বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ২০ মে, ২০২৬
স্পটলাইট

তেত্রিশ বছর পেরিয়েও ইয়াসমিনের বাড়ি ফেরা হলো না

WhatsApp Image 2025-08-25 at 7.22.27 PM

তেত্রিশ বছর কেটে গেছে; ইয়াসমিনের আর বাড়ি ফেরা হয়নি। ইয়াসমিন বাড়ি না ফিরলেও তার বাড়ি ফেরার আকুতি, রাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক আচরণ এবং তৎপরবর্তী ঘটনা দেশের নারীসমাজের জন্য প্রতিবাদের বার্তা বহন করে চলেছে। ১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট কতিপয় পুলিশ সদস্য দিনাজপুরের কিশোরী ইয়াসমিনকে ধর্ষণ ও হত্যা করে। এর প্রতিবাদে আন্দোলনে নামলে জনতার ওপর গুলিও চালায় পুলিশ; নিহত হন শিশুসহ সাতজন। আহত হন অনেকে। সেই থেকে দিনটি ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ বা ‘ইয়াসমিন দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। দিবস পালিত হলেও নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা কমেনি; উপরন্তু বেড়েছে। বর্তমান সময়ে নির্যাতনের ভয়ংকর পরিস্থিতি থেকে আমাদের তখনই মুক্তি মিলবে যখন দেশের প্রত্যেক নাগরিকের মধ্যে মানবিক ও জেন্ডার সংবেদনশীল সংস্কৃতির বিকাশ ঘটবে। আর তা সম্ভব রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।

তেত্রিশ বছর আগের ঘটনাটি যাঁরা ভুলে গেছেন, তাদের মনে করিয়ে দিই। দিনাজপুর শহরের রামনগর এলাকার রিকশাচালক এমাজ উদ্দিন ও শরিফা বেগমের একমাত্র কন্যা ইয়াসমিন বেগম। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখার পর সে অভাবের তাড়নায় মাত্র ১২ বছর বয়সে ১৯৯২ সালে গৃহপরিচারিকার কাজ করতে ঢাকায় আসে। ধানমন্ডির একটি বাসায় গৃহকর্তা তাকে পূজার ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার কথা বলেন। কিন্তু টানা তিন বছর পর মাকে দেখতে পাওয়ার আকুতিতে পূজা পর্যন্ত অপেক্ষার ধৈর্য ছিল না ইয়াসমিনের। ঠিক যেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প ‘ছুটি’র ফটিকের মতো। যেখানে ফটিক স্বভূমিচ্যুত হয়ে নাগরিক পরিবেশে নিজেকে বিচ্ছিন্ন ভাবতে শুরু করে। সেখানকার প্রতিকূল পরিস্থিতি ও প্রীতিহীন পরিবেশ তাকে অস্থির করে তোলে। অবশেষে বর্ষাস্নাত দিনে জ্বরাক্রান্ত শরীরে বাড়ি যাবে বলে বেরিয়ে পড়ে ফটিক।

প্রসঙ্গত, বছরের পর বছর গৃহশ্রমিকের আপন পরিবেশ ও ঘনিষ্ঠজনদের থেকে বিচ্ছিন্নতা পূরণ করার দায়িত্ব নাগরিক সমাজের। কেননা, তাদের শহুরে জীবনকে আরও আরামদায়ক ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করার জন্যই দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে অভাবতাড়িত শিশু, কিশোরী ও নারীদের গৃহশ্রমিক নিয়োগ করা হয়। নিজের সন্তানের পাশে থাকা মা-বাবা থেকে সহস্র মাইল দূরে কিশোরী গৃহশ্রমিকের প্রতি মায়া-মমতার বহিঃপ্রকাশ কি খুব কঠিন কাজ?

১৯৯৫ সালের  ২৩ আগস্ট  গৃহকর্তার ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে কাউকে কিছু না জানিয়ে একাই বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়ে যায় ইয়াসমিন। উঠে পড়ে দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁওগামী নৈশকোচে। রাত ৩টার দিকে দিনাজপুরের দশমাইল মোড়ে নামে। ক্যালেন্ডারের পাতায় ততক্ষণে ২৪ আগস্ট। সেখানে টহলরত পুলিশের কয়েক সদস্য দিনাজপুরের দশমাইল মোড় থেকে শহরের রামনগরে তার মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে ভ্যানে তুলে নেয়। তারপর তাকে ধর্ষণ ও হত্যা করে রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দেয়। ইয়াসমিনের লাশ ভোরে রানীগঞ্জ মোড়ে ব্র্যাক অফিসের সামনে পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতারা তাকে পতিতা ‘বানু’ বানানোর অপচেষ্টা করে। একজন পরিচিত বালিকাকে ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ ও ‘পতিতা’ বানানো, তাকে সর্বসমক্ষে বেআব্রু করা, গোসল ও জানাজা ছাড়া লাশ দাফন, কবরে পাহারার ব্যবস্থা নেওয়া, বানুকে মেরে কবরের লাশ বদলের পাঁয়তারা ইত্যাদি বিষয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের রহস্যময় আচরণ জনমনে কৌতূহল ও বিক্ষোভ শতগুণ জাগিয়ে তোলে।

সব চক্রান্ত নস্যাৎ করে অভূতপূর্ব জনপ্রতিরোধ গড়ে ওঠে দিনাজপুরে। সামু, কাদের, সিরাজ, গোলাপ, নান্নু, জুলহাস, একজন শিশুসহ শহীদ হন সাতজন। প্রথম ময়নাতদন্তে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া না গেলেও আন্দোলনের মুখে দ্বিতীয়বারের জন্য মরদেহ উত্তোলন করা হয়। অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। বিচারের মাধ্যমে তারা আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল। ঘটনার ৯ বছর পর অর্থাৎ ২০০৪ সালে তিন পুলিশ সদস্যকে ফাঁসি দেওয়া হয়। কিন্তু আজও এই প্রতিরোধ আন্দোলনে শহীদদের বিচারের মামলাটি স্থবির।

ইয়াসমিনকে পুলিশ হেফাজতে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার ৩০ বছর পার হলেও রাষ্ট্রীয় কাঠামো, আইন, নীতিমালা ও মনোভাবের কি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে? ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যা, আন্দোলন, বিচার প্রক্রিয়া সত্ত্বেও পুরুষতান্ত্রিক প্রশাসনের কাছে ইয়াসমিন যেন ‘ট্যাবু’ হয়েই রয়েছে। যেমন, ২০২৩ সালে ‘আমি ইয়াসমিন বলছি’ নামে একটি সিনেমা নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন সুমন ধর। কিন্তু প্রভাবশালী এক পুলিশ কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে সিনেমার কাজই শুরু করতে পারেননি। অবশেষে গত বছর সেপ্টেম্বরে, গণঅভ্যুত্থানের পর কাজটি শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন পরিচালক। কতদূর পারবেন, দেখা যাক!
দুর্ভাগ্যজনক, দেশ ও সমাজ আধুনিক হয়েছে; দেশে নানান উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু এখনও নারী নির্যাতন কমেনি, বরং বেড়েছে। এমনকি অভিযুক্ত নারীকে রিমান্ডে নিয়ে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন, এমনকি হত্যার ঘটনাও ঘটছে। যেমন ২০২৩ সালে নওগাঁয় র‌্যাব হেফাজতে সুলতানা জেসমিন প্রাণ হারিয়েছেন। ২০২১ সালে বরিশালে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারকৃত অভিযুক্ত এক নারী অভিযোগ করেন, দু’দিনের পুলিশ রিমান্ডে থাকাকালে তিনি যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০২৪ সালে পুরান ঢাকায় পুলিশের নির্যাতনে বডিবিল্ডার ফারুক হোসেনের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীকে আপত্তিকর প্রস্তাব দিয়েছিল পুলিশ।

জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন-২০১৩ প্রণয়ন করে। কিন্তু এ আইনের প্রয়োগ নেই বললেই চলে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে যে কটি কমিশন গঠন করেছে, তার মধ্যে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন অন্যতম। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে জমা দেওয়া নারী সংস্কার কমিশনের সুপারিশে আপত্তি জানিয়ে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন বাতিল চেয়েছে হেফাজতে ইসলাম। এমনকি জুলাই চেতনায় উজ্জীবিত তরুণ দলের সামনের সারির নেতাকেও ইসলামী দলের সমাবেশে অংশগ্রহণ এবং নারী সংস্কার কমিশন নিয়ে কথা বলতে শোনা যায়। যে অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানে দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন, তার অন্যতম অংশীদার হলো সরকারি ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা। কিন্তু সেই নারীর সমানাধিকার প্রসঙ্গে সুপারিশ করলে তা ‘ধর্মদ্রোহী’ হয়ে ওঠে। সমাজের এই অংশকেও তো আমরা অস্বীকার করতে পারি না। 

সমাজের এই যে পশ্চাদ্‌গামিতা, জেন্ডার অসংবেদনশীলতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করার ব্যর্থতা, যা নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। সে থেকে উত্তরণে দরকার একটি বহু স্তরভিত্তিক পরিকল্পনা। যে পরিকল্পনার অংশীদার হবে রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক।
সামনে নির্বাচন। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে এ বিষয়ে পরিকল্পনা কী– সেই মর্মে লিখিত প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন। প্রয়োজন আত্মিক সংযোগের, যে সংযোগ ইয়াসমিনকে ধর্ষণ ও হত্যার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছে আর স্বাধীনতা এবং মুক্তিকামী মানুষদের আলোর দিশা হয়ে পথপ্রদর্শন করছে।