ভালোবাসা নাকি মিথ্যে আশা

লেখালেখির খাতাটাতে বেশ খানিকটা ধুলো জমেছে। লিখতে বসা হয়না বোধহয় বছর খানেক। আজ কী মনে করে যেন সেই খাতাটা নিয়ে বসলো নীলিমা। মনটা এই মুহূর্তে কেমন আছে সেই সম্পর্কে সে নিজেও জ্ঞাত না। হয়তো ভালো; কিংবা কিঞ্চিৎ খারাপ! ভালো না খারাপ, এর হিসেব সে ঠিকঠাক কষতে চায় না। কী হবে মিছেমিছি এসব নিয়ে ভেবে! নিছকই সময় ব্যর্থ। নীলিমা হুটহাটই ডিপ্রেশনে ভুগে। যখন তখনই তার মাথায় উল্টাপাল্টা চিন্তাভাবনা এসে ভর করে। এটা প্রায় বছরের বেশি সময় ধরে চলছে। সারাক্ষণ চুপচাপ থাকে। হাসে না আগের মত। খাওয়া-দাওয়াতেও কেমন অনীহা!
তার এসব অবশ্য পরিবারের কেউই সেভাবে লক্ষ্য করে না। কিংবা লক্ষ্য করলেও গায়ে মাখে না। আমাদের দেশে ডিপ্রেশন যে একটা বড় সমস্যা এটা কেউই মানতে চায়না। হেসেখেলে উড়িয়ে দেয়। ডিপ্রেশন কোন রোগ হলো! কিংবা এই বয়সে ডিপ্রেশন কেন হবে? এমন আচরণ বা মানসিকতা সব সময়ই দেখা যায়। তাই নীলিমাও নিজে নিজেই তার ডিপ্রেশন উপভোগ করে। কাউকে কিছু বলে না।
ধুলোজমা খাতাটা হাতে নিয়ে ধুলো মুছে ফেললো সে। দু-এক পাতা উল্টিয়ে পুরনো লেখায় চোখ বুলালো। এই লেখাগুলো যাকে উৎসর্গ করে লেখা হয়েছিল সে আজ নেই। সে না থাকলেও তাকে নিয়ে লেখাগুলো ঠিকই আছে তারই বিদঘুটে কিছু স্মৃতি নিয়ে। বেশিক্ষণ সেসব লেখায় নজর রাখলো না নীলিমা। চোখ ঝাপসা হবার আগেই সেখান থেকে প্রস্থান করতে হবে। পুরনো স্মৃতিকে এই মুহূর্তে স্থান দিলে চলবে না।
দ্রুত হাতে পাতা উল্টিয়ে সে সাদা কাগজ বের করলো। পাশে রাখা কলম হাতে নিয়ে সাদা কাগজে রাখলো। কী লিখবো? কাকে নিয়ে লিখবো? ভাবতে ভাবতেই মিনিট কয়েক পেরিয়ে গেল। কলম হাতে নিয়ে গড়গড় করে লিখে যাওয়া নীলিমা আজ কেমন বিদীর্ণ চোখে তাকিয়ে ভাবছে কী লিখবে! নিয়তি কেমন অদ্ভুত তাইনা?
বেশ কিছুক্ষণ ভেবেও কিছু মাথায় এলো না তার। সে চোখ বুজে রইলো খানিকক্ষণ। ফোনের মেসেজ টোনের আওয়াজে চোখ মেললো নীলিমা। ফোনের স্ক্রিনে মেসেজের খানিক অংশ জ্বলজ্বল করছে।
“ভালোবাসা কী বলতে পারবে…..!?”
বাকিটুকু পড়ার ইচ্ছে করছে না আর। এতটুকু পড়েই মুচকি হেসে উঠলো সে। চাঁপা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনে মনে বললো,
“ভালোবাসা!”
মিনিট খানেক পরে আবারও সেই আইডি থেকে মেসেজ,
“এইযে গোমড়ামুখি, ব্যস্ত?”
নীলিমা ছোট্ট করে উত্তর দিলো,
“উহু।”
ওপাশ থেকে আবারও মেসেজ আসলো,
“আমি যে সেই দুপুর থেকে অপেক্ষা করছি সেটা কি জানো না?”
নীলিমা আবারও ছোট্ট করে উত্তর দিলো,
“জানি।”
ওপাশ থেকে উত্তর আসলো,
“সব জেনেও কেনো অপেক্ষায় রেখেছো?”
নীলিমা সোজাসাপ্টা বললো,
“আমি অপেক্ষায় রাখছি না। আমার কথা বলতে ভালো লাগছে না।”
নীলিমার এমন জবাবে ছেলেটার মন কিঞ্চিৎ খারাপ হয়ে গেল। সে বললো,
“তবে কী চলে যাবো?”
নীলিমা বললো,
“আপনার ইচ্ছে।”
মিনিট কয়েক আর কোনো মেসেজ আসলো না। ছেলেটি মেসেজ দেখেও আর রিপ্লাই করলো না।
সবকিছু মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে নীলিমা আবারও লিখতে বসলো।
“ভালোবাসা! ভালোবাসা হলো মিথ্যে আশা। মিথ্যে কথা, মিথ্যে কল্পনা, মিথ্যে মায়া, হতাশা, ঘৃণা। যা কেবল একটা মানুষকে জীবিত মৃত করে রাখতে জানে।”
এই কয়েক লাইন লিখতেই আবারো ছেলেটির মেসেজ আসলো।
“আমার উত্তরটা পেলাম না এখনও!”
নীলিমা বললো,
“আমি জানিনা। আপনিই বরং বলুন ভালোবাসা কী!”
ওপাশ থেকে ছেলেটি বেশ আগ্রহ নিয়ে পাঠালো,
“ভালোবাসা মানে হচ্ছে সুন্দর অনুভূতি। পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর শব্দ ভালোবাসা। কাউকে ভালোবাসলে নিজেকে ভীষণই সুখী মনে হয়।”
নীলিমা উত্তরে পাঠালো,
“ওপর প্রান্তের মানুষটি ধোঁকা দেয়ার পরও এমনটা মনে হবে? তখনও এমন সুখী লাগবে?”
ফাহিম নীলিমার মেসেজ দেখে হেসে উঠলো। সে উত্তরে বললো,
“সুখ কী? সুখের অর্থ কী?”
নীলিমা বললো,
“আমি জানিনা।”
ছেলেটি বলল,
“বিরক্ত হচ্ছো?”
নীলিমা এবারও সোজাসাপ্টা বললো,
“কিছুটা।”
মুচকি হেসে ছেলেটি বললো,
“তুমি সারাক্ষণ এমন গোমড়া মুখে কেনো থাকো? এতসুন্দর মুখটা এমন ভার করলে যে আমাদের মত ছেলেদের সাথে ভীষণই অন্যায় হবে সুন্দরী।”
নীলিমা বিরক্ত হয়ে বললো,
“আমি ফ্লার্ট করা পছন্দ করি না। তাছাড়া, আপনি আমাকে এখন দেখতে পাচ্ছেন না। আমার মুখ গোমড়া নাকি হাসিহাসি সেটাও জানার কথা না আপনার।”
ফাহিম আবারও হেসে বললো,
“আমি জানি সেটা। তবে তোমার মেসেজের টাইপিং দেখে আমি নিশ্চিত তোমার মুখ এখন গোমড়া হয়েই আছে। কিঞ্চিৎ রাগান্বিতও বটে!”
নীলিমা মেসেজ সিন করে আর কোনো রিপ্লাই করলো না। ফাহিম নিজে থেকেই পুণরায় মেসেজ করলো,
“সুখ হচ্ছে আপেক্ষিক একটা জিনিস। তুমি নিজেকে সুখী মনে করলেই সুখী, আর দুঃখী মনে করলেই দুঃখী। এইযে সারাক্ষণ দুঃখী দুঃখী একটা ভাব নিয়ে থাকো তোমার দুঃখটা আসলে কীসে?”
নীলিমা এবারও মেসেজের কোনো রিপ্লাই করলো না।
ফাহিম আবারও মেসেজ পাঠালো,
“এভাবে জীবন চলে না মেয়ে। এইটুকু বয়সে এমন দুঃখবিলাস কীসের! কী এমন হয়েছে! কাউকে ভালবেসেছো, সে ছেড়ে গেছে? তো? লাইফে এমন কতই চিটার আসবে! এদের নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে!?”
নীলিমার এবার রাগ হলো। সে বললো,
“এত বেশি কথা বলেন কেনো? আমার ব্যক্তিগত বিষয়ে বলার পারমিশন দিয়েছি? বেশি কথা বললে ব্লক দেবো।”
“সে তুমি দিতেই পারো। তাতে কী হবে? তোমার কোনো লাভ/লস কিছুই হবে না। আর না দুঃখী জীবন সুখের হবে। এসবের কিছু না হলে, তবে ব্লক কেন দিবে!”
নীলিমা এবারও চুপ।
ফাহিম ছেলেটাকে সে চিনে না। হুট করেই একদিন স্প্যাম মেসেজ চেক করতে গিয়ে এই আইডির খোঁজ মিলে।
বেশ কিছু মেসেজ ছিল সেখানে।
কী মনে করে সে সেই মেসেজের রিপ্লাই করে। তারপর থেকেই ছেলেটা একের পর এক মেসেজ দিয়ে যাচ্ছে। আইডিতে তেমন কিছু শেয়ার করা নাই। ছেলেটির পরিচয় কী, বা সে কে সেটাও বোঝার কোনো উপায় নাই। রোজই ব্লক দেবো বলেও ব্লক দিতে পারেনা নীলিমা।
খানিক বাদে আবারও মেসেজ,
“এইযে দুঃখবিলাসি, হারিয়ে গেলে যে!”
নীলিমা উত্তর দিলো,
“আপনি কী চান আমার কাছে?”
ফাহিম বললো,
“তোমাকে ডিপ্রেশন থেকে বের করতে চাই।”
“আমি বলেছি আপনাকে আমি ডিপ্রেশন এ ভুগছি, আমায় উদ্ধার করুণ!”
“না, বলোনি। কিন্তু আমার মনে হয়েছে তোমাকে আমার সাহায্য করা দরকার।”
“কিন্তু আমার কোনো দরকার নাই।”
“আমার যে আছে।”
“প্রায় একমাস হতে চললো আপনি আমাকে বিরক্ত করছেন। কেনো এভাবে পেছনে পড়ে আছেন বলুন তো?”
“কল করি?”
রোজই ছেলেটি কল করতে চায় আর নীলিমা এড়িয়ে যায়। আজ সে ছেলেটির পরিচয় জানার আগ্রহ নিয়ে বললো,
“ওকে।”
মেসেঞ্জারে কল আসলো। নীলিমা “হ্যালো” বলতেই ওপাশ থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠে ভেসে আসলো,
“নীল।”
কন্ঠটা কানে বাজতেই নীলিমা কল কেটে দিলো। তার হাত -পা কাঁপছে। হৃদস্পন্দন দ্রুত গতিতে চলতে শুরু করেছে।
ওপাশ থেকে মেসেজ আসলো,
“কল কাটলে যে?”
নীলিমা আর কোনো রিপ্লাই করলো না। এর উত্তরে সে কী বলবে জানেনা। কী বলা উচিত সেটাও সে জানেনা। মাঝের বছর কয়েকের ব্যাবধানে সে সব কথা যেন হারিয়ে ফেলেছে। জীবনকে যেন সেই কবেই থমকে দিয়েছে। থমকে যাওয়া জীবনকে পুনরুজ্জীবিত করতে চায় না সে। যে স্বইচ্ছায় চলে গেছে, যাকে নির্বাক্যে সে যেতে দিয়েছে; তার সাথে পূনরায় আর কোনো কথা থাকে না। নীড় হারা পাখি যে আর কখনো গন্তব্যে ফিরে আসে না সেটা নীলিমা ভালো করেই জানে।


