বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ৮ জুন, ২০২৬
সাহিত্য-সংস্কৃতি

ষাট সেকেন্ডের গল্প -জনয়িত্রী

ষাট সেকেন্ডের গল্প -জনয়িত্রী

গভীর রাতে রমিজ আলী বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলো। না পালিয়েই বা কি করবে?আগামীকাল তাঁর বিয়ে।আর এ বিয়ে করা তার পক্ষে মোটেও সম্ভব না।

নাহ! রমিজ আলীর আলগা কোন প্রেম নেই।প্রেম তো তার জুলমত বিবির সাথে।সেই কোন ছোটবেলায় বিয়ে হয়েছে তাদের।মেয়েটা এত ছোটো ছিল যে কলসীটাও ঠিকমত তুলতে পারতনা,রমিজই পুকুরঘাট থেকে পানি তুলে এনে দিত ,মেয়েটার কাপড় কেচে দিত তাই দেখে কত মানুষের কত কথা!!

শুধুমাত্র মেয়েটার বাচ্চা হয়না বলে বিয়ের পনেরো বছরের মাথায় সেকি তোড়জোড় শুরু হয়েছে তার বিয়ে নিয়ে।রমিজের মা তো মাথার দিব্যি দিয়ে বসেছে ,বাপ মা হারা জুলমতকে বাড়িতে রাখতে চাইলে আরেকটা বিয়ে করতে হবে।নয়তো তিনি জুলমতকে ভিটা ছাড়া করবেন।

রমিজ মনে মনে অবাক হয়।শুধুমাত্র উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বাপের দুই বিঘা জমির কি দাম,কি তেজ।এজন্য তাকে বাধ্য করা হচ্ছে এই পাপ করতে।মানুষ কদিন বাঁচে?কদিন???

গভীররাতে জুলমতকে সঙ্গে নিয়ে রমিজ আলী ভিটা ছাড়েন।সঙ্গে হাজার পাঁচেক টাকা সম্বল আর জমির দলিল।গন্তব্য দূরের কোন শহর।যার নাম পর্যন্ত এ গ্রামের মানুষ শোনেনি।

বহুটা পথ পরিক্রম করে রমিজ এই শহরে পৌঁছায়।এ শহরে প্রাণ নেই।সব যন্ত্র।মানুষ গুলোও যন্ত্র।রমিজ জুলমত জানে তাদেরও যন্ত্র হতে হবে।

২.

নতুন শহরে রমিজ কাজ জুটিয়ে নেয়। দুমুঠো দুবেলা ভালোই চলে যায়।শুধু জুলমতই মানিয়ে নিতে পারে না।বস্তির ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরে জুলমতের মন টেকে না।কান্না পায়।বস্তির লোকজনদের নোংরা অশ্রাব্য গালি গালাজে অসহায় লাগে।মন পরে থাকে সেই গাঁয়ে।সেই পুকুরঘাট,ধানী জমির ক্ষেত,তার প্রিয় হাঁস মুরগির পাল।টিনের ছোট্ট ঘরটা।বৃষ্টির শব্দে আর রমিজ আলীর ভালবাসায় মাখানো সেই মধুর সময়গুলি।।আজ সৃষ্টি কর্তার নিঠুর সিদ্ধান্তে সে এই অবস্থায় পড়ে গেছে।তবুও সান্তনা রমিজের মত এত ভালো স্বামী সে পেয়েছে।

এই যন্ত্রের শহরে জুলমতেরও কাজ জুটে যায়।এই শহরে বাসাবাড়িতে কাজ করলে ভালো টাকা পাওয়া যায় তাই রমিজও না করেনা।

তিনতলা এই বাসাটা মালিক পুরোটা নিয়েই থাকে।এদের বাগান দেখার জন্য লোক লাগে,বাড়ী পাহারা দেয়ার জন্য লোক লাগে,ভিন্ন ভিন্ন কাজের ভিন্ন ভিন্ন লোক রয়েছে।জুলমত যতই দেখে ততই অবাক হয়।কত টাকা বাতাসে উড়ে।শুধু ধরতে জানলেই হয়।

বিশাল জায়গা জুড়ে তিনতলা এ বাড়ির পেছন দিকটা শুধু এ বাড়ির সাহায্যকারীদের জন্যই বরাদ্দ।অনেকগুলো রুম এখানে।সাহায্যকারীরা কাজ করার জন্য মূল বাড়িতে আসে।কাজ শেষ হলেই নিজেদের ডেরায় ফিরে যায়।

এ বাড়ির মালকিন বয়স্ক বৃদ্ধা ।তার নির্দেশেই এই বাড়ির সবকিছু চলে।মালিক আর মালকিন নাকি ডাক্তার ছিলেন।মালিক মারা যাবার পর মালকিন আর কিছু করেন না।তবে বয়সের তুলনায় অনেক শক্ত।তাকে সবাই ভয় পায়।মালকিনের কথাতে এ বাড়ির সবাই উঠে বসে।তার দরাজ গলার ভয়ে কাক পক্ষীও খুব একটা এ পথ মাড়ায় না।

৩.

এ বাড়ির মালকিনের নাম ডা:আসফিয়া আলম।সত্তরোদ্ধ এই মহিলা এক সময়ের নামকরা গাইনি ডাক্তার ছিলেন।এই শহরে বড় বড় তিনটা নামকরা ক্লিনিক আছে তাঁর।তিনি সেটা দেখাশোনা করেন।তবে বয়স হয়ে যাওয়ায় ইচ্ছা করেই প্র্যাকটিস করা ছেড়ে দিয়েছেন বছর দশেক আগেই। তাঁর একটিমাত্র ছেলে।সেও প্যারালাইসিস।অত্যন্ত বিষণ্ন চেহারার ও নিরীহ ছেলের বউ সারাদিন অসুস্থ স্বামী নিয়েই ব্যস্ত থাকে।

জুলমতের কাজে ডাঃ আসফিয়া আলম যথেষ্ট সন্তষ্ট হওয়ার দরুন রমিজ আলীও এ বাসায় কাজ পেয়ে যায়।দারোয়ানের কাজ।পাশাপাশি তাদের থাকারও ব্যবস্থা হয়ে যায় যে বাড়ির সার্ভেন্টস কোয়ার্টারে।

জুলমত এ বাড়ির রান্নার সাহায্যকারী শাপলার কাছ থেকে শুনেছে ডাক্তার ম্যাডামের এক নাতনি আছে।খুব উশৃঙ্খল।ডাক্তার ম্যাডাম এত জাঁদরেল হওয়ার পরও নাতনির ব্যাপারে সে পুরাই অন্ধ ছিল।অতি আদরে সে মেয়ে নাকি বাদর হয়েছিল।প্রায় রাত করে বাড়ি ফিরতো,নেশা ভাঙ করতো।কাউকে ভয় পেত না।কিন্তু সেই নাতনিও নাকি অতি নেশায় পাগল হয়ে তিনতলার এক ঘরে বন্দি।তার চিকিৎসা চলছে।সুস্থ হলেই বিদেশ পাঠিয়ে দেবে।তাই তিন তলার ওই ঘরগুলোতে বাড়ির পুরনো সাহায্যকারীদের যাওয়ার অনুমতি নেই এখন।মাঝে মাঝে জুলমত গিয়ে ঘরগুলো পরিষ্কার করে দিয়ে আসে তখন সেই পাগল কন্যা কোন এক ঘরে বন্দি থাকে।হায়রে কন্যা!

ইদানিং রাতে ঘুম আসেনা জুলমতের।রমিজ আলী সারারাত নাইট গার্ডের ডিউটি পালন করে,তাই ভোর হবার আগে ঘরে আর আসেনা। জুলমতের গ্রামের কথা মনে হয়,পুকুরঘাট,তার লাউয়ের মাচা সব মনে পড়ে যায়।তার জায়ের বাচ্চা হবে জন্য কতগুলো কাঁথা সে সেলাই করে দিয়েছিল।বাচ্চাটা হবার পর কেউ তাকে কোলে নিতে দেয়নি।এটা ভাবলেই তার চোখ ভরে পানি আসে।ইদানিং জুলমত গভীর রাতে কান্নার শব্দ পায়।হয়তো পাগল মেয়েটা কাঁদে।মাঝেমধ্যে ডাক্তার ম্যাডামের ক্লিনিক থেকে একজন ডাক্তার আসে গভীর রাতে।মেয়েটাকে দেখে চলে যায়।জুলমত আজ পর্যন্ত মেয়েটাকে দেখেনি।তবে শুনেছে খুব সুন্দরী সে।

গেল কদিন জুলমতের খুব একটা সহজ ঠেকছে না কিছুই।যেমন বিনা নোটিশে ডাক্তার ম্যাডাম এ বাড়ির কাজের লোকেদের ছুটি দিয়ে দিলেন।এমনকি ড্রাইভার সালামকে পর্যন্ত ছুটি দিলেন।শুধু থেকে গেল জুলমত আর রমিজ।আবার ম্যাডাম হঠাৎ করে অনেক পুরোনো দুটো শাড়ি  জুলমতের দ্বারা ধুইয়ে নিলেন।এত পুরোনো শাড়ি উনি কেন যত্ন করে ধুলেন জুলমতের মাথায় এলোনা।

৪.

শেষ রাত্রিতে হঠাৎ রমিজ আলী ডিউটি ফেলে ঘরে এলো।জুলমত তো অবাক!রমিজ জানালো গভীর রাতে ক্লিনিক থেকে ডাক্তার সাহেব বাসায় এসেছিলেন।ম্যাডামের নাতনি মনে হয় খুব অসুস্থ।কান্নার শব্দ আসছিল।ম্যাডাম রমিজকে ঘরে চলে যেতে বলায় সে তা পালন করেছে।

জুলমতের মনটা খচখচ করতে লাগলো।কোথায় যেন এক বিড়ালের বাচ্চা শব্দ করে কাঁদছে।জুলমত বিছানা ছেড়ে উঠে এলো।

আধো আলো আধো অন্ধকারে সে দেখলো ম্যাডাম সদর গেট খুলে কোথায় যেন যাচ্ছেন।জুলমত পিছু নিল।

৫.

সবেমাত্র রমিজের চোখটা লেগেছিল।জুলমতের ডাকে ধড়ফড় করে উঠে দেখে জুলমত ব্যাগ গুছিয়ে রেডি।রমিজকে শুধু জানালো কেউ টের পাবার আগেই এই বাড়ি এক্ষুনি ছাড়তে হবে,এক্ষুনি।আর কোন কথা না।

রমিজ কিছু না বুঝেই জুলমতের সাথে সোজা স্টেশন।এতক্ষন সে খেয়াল করেনি জুলমতের সাথে ছোট একটা বাজারের ব্যাগ।

ব্যাগে কি? জিজ্ঞেস করতেই সে যা দেখলো তাতে তার হার্ট ফেইল হওয়া বাকি।একটা ছোট্ট ফুলের মত সদ্যজাত শিশু ঘুমুচ্ছে।রীতিমতো আঁৎকে উঠলো সে।

জুলমত জানালো ডাক্তার ম্যাডাম এই ব্যাগটা ডাস্টবিনের পাশে ফেলেই বাসায় চলে আসে।সে আড়ালে দাঁড়িয়ে সব দেখে।এরপর ম্যাডাম চলে যাওয়ার পর সে ব্যাগের মধ্যে এই বাচ্চাটাকে দেখতে পায়।বাচ্চাটার গায়ে মোড়ানো ম্যাডামের দেয়া সেই পুরোনো নরম শাড়ি যা জুলমত ধুয়ে দিয়েছিল।

জুলমতের কাছে সব পরিষ্কার হয়ে যায়।কেন তার নাতনিকে ঘর বন্দি করে রাখা হয়েছে,কেনই বা পুরোনো কাজের মানুষদের হঠাৎ ছুটি দিয়ে দেয়া হয়েছে।পাপ ও ভুল ঢাকার কত আপ্রাণ চেষ্টা।

জুলমত শক্ত গলায় রমিজ কে বলল,আজ থেইকা এই পোলা তোমার আমার।এক বছর হইলো বাড়ি ছাড়ছি।আজ বাড়ি ফিইরা যামু।হগগল রে কইবা,শহরে আইসা ট্রিটমেন্ট কইরাআমাগো এই পোলা হইসে।তোমাগো বংশধর আইসে।আর কেউ আলাদা করতে পারব না আমাদের।এই শহরে সবাই ভুল করে।কিন্তু এই ভুলের তরে কারও কারও জীবন নতুন হইয়া উঠে।

দূরে ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠে।

রমিজ আলী জুলমতের কোল থেকে সাবধানে তাদের সদ্যজাত পুত্রকে কোলে তুলে নেয় ….নিরাপদে ট্রেনে উঠার জন্য।তার চিরচেনা গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য।