বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬
সাহিত্য-সংস্কৃতি

দ্বীপের দেশ মালদ্বীপে

দ্বীপের দেশ মালদ্বীপে

মালদ্বীপে বেড়াতে গিয়েছিলাম একটুভয়, মন খারাপ নিয়েই। বাচ্চাদের বাবা সাথে যেতে পারেনি এজন্য। তবে সে মন খারাপ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। এয়ারপোর্টে পৌঁছে দুইজোড়া মিষ্টি কাপলের সাথে পরিচয় হওয়ায় সব মন খারাপ চলে গেলো মুহুর্তে । এক জোড়া কাপল তো মনে হয় বাসর রাত পার করেই রওনা দিয়েছিলো।তাদের চারপাশে সবসময় নতুন বিয়ের সৌরভ যেনো ঘুরঘুর করছে মৌমাছির মতো। কনে দেখা আলোর মতে নরম একটা আভা  তাদের চেহারায় লেগে ছিলো। আমাদের দলীয় ভ্রমণে এই নব দম্পতির আবেশ আলাদা সৌন্দর্য যোগ করে। মালদ্বীপে

এটা ভ্রমণ না বলে স্মৃতি কথা বলা ভালো। চাররাত পাঁচদিনে ভ্রমণ আর কতোটুকুই হয়।স্মৃতির চারন করা যায়।

অন্য অনেক শহর, দেশ ভ্রমণের ইচ্ছেছিলো,আছে  মনে মনে। কিন্তু মালদ্বীপ ভ্রমনের তেমন কোন  ইচ্ছে ছিলোনা কখনই।কারণ সমুদ্র আমাকে ততটা টানেনি কখনোই। কিছুদিন থেকে ভীষণ ঘুরতে মন চাইছিলো। কোথায় যাওয়া যায়? অনেক হিসেব করে দেখলাম এই মুহূর্তে আমার জন্য মালদ্বীপ ছাড়া অন্যকোন পথ নেই। তারপর শুরু হলো প্রস্তুতি মালদ্বীপের উদ্দেশ্যে।

একেক জন একেক দৃষ্টিতে পৃথিবী দেখে। একই জায়গায় ঘুরতে যায় অসংখ্য মানুষ।সৌন্দর্য হয়তো সবাই উপভোগ করে নিজের মনের চাহিদা অনুযায়ী।

মালদ্বীপ নিয়ে আমার পূর্ব পরিকল্পনা না থাকায় উচ্ছাস ও কম ছিলো কিন্তু মালে সিটি তে শহরের গা ঘেঁষে সমুদ্রের নীল জল দেখে আমি চমকে গিয়েছিলাম।  এতো সুন্দর হয় সমুদ্র!  আমি মালদ্বীপে এসে একটু পর পর চমকে যাচ্ছিলাম কারণ মালদ্বীপের কাছে সমুদ্রের নীল জলরাশি ছাড়া আর বেশি  কিছু দেখার আশা ছিলো না।  সিটি ট্যুরে ঘুরতে বের হয়ে যখন দেখলাম এখানে কেউ অকারণে হর্ণ বাজাচ্ছে না, এমনকি মাঝরাস্তায় ভুলে দাঁড়ালেও না, কিচ্ছু চুরি হবার ভয় নেই শুনলাম আমাদের গাইডের কাছে।অনেক রাতে একলা কোন মেয়ে রাস্তায় হাঁটছে ফোনে কথা বলতে বলতে আমি একটু চমকে গেছি থমকেও গেছি। অনেক ফরেনারকে তাদের দেশের পোশাকেই স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরতে দেখেছি। বাংলাদেশ থেকে এতো কাছের একটা দ্বীপে মানুষের জীবনের এমন নিশ্চয়তা,এমন স্বাচ্ছন্দ নীল সমুদ্রের সৌন্দর্যের চেয়ে এই মানসিকতার মালদ্বীপের প্রেমে পড়লাম আগে।

প্রতম দিন আমরা মালে থেকে হুলহুমালে হোটেলে থাকলেও মালে সিটি ট্যুরে বেড়িয়েছিলাম সন্ধ্যা নাগাদ। কোন দেশ সম্বন্ধে নুন্যতম কিছু জানতে হলে তাদের খাবারের লোকাল বাজার এবং বইয়ের দোকান দেখা উচিত বলেছেন সৈয়দ মুজতবা আলী।  সেই অনুয়ায়ী আমরা গাইড কে বলে লোকাল বাজারে গেলাম।

মনে হল মোহাম্মদপুরের টাউন হলে গেছি। তেমন কোন পার্থক্য চোখে পরেনি। বাজারের গা ঘেষে মাছের আড়ৎ। আর আড়ৎ সমুদ্রের সাথেই। পদ্মপাতা মাছ বলে নতুন এক মাছ দেখলাম যা আগে কখনও দেখিনি।  পদ্ম পাতার মতো বিশাল তাই।এছাড়া ও পিজন পার্ক এঢিয়া  খুব ভালো লেগেছে। অসংখ্য কবুতরকে খাওয়ানো হয়। সব সব বয়সের লোকাল মানুষের আড্ডাস্থল বলা যায়।

ূগাইড আমাদের বাংলাদেশি হওয়ায় গল্প করে, তাদের লোকাল জীবন, কালচার জানতে পারি। স্থানীয় সকলেই ইংরেজি ভাষায় অভ্যস্ত।কারন অক্সফোর্ডের সিলেবাস ফলো করে তারা। বাংলাদেশের অনেক ছেলেই সেখানে বিয়ে করে, তারাও বাংলাদেশি মেয়েদের বিয়ের জন্য প্রথম পছন্দের তালিকায় রাখে। কারণ হিসেবে জানলাম বাঙালি মেয়েরা ততটা স্বাধীনতা প্রত্যাশি না। এটা একমাত্র কারন। লাস্ট বিশ বছরে মালদ্বীপে কোন ধর্ষণ,খুনের ঘটনা ঘটেনি। এথেকেই তাূের মানসিকতার বড় পরিচয় পাই। এবং মেয়েদের ইভটিজিং এ শাড্তি ভয়াবহ। তাি প্রতিটা মেয়ে নিজেকে মানুষ ভাবতে পারে যেখানে আমরা নিজেদের মেয়ে ভেবে আসছি।

আর খাবারে আমাদের তেমন সমস্যা হয়নি কারন হুলহুমালে সহো অন্য সব দ্বীপেই প্রচুর ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট। দেশিস্বাদ পেতে তাই ততটা চিন্তা 

মালদ্বীপে প্রায় ১২০০ আইল্যান্ডে মানুষের বসবাস। আরও  ৬০০ আইল্যান্ড আছে মানে সমুদ্রের মাঝে বুক উচিঁয়ে আছে কিন্তু মানুষ থাকতে পারেনা। হয়তো বসবাস যোগ্য না। ফেব্রুয়ারীতে ফিরলাম মাত্র তিনটা আইল্যান্ডের কিছু অংশ দেখে।

মাফুসি আইল্যান্ড (১৩ তারিখ)

মাফুসি আইল্যান্ডে পৌঁছে স্পিডবোট থেকে নামতে নামতে  প্রথম আমার যে মানুষটার কথা মনে পড়লো সে হলো ৯০ দশকের  প্রিয় সিরিজ ম্যাকগাইভারের কথা। সাজানো সারি সারি স্পিডবোড থেকে এই বুঝি নীল চোখের ম্যাকগাইভার মাথা বের করে হেসে উঠবে। পান্না সবুজ রঙের জলরাশি আর জেটিতে বাধা অনেকগুলো স্পিডবোট!  প্রথম দর্শনেই মাফুসি কে ভালোলেগে গেলো। হোটেল থেকে আমাদের নিতে আসা বাঘিতে করে হোটেলে যেতে যেতে শুনলাম প্যারাসেইলিং করতে চাইলে আজও করা যাবে সময় আছে। লাগেজ রেখে লাঞ্চ না করেই আমরা প্যারাসেইলিং এর উদ্দেশ্যে গন্তব্যে পৌঁছে শুনলাম সময় শেষ প্যারাসেইলিং এর। বিকেল পাঁচ টার পর আর সম্ভব না। ভীষণ মন খারাপ হলো। যদিও আগামীকাল পুরোদিন  আমাদের হাতে আছে কিন্তু তবুও সবার মন খারাপ। আগামীকাল আমাদের আরো এক আইল্যান্ডে যাওয়ার কথা। “বাদ যাবে না একটা শিশুও ” এর মতই আমাদের দলও যেনো পন করেছি কোন ওয়াটার এক্টিভিটি বাদ দেয়া যাবেনা। আমার চেয়ে বাচ্চাদের মন আরও খারাপ ছিলো। তাই ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৩০ ডলার খরচ করে জেটস্কি করালাম। আনন্দ পাওয়ার মাধ্যম টাও যে উপরওয়ালার হাতে!  হুলহুমালের স্পিডবোট মিস হলো বলেই বাচ্চাদের জেট স্কি করানো সম্ভব হলো। বাচ্চারা জেট স্কি থেকে ফিরে খুব খুশি সকালে আমাদের স্পিডবোট মিস হওয়ায়।

মাফুসি আইল্যান্ডে আলাদা একটা বিচ আছে যার নাম বিকিনি বিচ। ওখানে শুধু এডাল্টরা যেতে পারবে। কারন শতভাগ মুসলিম দেশ। ধর্ম এবং রোজগারের এক সুন্দর সমন্বয় দেখলাম।

মালদ্বীপের অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ ভালো এবং পুরোটাই ট্যুরিস্ট নির্ভর। তাই ট্যুরিস্টদের জন্য প্রয়োজনীয় সবরকম ব্যবস্থাই সেখানে আছে। শুধু নিয়মটা মেনে চললেই হলো। সন্ধ্যায় একটা বাঘি ভাড়া করে আমরা তিন পরিবার পুরো আইল্যান্ড ঘুরতে বের হলাম। একঘন্টা চুক্তিতে। খুব ছোট্ট এবং সুন্দর  একটা দ্বীপ মাফুসি। একদম ছবির মতো। আগেই শুনেছি এই দেশে চুরি,ছিনতাই নেই। আবারও প্রমান পেলাম রাতে ডিনারের পর বীচে যেয়ে।অনেক রাত পর্যন্ত আমি বাচ্চাদের নিয়ে বীচে বসে ছিলাম নির্ভয়ে । কারন আশেপাশে অনেকেই আমার মতো বসে আছে। কেউ গান করছে,। কেউ ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। দলবেঁধে বেড়াতে আসা মানুষগুলোর হাসি আর গল্পে পুরো বীচে যেনো আনন্দ সভার আয়োজন।সেই ভালোলাগা টুকুর কথা আমি কখনো ভুলবোনা। আমার মনে হলো এমন রাতের অপেক্ষায় আমি ছিলাম বহুদিন ধরে। হয়তো নিজেও বুঝতে পারিনি।  নইলে কেনো এতো ভালো লাগবে? কোন কথা কারো সাথে না বলেও মনে হচ্ছিলো আমি খুব হালকা অনুভব করছি সত্যিকার অর্থে। যেনো এই সমুদ্র, সাদা বালির তীর, ঝকঝকে আকাশ, আর পাশে খেলতে থাকা আমার বাচ্চাদের হাসির শব্দ আমার সব না বলা কথার উত্তর দিচ্ছে।

ওলহুভেলি আইল্যান্ড (১৪ তারিখ)

সানসিয়াম রিসোর্ট

মালদ্বীপ ভ্রমণের সবচেয়ে কাঙ্খিত যে জায়গা আমি দেখার অপেক্ষায় ছিলাম সেটা ছিলো কাঠের ভিলাগুলো দেখা।কারন মালদ্বীপ দেখার আগেই বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে  মালদ্বীপের ছবি মানেই  কাঠের ভিলাগুলো দেখতাম। ভেবেছিলাম মালদ্বীপ যাওয়া মানেই সমুদ্রের তীরে ওই ভিলাগুলোয় রাত কাটানো। পরে জেনেছি সবার জন্য বিষয় টা তেমন না। এজন্য ওয়ালেট যথেষ্ট ভারী হওয়া চাই জীবনে। তবে আমাদের মতো হালকা ওয়ালেট ধারীদের জন্য সাধ ও সাধ্যের সমন্বয়ে সেই ভিলা দেখার ব্যবস্থা আছে।

মাফুসি থেকে ঘন্টা দেড়েকের মধ্যেই আমরা ওলহুভিলা পৌঁছে যাই। সারাদিন সানসিয়াম রিসোর্ট ঘুরে বিকেলে ফিরে আসা। লাঞ্চ রিসোর্টে করাবে ভেবে আমরা সবাই মহা খুশি। কাঠের ভিলার পাশে পা ডুবিয়ে বসে থাকা,এবং ঘুরে দেখা অবধি আমাদের জন্য বরাদ্দ।  তাতেই খুশি ছিলাম আমরা। রিসোর্ট ও যে এতো বড়ো!  রিসিপশন থেকে রিসোর্টে শেষ মাথা পর্যন্ত যাওয়ার জন্য  নিজস্ব বাস সার্ভিস আছে। আমরা রিসিপশনে যেতেই লাঞ্চ এবং আমাদের সকল সুযোগসুবিধার কথা, আর কি করা যাবে / যাবেনা সব বলে দিলো।

এতো সুন্দর রিসোর্ট, দ্বীপের ভিতরে এতো আয়োজন সত্যি মুগ্ধ  প্রতিটা মানুষ।সবার চোখে মুখে মুগ্ধতা। আগে মাঝেমাঝে কিছু ছবিতে দ্বীপ, সমুদ্রের মাঝে কাঠের ভিলা, নারিকেল গাছ এসব দেখে ভেবেছি নিশ্চয়ই এডিট করা। কিন্তু এই রিসোর্টে যেয়ে মনে হলো এখানে খুব বেশি চিন্তা করে ছবি তোলার দরকার নেই। যেভাবেই ক্যামেরা ধরি ছবির মতো ছবি হবে।পুরো রিসোর্ট সুপরিকল্পিত। প্রতিটা জায়গা আভিজাত্যপূর্ণ।

আমরা পুরো রিসোর্ট দুপুরের মধ্যে মোটামুটি দেখে ফেললাম। তারপর বুফেতে খেতে যেয়ে পরিচয় হলো অনেক বাংলাদেশি মানুষের সাথে। সবাই এই রিসোর্টে অনেকদিন থেকেই জব করেন।  আমাদের বাংলায় কথা বলা দেখেই তারাই পরিচিত হলেন। আমরাও বাঙালি পেয়ে অনেক গল্প করলাম, আরও জানলাম সানসিয়াম রিসোর্ট সম্পর্কে। পরিবারের সাথে বছরে দুইবার দেখা করার সুযোগ আছে তাদের। ভালো বেতনে তারা বেশ ভালোই আছেন। কিন্তু আর সব দেশের মতো মালদ্বীপে কর্মরত সকল প্রবাসীদের মনে দুঃখ বাংলাদেশ এয়ারপোর্টে তাদের সাথে করা আচরণের জন্য।

যাইহোক আমরা খুব বিশেষ একটা দিনে এই দ্বীপে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেটা ছিলো ১৪ ফেব্রুয়ারি। ভালোবাসা দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মানুষগুলো এই সুন্দর জায়গাটাকে তারা বেছে নিয়েছে ভালোবাসার মানুষের সাথে এখানে সময় কাটাবে ভেবে। তাই পুরো রিসোর্ট এতো সুন্দর করে সাজিয়েছিলো। এমন সুন্দর মুহূর্ত দেখার সৌভাগ্য হওয়ায় আবারও উপরওয়ালার কাছে শুকরিয়া আদায় করি।

সানসিয়াম রিসোর্ট কে পিছনে ফেলে আমাদের বোট এগিয়ে যাচ্ছে মাফুসি আইল্যান্ডের দিকে। মাত্র কয়েকঘন্টা এখানে ছিলাম কিন্তু মন খারাপ হচ্ছে এই সুন্দর গাছপালা, এতো হাসি-আনন্দে ভরা মানুষের মুখ, সহসাই দেখা পাবোনা ভেবে। হয়তো এজন্যই জীবন সুন্দর!  সহসাই  সুন্দরের দেখা পাওয়া সহজে হয়না। 

বিকেলের মধ্যে আমরা মাফুসি ফিরে এসে হোটেলে একটু রেস্ট নিয়ে আবারও বাইরে গেলাম কিছু কেনাকাটার উদ্দেশ্যে। মাফুসিতেও দেখলাম ভ্যালেন্টাইন উপলক্ষ্যে হোটেলগুলো সুন্দর করে সাজানো। আর পুরো বিচে কাপলদের জন্য ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের ব্যবস্থা। যা খুবই আকর্ষণীয় ছিলো। প্রেম নিবেদন নাটকীয় ভাবে। আমরা এসবে অভ্যস্ত না হলেও দেখে ভীষণ ভালো লেগেছে। কেউ একজন ভালোবেসে এতো সময়, অর্থ, এবং পরিবেশ তৈরী করেছে আমার অনভ্যস্ত চোখ, মন তৃপ্ত।

বীচের পাশে রেস্টুরেন্ট গুলো সে রাতে একদম বীচের উপর টেবিল দিয়ে ডিনারের ব্যবস্থা করে। টেবিল প্রতি ভাড়া ও কম না। তারপর স্পেশাল ডে,   আর আমার জীবনের স্পেশাল দু’জন আমার সাথে।এরচেয়ে বড় ভ্যলেনন্টাইন গিফট আর কি হতে পারে! আমিও আমার বাচ্চাদের জন্য একটা টেবিল নিলাম।

কিছুকিছু সময় জীবন আমাদের কল্পনার চেয়ে, উপন্যাস কিংবা সিনেমায় দেখা মুহুর্তের চেয়েও সুন্দর মুহুর্তের সামনে দাঁড় করায়। আমি সে রাতে তেমন এক মুহুর্তে ছিলাম। মাঘীপূর্ণিমার রাত! (মাথার উপর সবচেয়ে বড় চাঁদ সে রাতে),  সামনে সমুদ্র, সমুদ্রের পানিতে চাঁদের আলো বাড়াবাড়ি  রকমের সুন্দর। সামনে একঝাঁক অচেনা প্রানবন্ত মানুষ, স্টেজ শো চলছে। কোন ভাষা না বুঝেও ভীনদেশী  গানগুলো বুকে কেমন ঢেউ তুলেছিলো এবং দিনটা ছিলো  ১৪ ফেব্রুয়ারী। পুরোদিন কাটালাম ঝলমলে আনন্দে তারপর এমন রাত। এমন একটা রাতের জন্য, মুহুর্তের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ!

প্যারাসেইলিং এবং স্নোরকেলিং

গুলহি আইল্যান্ড।

গতোকালের ঘুরাঘুরির আবেশ না কাটতেই আমরা তৈরি হলাম আরো এক রোমানঞ্চকর ওয়াটার এক্টিভিটির জন্য।সকাল আটটার মধ্যে নাস্তা শেষে  প্যারাসেইলিং এর জন্য আমরা বেড়িয়ে পরলাম। যে কোম্পানির সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে আমরা প্যারাসেইলিং এ গিয়েছিলাম তাদের ছোট্ট একটা অফিসে আমাদের দলের প্রায় সকলেরই দামি ফোন,  মানিব্যাগ, মানিব্যাগ ভরা ডলার (যারযার সাধ্যমতো), পাসপোর্ট সব অফিসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে চলে গেলাম। আমাদের গাইড খুব দ্রুত যেতে বলছিলো সময়ের অভাবে। শুধু জোড় দিয়ে  বলেছিলো, “এখানে কিছু হারায় না, তোমাদের ভয় নেই”।  তার কথায় এমন কিছু ছিলো আমরা বিশ্বাস করেছি কোন তর্ক ছাড়াই।

স্পিডবোটে করে মাঝ সমুদ্র নিয়ে আমাদের প্যারাসেইলিং এর নিয়ম বলে দেয়া হলো। প্রথমে দুই কাপল সাকসেসফুলি ফিরে এলো এবং কতোটা মজা পেয়েছে তাদের চিৎকার ধ্বনিই বলে দিচ্ছিলো। দুই বাচ্চা দুই পাশে আর আমাকে মাঝে রেখে কোমড়ে দড়ি বেঁধে যখন উড়া শুরু হলো আমি চোখ বন্ধ করে সমস্ত সুরা পড়া শুরু করেছি। তারপর বাচ্চাদের চেচামেচি তে চোখ খুলে দেখি শূন্য আকাশে ভাসছি। নিচে  শুধু গাঢ় নীল সমুদ্র। কোথাও পড়েছিলাম “ভয়”  ও সুন্দর হয় যখন তাকে জয় করা যায়। সত্যিই তাই। খোলা বাতাসে সার্ক ভরা সমুদ্রের উপর উড়ে বেড়ানো ভয়ংকর এবং সুন্দর এক  অভিজ্ঞতা যোগ হলো জীবনে। ডানা বিহীন পাখি হয়ে পাখির চোখে পৃথিবীকে দেখলাম ২০ মিনিট। ড্রোনশটে আমাদের  পাখির মতো উড়ে বেড়ানোর ভিডিয়ো নেয়া হয়েছিলো।

মালদ্বীপে বেড়াতে গিয়েছিলাম একটুভয় / মন খারাপ নিয়েই। বাচ্চাদের বাবা সাথে যেতে পারেনি এজন্য। তবে সে মন খারাপ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। এয়ারপোর্টে পৌঁছে দুইজোড়া মিষ্টি কাপলের সাথে পরিচয় হওয়ায় সব মন খারাপ চলে গেলো মুহুর্তে । এক জোড়া কাপল তো মনে হয় বাসর রাত পার করেই রওনা দিয়েছিলো।তাদের চারপাশে সবসময় নতুন বিয়ের সৌরভ যেনো ঘুরঘুর করছে মৌমাছির মতো। কনে দেখা আলোর মতে নরম একটা আভা  তাদের চেহারায় লেগে ছিলো। আমাদের দলীয় ভ্রমণে এই নব দম্পতির আবেশ আলাদা সৌন্দর্য যোগ করে।

আমরা একসাথে ঘোরােফেরা করে ভীষণ মজা পাচ্ছিলাম।  কিন্তু সামান্য চিন্তায় পরে গেলাম স্নোরকেলিং এ। আমি তো সাঁতার পারিনা। আমার মেয়েও পারেনা। আর ছেলে (সাঁতার জানে)সমুদ্রের বিশাল জলরাশি তে এমন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে যেনো হরহামেশাই এমন স্নোরকেলিং করে সে। দুই কাপল একসাথে সমুদ্রে নেমে একজন আরেকজনের সাপোর্টার হিসেবে আছে। নির্ভয়ে। কিন্তু আমি আর আমার মেয়ে পড়লাম বিপদে। আমাদের সাথে সার্বক্ষণিক একজন গাইড ছিলো যদিও। সমুদ্রের তলদেশ থেকে আমাদের মাছের সাথে সাঁতারের ছবি তোলা এবং পানির তলদেশ দেখানোর জন্য। তবুও ভয় হয়।আমি সকল ভয় জয় করে পানি তে নামলাম টিউবে ভর করে এবং সমুদ্রের লোনা পানি পেট ভরে খেলাম। এরমাঝেই  গাইডের নির্দেশে  পানির নিচে তাকিয়ে চমকে গেলাম!  সুবহানাল্লাহ!

কি অসম্ভব সুন্দর এই পৃথিবী!  সাগরের তলদেশ! এতো রঙীন মাছ, কোরাল। আমি যেনো সমুদ্রের তীব্র স্রোতে ভেসে যেতে যেতেও ভুলে গেলাম ভয় পেতে।

 এ যাত্রায় দাপাদাপি শেষে হলো যখন গাইড ভদ্রলোক জানালো সমুদ্রের স্রোত বাড়ছে তোমরা উঠে যাও। তারপর আমাদের আরও কিছুদূর নিয়ে গেলো সমুদ্রের অন্যরুপ দেখানোর জন্য। সেখানেও একই প্রসেস নাকে মুখে, পায়ে কি এক পাইপ দিয়ে নেমে পরলাম সমুদ্রের নিচে এবার অন্যএক সৌন্দর্য।  সুবহানাল্লাহ!  আল্লাহ তায়ালা শুধু পৃথিবীর উপরিভাগকে যত্ন করে তৈরি করেনি সাগরের তলদেশ ও যে কতো বৈচিত্র্যময়, কতো পরিকল্পিত সুন্দর হতে পারে না দেখলে লিখে বুঝানো যাবেনা। কি বিশাল একেকটা কোরাল!  সত্যিই! পাথরকেও তৈরি করেছেন কি যত্ন করে তিনি। আর সেই কোরালের খাঁজেখাঁজে ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে লালনীল হলুদ অসংখ্য মাছের দল। আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে কতো শুনেছি,পড়েছি সেদিন নিজ চোখে আরও এক সৃষ্টি  দেখে আমি নির্বাক হয়ে বসে ছিলাম স্পিডবোটে।

 ওই ভেজা কাপড়েই আমাদের নিয়ে গেলো স্যান্ডব্যাঙ বিচে। এটা মুলত গভীর সমুদ্রের মাঝে জেগে উঠা চর। খুবই অল্প জায়গা নিয়ে জেগে ওঠা চর।এক তীরের পানির সাথে আরেক তীরের পানি প্রতি টেউ এ এসে বাড়ি খাচ্ছে। বিষয়টা ড্রোনশটে বেশি ভালোলাগে।  চারপাশে নীল সবুজ পানি মাঝখানে একটু বালি খুবই সুন্দর।  বাচ্চাদের সাথে আমরা বড়রাও দাপাদাপি করলাম সমানতালে। আর হ্যাঁ আমাদের গাইড ছিলো বাংলাদেশি। দীর্ঘদিন থেকেই সে এই বিজনেসে মালদ্বীপ আছে। তাই আমাদের সমুদ্রের তলদেশ ভ্রমণ  নির্ভয়ে এবং সুবিধাজনক হওয়ার এটাও একটা কারণ ছিলো।

খুব তড়িঘড়ি করে মাফুসি ফিরেই লাগেজ নিয়ে আবার হুলহুমালের উদ্দেশ্য আমরা বেড়িয়ে গিয়েছিলাম।এতোটাই তাড়াতাড়ি যে মাফুসিকে, মাফুসির সেই সুন্দর বিচ কে একটু ধন্যবাদ জানানো হয়নি। মুলতঃ মালদ্বীপ ঘুরাঘুরি আমাদের এখানেই শেষ।হুলহুমালে ফিরে যাচ্ছি বাংলাদেশে, নিজের দেশে ফিরতে।

হুলহুমালের ফিরে রাতে শহর ঘুরে শপিং টুকটাক আর ডিনার করেছি পাঞ্জাবি রেস্টুরেন্টে। কোন তারাহুরো নেই। আস্তেধীরে আমরা হাসি আনন্দে ঘুরে বেড়াইলাম। অনেক রাত পর্যন্ত।  সকাল ১০ টায় আমার চলে যাবো মালে র উদ্দেশ্য।

ভ্রমণ গল্প প্রত্যেকের ভিন্ন। আমি আমার ভালোগালা গুলো লিখলাম সাদা চোখে যা দেখেছি তাই লিখেছি। সবশেষে বলতে চাই সামর্থ্য অনুযায়ী ভ্রমন করুন। নিজ দেশে নিজ থানায়  যতোটুকু পারা যায়। ব্যাগটা গুছিয়ে বেড়িয়ে পড়ুন  যেভাবেই গোছান জীবনকে কিছু না কিছু অসঙ্গতি থাকবেই।  নতুন শহর, জনপদে দেখার আনন্দ সবচেয়ে সুন্দর বিষয়। ঘরে একগোছা ফুল যেমন সৌরভ ছড়ায় ভ্রমণ আনন্দ আপনার জীবনে ফুলের সৌরভের মতো।