শিশুরা পরিবারে কি আসলেই নিরাপদ

একটি শিশু জন্মগ্রহণের পর পরিবারই শিশুটির আশ্রয়স্থল। ছোট থেকে একটি শিশু ধীরে ধীরে যখন বেড়ে ওঠে তখন পরিবারই তার একমাত্র জায়গা যেখান থেকে সে সবকিছু শিখে। শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশ সবকিছুই পরিবারের উপর নির্ভর করে আসলে শিশুর প্রতি পরিবার কি রকম মনোভাব পোষণ করছে।
বর্তমানে দেশে শিশু নির্যাতনের হার দিনদিন বেড়েই চলছে। বাবা-মা ও নিকটাত্মীয়ের হাতেও নির্যাতিত হচ্ছে। এমনকি তাঁদের হাতে শিশুহত্যার মতো ঘটনাও ঘটেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, গত সাত মাসে নির্যাতনের শিকার হয় ৬৪০টি শিশু। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের প্রতি ১০জনে ৯ জন তার পরিবার কর্তৃক কোনো না কোনো সহিংসতার শিকার।
২০২৫ সালের ১১ মার্চ প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত আট বছরে অন্তত তিন হাজার ৪৩৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়, যাদের বয়স ছয় বছরেরও কম। বাংলাদেশ মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের হিসাবমতে, ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই শিশু নির্যাতনকারী শিশুটির পরিচিত বা নিকটাত্মীয় হয়ে থাকে। তুচ্ছ ঘটনায় পারিবারিক কলহের রোষানলে পড়ে শিশুরা হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে নিজ পরিবারের লোকদের দ্বারা। একটি পরিবারে যখন শিশুর সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত হওয়ার কথা, সেখানেই তারা অনিরাপদ।
একসময় সামাজিক রীতিনীতি ও পারিবারিক মূল্যবোধ সামাজিক নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করত। কিন্তু কালের পরিক্রমায়, যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভেঙে যাওয়া এবং দ্রুত নগরায়ণের প্রভাবে মানুষের মধ্যে বিষণ্নতা, একাকিত্ব বাড়ছে। পারিবারিক জীবনে ধৈর্য আর সহনশীলতার বোধ হারিয়ে গেছে। ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি আর আত্মকেন্দ্রিকতায় অনেকে বেড়ে উঠছেন। যার প্রভাব পড়ছে পরিবারের শিশুদের ওপর। অভিভাবকদের অনেক আচরণ শিশুদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই যুগে আমরা নিজেদের যতই আধুনিক মনে করি কিন্তু মানবিকতার বিকাশে দিন দিন পিছিয়ে পড়ছি। পারিবারিকভাবে নির্যাতনের শিকার শিশুর মাঝে পরবর্তী জীবনে আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়। যা তাদের ব্যক্তিত্বের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
একটি শিশু তার পরিবারের সদস্যদের থেকে স্বাভাবিকভাবে আদর, ভালোবাসা, যত্ন কামনা করে। যখন তারা এসব থেকে বঞ্চিত হয় তখন তাদের সৃজনশীলতা ধীরে ধীরে বিনষ্ট হতে শুরু করে। এ জন্য প্রত্যেক শিশুরই সুস্থ ও স্বাভাবিক পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা দরকার।
শুধু শিশুদের ভরণ-পোষণ আর লেখাপড়ার দায়িত্ব নিলেই অভিভাবকদের কর্তব্য শেষ হয়ে যায় না বরং প্রতিটি পরিবারের উচিত শিশুদের প্রতি যত্নশীল হওয়া। সে জন্য দরকার একটি সুস্থ-স্বাভাবিক পারিবারিক পরিবেশ। বর্তমানে নানা প্রকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ থেকে মানুষের মাঝে বেড়েছে হতাশা। এসবের প্রভাব অনেক সময় পরিবারের শিশুদের উপর পড়ে।
পরিবারে শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কি করতে হবে?
সচেতনতা ও মনোভাব পরিবর্তন
শিশু কোনো সম্পত্তি নয়, বরং স্বাধীন ব্যক্তি—এই উপলব্ধি অভিভাবক ও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে। ভুল করলে শাস্তির পরিবর্তে ভালোভাবে বুঝাতে হবে। বোঝানোর মাধ্যমে শিশুকে শাসন করা উচিত।
আইন সম্পর্কে জানতে হবে
প্রতিটি পরিবারকে শিশু অধিকার সনদ (CRC) এবং বাংলাদেশের শিশু অধিকার সম্পর্কিত আইন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। প্রতিটি পরিবারকে জানাতে হবে শিশুর উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
শিশুর কথাগুলো গুরুত্ব দেওয়া
শিশুর কথা মন দিয়ে শোনা উচিত প্রতিটি অভিভাবকের। তাঁরা আসলে কি বলতে চাচ্ছে বা কি বুঝাতে চাচ্ছে এসব বুঝা উচিত।
একটি শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তার সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার নিশ্চয়তাদানের দায়িত্ব পরিবারের। তাই পরিবারকে শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শিশুরা যাতে পরিবার কর্তৃক হেনস্তার শিকার না হয় এ দিকে খেয়াল রাখতে হবে। শিশুদের সুরক্ষা এবং পারিবারিক সহিংসতা রোধে আইন প্রয়োগে রাষ্ট্রকেও কঠোর হতে হবে যাতে শিশুটির জন্য পরিবারই যেন নিরাপদ স্থান হয়ে ওঠে।



