনতে কইছি ওগো তো মাতা নষ্টÑরাগের চোটে আনছে আরো দুই গামলা। আমিও সপাত সপাত কইরা মাইরা দিছি আরও দুই গামলা ততক্ষণে বিয়াবাড়ির সবাই আসছে আমারে দেখতে যে কে এই মাল? আমার তো কুনো আলাপ নাই কোপায়ে যাইতেসি। সারা বিয়াবাড়ি হুলুস্থুল অবস্থা শ্যাষম্যাশ আইসা আমার শালার শালা হাতে পায়ে ধইরা কয় দুলাভাই মাফ কইরা দেন। হের পর গান সেই আমি খাওয়া বন্ধ করছি আর সবার সে কী হাততালি।

শুভর শরীর এতই ক্লান্ত সে যে রুস্তমকে কিছু বলবে সেটাও পারছে না সে শুধু কোনো রকম বলল, বাহ! তুমি তো গিনিজ বুকে নাম লেখাতে পারবা।

এইডা কী? কোনো পতিযোগিতা? গোশত খাওনের পতিযোগিতা আছে?

রুস্তম আমার শরীরটা ভালো লাগছে না সামান্য রেস্ট নেওয়া দরকার। তুমি প্লিজ কাজটা শেষ কর।

কুনো চিন্তা কইরেন না আপনি ঘুমান আমি সব চকচকা কইরা আপনারে ডাক দিমুনে। আপনের সিগারেটটা ভালো বেশি গন্ধ হয় না, যাওনের সময় আরেকটা দিয়েন ভাইয়া।

শুভ ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে শুধু বলে, হু ঠিক আছে।


শুভ কতক্ষণ ঘুমিয়েছে ও জানে নাÑওর মনে হ”েছ অনেক দূর থেকে কে যেন ওকে ডাকছে শুভ আস্তে করে চোখ মেলে প্রথমে বুঝে উঠতে পারে না সে কোথায় আছে। রুস্তম আরেকবার ডাক দিতেই মাথাটা সামান্য উঁচু করে রুস্তমের দিকে তাকিয়ে দেখে এক মুহূর্ত পরে বুঝতে পারে এটা রুস্তম আর সে এখন তার নতুন বাসায়। আবার মাথাটা বালিশে এলিয়ে দিয়ে জিগ্যেস করে, কাজ শেষ?

জি সব কাজ শ্যাষÑসারা ঘরবাড়ি সব চকচকা করে দিছি।

চোখের পাতা দুইবার পিটপিট করে। তারপর ভালো করে তাকিয়ে সারা ঘরে চোখ বুলিয়ে শুভ দেখতে পায় সত্যি সবকিছু পরিপাটি করে গুছিয়ে একদম চকচকে করে রাখা আর তার মাথার উপর একটা সিলিং ফ্যান ঘুরছে। শুভ রুস্তমকে জিগ্যেস করে, ফ্যান কোথা থেকে এলো?

সাইফুল ভাই লাগায় দিয়া গ্যাছে, বাড়ি মালিকের কাছে নাকি এস্টা একটা আছিলো আপনারে সেইডা দিতে কইসে তাই।

উফফফ গ্রেট।

বিছানায় উঠে বসে মানিব্যাগ থেকে এক শ টাকা বের করে রুস্তমকে দিতেই রুস্তম বলে, ভাইজান জাস্ট পঞ্চাশ টাকা দ্যান। আপনার সাথে দোস-বন্দুর মতো কত গপ্পো করলাম মনডা হালকা হইসে। কতাই তো কওয়া যায় না কারো সাতে।

আরে না না রাখ পরে আবার এস, তখন কাটাকাটি করে নেব।

না না ভাইয়া। খুচরা না থাকলে পরে দিয়েন আমারে একটা খালি সিগারেট দ্যান যদি থাকে। সিগারেটটা ভালো গন্দ হয় না।

সিগারেট দিচ্ছি তুমি টাকাটাও রাখ।

রুস্তম হে হে করে হাসতে হাসতে বাম হাত দিয়ে ডান হাতের কুনুই ধরে ডান হাত এগিয়ে দিয়ে বলল, দ্যান তাইলে। সিগারেট লাগবো না।

না না দাঁড়াও একটা সিগারেটও নিয়ে যাও।

শুভ উঠে গিয়ে আরেকটা সিগারেট রুস্তমের হাতে দিতেই সে সালাম দিয়ে বিদায় নিল। শুভ আবার এসে বিছানায় একবার গা এলিয়ে দিলÑফ্যানের বাতাস থাকলেও জানালা দিয়েও বেশ বাতাস আসছেÑজানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল শুভ। তারপর উঠে বসে হাতঘড়িটায় সময় দেখল সন্ধ্যা সাতটা বাজে। একটা সিগারেট বের করে জ্বালাল সে। আরপর গুটিগুটি পায়ে ঘর থেকে বের হতে গিয়ে দরজা পার হতেই মৃদু ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ শুনে শব্দের উৎস লক্ষ করে তাকাতেই শুভ দেখতে পায় ছাদের এক কোনায় একটা দোলনা বসানো আছে আর সেই দোলনায় অদ্ভুত মিষ্টি একটা মেয়ে বসে আস্তে আস্তে দোল খাচ্ছে। এক মুহূর্ত দেখেই শুভ বুঝতে পারল শ্যাম বর্ণের হলেও অদ্ভুত সুন্দরী মেয়েটা। ছেড়ে দেওয়া চুলে সঙ্গে মুখে আড়ম্বর কোনো মেকাপ বা অলংকার নেই, হালকা রঙের শাড়ির সঙ্গে হাতাকাটা একটা বøাউজে দুর্দান্ত আকর্ষণীয় লাগছে তাকে। পাশেই রাখা ব্যাগের সাইজ দেখে অনুমান করা যায় মেয়েটা সম্ভবত পড়াশোনা করে অথবা চাকরি করে। বাড়িঅলার বলে যাওয়া কথা কানে বেজে ওঠে শুভর। সে কারণেই মেয়েটার দিকে না গিয়ে ছাদের অন্যদিকে চলে যায় সে যেন তাকে দেখতে না পায় মেয়েটা।

সিগারেট শেষ করে নিজের ঘরে ঢুকতেই হতবাক হয়ে সে দেখতে পায় মেয়েটা তার ঘরের ভেতরে দাঁড়িয়ে শুভর উপস্থিতি টের পেয়ে চট করে শুভর দিকে ঘুরে মৃদু হেসে জিগ্যেস করে, নতুন এসেছেন?

মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে শুভ উত্তর দিল, জি।

মেয়েটা সামান্য হাসার চেষ্টা করে বলে, আসলে কিছু মনে করবেন না, আমি প্রায় বছর দুয়েক হয় এই বাসায় থাকি কোনোদিনই এই ঘরটা খোলা দেখিনি। মাঝেই মাঝেই বাসায় ফিরে ছাদে বসে কিছুক্ষণ দোল খাই দোলনায়। এই ঘরটা দেখতাম আর ভাবতাম কী আছে এই ঘরে? কে থাকে এই ঘরে!

সাইফুলকে জিগ্যেস করলেই তো হতো।

কারো সাথে তেমন একটা কথা বলা হয়ে ওঠে না আমার। যাই হোক আজ দেখলাম মনের কিউরিসিটি কিছুটা কমে গেল।

কমে গেল মানে কিছুটা তো থেকেই গেল তাই তো?

বুঝিনি!

আপনি বললেন কিউরিসিটি কিছুটা কমে গেল অর্থাৎ পুরোটা একেবারে চলে গেল নাÑতাই বললাম।

ওহ হ্যাঁ তা ঠিক।

ঘরের ভেতর তো দেখেই ফেললেন তাহলে আর কী?

বাকি যেটুকু থাকল সেটা তো আর ফিলাপ করা সম্ভব নয়।

কী রকম?

এই যেমন ধরেন এই ঘরে ঝড়ের রাতে থাকতে কেমন লাগে? বৃষ্টির দুপুরে কেমন লাগে? এই ঘরের জানালা দিয়ে শরতের আকাশ আর মেঘ দেখতে কেমন লাগে? রান্না করতে কেমন লাগে? জোরে শব্দ করে গান শুনতে কেমন লাগে? এইসব

তাহলে এক কাজ করেন আমার সাথে আপনার বাসা বদল করেন। আমি আপনার বাসায় চলে যাই আপনি আমার বাসায় উঠে আসেন।

হা হা হা হা…মেয়েটা এবার এক মুহূর্ত কথায় বিরতি দিল। তারপর খুব নরম কণ্ঠে বলল, আসলে জানালা খুললেই পাশের বাসার জানালা অথবা দেওয়াল দেখা যায়, বিশেষ করে রান্না করার সময় ব্যাপারটা খুব বিরক্তিকর। খোলা আকাশ দেখা যায় না, আরাম করে জোরে শব্দ করে গান শোনা যায় না, গান গাওয়া যায় না। ইচ্ছামতো জামাকাপড় পরে অথবা না-পরে থাকা যায় না। আরো অনেক অসুবিধা আছে, কি তবুও নিজের ঘরের নিজের বাসার মায়া ছাড়া যায় না বুঝছেন? আর একা একা এই ঘরে রাতে থাকতে পারব বলে মনে হয় না। আমি অনেক ভিতু একা একা ভয় পাব।

আপনি একাই থাকেন?

নাহ! আচ্ছা আমি আসি।

প্লিজ বসেন না চা খাবেন? আমি দুনিয়ার সেরা চা বানাতে পারি বলে আমার ধারণা। খাবেন? প্লিজ না বলবেন না, আমার ইগনোরড ফিল হবে।

হা হা হা, আজব তো। নাম কী আপনার?

শুভ।

শুভ? চমৎকার নাম। শুনলেই কেমন একটা গুড ফিলিং মানে শুভ শুভ ফিলিং কাজ করে না? হ্যাঁ। আমার পছন্দের নামের তালিকার একটা নাম ‘শুভ’।

জোসÑযেহেতু নামে টেনেছেÑতাহলে চায়েও টানবে।

আ”ছা চা খাব তবে ঘরে না দোলনায় বসে খাব।

বিশ্বাস করেন আমারও তাই মনে হচ্ছিল দোলনায় বসে চা খাই। আপনি প্রথম ঘরের ভেতরে এসেছেন, কী না কী মনে করেনÑআপনি গিয়ে বসেন আমি চা নিয়ে আসছি? চায়ের সাথে কুকিজ খাবেন নাকি চকলেট?

মানে চায়ের সাথে আবার চকলেট কে খায়?

আরে খায় খায়Ñখাবেন নাকি সেটা বলেন?

না না কুকিজ ইজ গুড এনাফ।

ওকে আমি নিয়ে আসছি জাস্ট দুই মিনিট।

দুই মিনিট?

একদম।

মেয়েটা ঘর থেকে বের হয়ে দোলনায় গিয়ে বসে মৃদু দোল খেতে শুরু করল। ওদিকে শুভর অনেকদিন পর বুকের মাঝে এক রকম তোলপাড় শুরু হয়েছে এত জোরে বুকের মধ্যে হার্টবিট শুরু হয়েছে যে নিজেই নিজের হার্টবিট শুনতে পাচ্ছে মনে হয়েছে। সে বুঝতে পারল তার হাঁটু কেমন কাঁপছে। শুভ চায়ের পানি বসাতে বসাতে নিজেকে কিছুুটা ধাত¯’ করল তারপর একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে চা বানাতে শুরু করল। ওদিকে মেয়েটা গুনগুন করে গান শুরু করেছে শুনতে পেল শুভÑহঠাৎ ওর মনে হলোÑআরে কী আশ্চর্য! এখনো তো নামটাই শোনা হয়নিÑআমি একটা গাধা মহা গাধাÑশুভ তুই একটা গাধা।

দুই হাতে দুই চায়ের কাপ আর মুখে কামড়ে ধরে এক প্যাকেট কুকিজ নিয়ে এসে দোলনার কাছে উপস্থিত হয় শুভ। মেয়েটা শুভর হাত থেকে একটা চায়ের কাপ নিয়ে নেয় দ্রæত হাতে। শুভ এক হাতে মুখের প্যাকেটটা দোলনায় রাখতে রাখতে বলে ওঠে, সাবধান! চা কি অনেক গরম।

অসুবিধা নেই আমি গরম চা-ই পছন্দ করি।

শুভ চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে আছে দেখে মেয়েটা জিগ্যেস করে, কী হলো আপনি বসবেন না?

না না দাঁড়িয়েই ঠিক আছে।

-আরে ধুরো আপনি দাঁড়িয়ে আর আমি মহারানি এলিজাবেথের মতো দোলনায় বসে চা খাব? বসেন এখানে?

আ”ছা আমি ঘর থেকে চেয়ারটা নিয়ে আসছি, আপনার সামনে বসে কথা বলব আর চা খাব।

-হা হা হা…শোনেন আমি বলছি বসেন। পাশাপাশি বসে চা খেলে মহা ভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না।

জি না আসলে তা নাÑকালকে ঈদের দিনÑনতুন বাসা কোথায় পাব? এটাই বহু কষ্টে ম্যানেজ করেছি।

মানে?

হঠাৎ কেউ চলে এলে মানে কেউ দেখে ফেললে আজই বাসা ছাড়তে হবে।

হা হা হা হা হা…আজব! কে বলেছে এই কথা? বাড়িঅলা? হা হা হা…কেউ আসবে না ছাদে আর রাতে কেউ আসে না।

আপনি কী করে জানলেন?

বসেন বলছি।

শুভ একবার এদিক ওদিক তাকিয়ে মেয়েটার পাশে দোলনায় বসে। মেয়েটা চায়ের কাপে এক চুমুক দিয়ে খুব মৃদু স্বরে বলতে শুরু করে, এই ছাদে রাতের পর রাত একা একা বসে থেকেছি আমি, জানি রাতে কেউ আসে না ছাদে।

আপনি যে বললেন একা একা রাতে ভয় পান।

হ্যাঁ ঘরে দম বন্ধ লাগে। একাকিত্ব একটা ভয়ানক ব্যাপার কি এখানে তো খোলা জায়গা ভয় পাব কেন?

ওঃ আমি ভেবেছি একা একা ভ‚তের ভয় পান।

হা হা হা…ভ‚তের ভয়। ভ‚ত আছে যে ভয় পাব? আমিই তো বড় ভ‚ত। দারুণ চা বানিয়েছেন একটা কুকিজ খুলে দেন তো।

শুভ তাড়াতাড়ি করে দুজনের মাঝে দোলনায় রাখা কুকিজের প্যাকেটটা তুলে নিয়ে খুলে মেয়েটার সামনে এগিয়ে ধরে। মেয়েটা একটা কুকিজ নিয়ে কুট করে কামড় দিতেই শুভ বলে ওঠে, আপনার নাম কী?

অনুমান কর তো কী?

নাম আবার কেউ অনুমান করে নাকি?

এতক্ষণ তো মনে মনে সেটাই করছিলেÑতুমি করে বলতে ইচ্ছা হয়েছে তাই বলছি।

না না ইটস ওকে।

বল দেখি আমার নাম কী হতে পারে? মানুষের ইনটিউশন অনেক সময় সঠিক নাম বলে যেমন তোমাকে দেখেই আমার মনে হয়েছে তোমার নাম শুভ বা শুভ্র।

সত্যি!

হু, বল আমার নাম কী হতে পারে?

রুপা?

হা হা হা হা…হুমায়ূন আহমেদ পড় অনেক, তাই না?

পড়ি মানে সব পড়ে শেষ করেছি কোনো কোনোটা তো দুইবার তিনবার করে পড়া।

হা হা হা…মনেই হয়েছিল। হিমু হতে মন চায়নি কখনো?

চায়নি মানে? একবার তো হিমু হয়ে দুই সপ্তাহ খালি পায়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে পায়ের তলায় ফোসা ঠোসা পরে একাকার অব¯’া। বাসায় ফিরতেই আম্মা সেবা-যতœ করবে কী জুতা খুলেই এমন পিটান দিয়েছে হিমুগিরি ছুটে গিয়েছে…

শুভর কথা শুনে হাসতে হাসতে প্রায় দোলনা থেকে পরে যাবার অবস্থা হয় মেয়েটার। হাসতে হাসতেই সে শুভর একটা বাহু ধরে ফেলে সে, তারপর শুভর থুতনি ধরে সামান্য নাড়া দিয়ে আদুরে ভঙ্গিতে বলে, আম্মু হিমু বাবুকে পিটান দিয়েছে? তুমি তো শুভ্র আর হিমুর একটা কম্বিনেশন হা হা হা। তারপর নিজেকে সংযত করে হাসতে হাসতে বলে, উফ! বাবা গাধা ছেলে একটা। আ”ছা তোমার ওয়াশরুম ইউজ করা যাবে?

হ্যাঁ হ্যাঁ শিওর।

কথা বলতে বলতে উঠে দাঁড়ায় মেয়েটা। শুভও উঠে দাঁড়াতে যাবে মেয়েটা বলে ওঠে, তুমি উঠছ কেন? তুমিও যাবে নাকি?

না মানে…

না মানে কী? ওয়াশরুম ক্লিন তো নাকি? আমার কিš‘ এলার্জি আছে।

ক্লিন মানে? ভাত খাওয়া যাবে ওয়াশরুমে বসে।

ছিঃ, এসব কী কথা?

আমার কথা না যে ক্লিন করে দিয়ে গিয়েছে সে বলেছে ও যে আরো কী কী বলে শুনলে আপনি অজ্ঞান হয়ে যাবেন।

আমার শোনার দরকার নাই। উলটাপালটা কথাবার্তা সব। আমি আসছি ততক্ষণে তুমি আমার নাম অনুমান কর। ওকে।

হু।

মেয়েটা ঘরের দিকে যেতেই হুট করে ছাদের দরজায় দুইটা বড় টিফিন বাটি হাতে উপস্থিত হয় সাইফুল।

চায়ের কাপ হাতে শুভকে দোলনায় দেখেই হে হে করে হাসতে হাসতে বলে ওঠে, হে হে ভাইয়া…আপনের জন্য রাতের খাবার আনছি। আপনি দেখি দোলনায় বইসা চা খান।

আরে সাইফুল ভাই! হ্যাঁ হ্যাঁ গ্রেট…

কথা বলতে বলতে চটপট উঠে দাঁড়ায় শুভ। ওর বুকের মাঝে ধুকপুক করে ওঠে। তাড়াতাড়ি করে সাইফুলের কাছে এগিয়ে গিয়ে খাবারের বাটি দুইটা হাতে নিয়ে বলে, আপনি এলেন কেন? আমি যেতাম।

আরে আপনি কষ্ট করে নিচে যাবেন কেন? এই নেন আপনার বাইকের চাবি। একদম ধুয়ে চকচকা করছি কাইল যখন ঘুরব