বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬
নারী

‘গণপরিবহনে নারী, প্রতিদিনের যাত্রায় কতটা সুরক্ষা?’

WhatsApp Image 2025-08-19 at 7.37.31 PM

সকালের ব্যস্ত সময়। শহরের রাস্তায় একের পর এক গাদাগাদি ভরা বাস ছুটে চলেছে। ফুটপাথে ভিড় ঠেলে অনেক নারী দাঁড়িয়ে আছেন, কেবল বাসে ওঠার জন্য। কেউ অফিসগামী, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, কেউবা শিশু কোলে কর্মজীবী মা। বাসের দরজা খুললেই শুরু হয় ঠেলাঠেলি—অপরিচিত পুরুষের ভিড়ে নিজেদের শরীর বাঁচিয়ে উঠতে হয় ভেতরে। সিট পাওয়া তো দূরের কথা, দাঁড়ানোর সামান্য জায়গাটুকুও অনেক সময় হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ। কখনো অচেনা হাতের অস্বস্তিকর স্পর্শ, কখনো কটু কথা কিংবা ইচ্ছাকৃত ধাক্কা— সব মিলিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত যেন এক অঘোষিত লড়াই।

গণপরিবহন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রধান ভরসা। কিন্তু নারীদের জন্য এই ভরসার ভেতর লুকিয়ে থাকে প্রতিদিনের ভয়ের গল্প। অফিসে যাওয়ার পথে, বাজারে নামতে গিয়ে কিংবা সন্তানকে নিয়ে যাত্রার সময়—প্রায় প্রতিটি নারীই কমবেশি হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর সঙ্গে যোগ হয় যানজট, নিরাপদে ওঠা-নামার ঝুঁকি আর শারীরিক মানসিক চাপ।

তবে সব ছবিই যে অন্ধকার, তা নয়। নতুন পরিবহন ব্যবস্থা যেমন মেট্রো রেল নারীর জন্য কিছুটা হলেও নিরাপদ আশার আলো দেখিয়েছে। শৃঙ্খলাবদ্ধ পরিবেশ, আলাদা কোচ ও আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে এখানে যাত্রীরা তুলনামূলক স্বস্তি অনুভব করেন। কিন্তু রাজধানী ছাড়াও সারা দেশের চিত্র কি বদলেছে?

গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা আজ একটি বড় আলোচনার বিষয়। প্রতিদিনের এই যাত্রায় কোথায় লুকিয়ে আছে ঝুঁকি, কোথায় এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন আর ভবিষ্যতে কেমন হতে পারে নিরাপদ পরিবহনের রূপরেখা—এই নিয়েই আমাদের অনুসন্ধান। চলুন জেনে নেয়া যাক গণপরিবহনে নারীদের পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তার বিষয়গুলো।

ভ্রমণের শুরুতেই ভীতি

প্রতিদিনের মতো কর্মজীবী, ছাত্রী কিংবা গার্মেন্টসকর্মীরা সকালে বাসের লাইনে দাঁড়ান। চোখে-মুখে ক্লান্তি থাকলেও ভেতরে লুকানো থাকে এক অদৃশ্য ভয়। বাসে ওঠা মানেই যাত্রার শুরুর সঙ্গে শুরু হয় মানসিক চাপ—কোথাও হাত বাড়াবে না তো, অশোভন মন্তব্য শুনতে হবে না তো, নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে তো?

ভিড়ের ভেতরে অস্বস্তিকর বাস্তবতা

ঢাকার গণপরিবহন মানেই অতিরিক্ত ভিড়। সেই ভিড় নারীদের জন্য হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। ভিড়ের আড়ালে ঘটে যাওয়া স্পর্শকাতর মুহূর্তগুলো অনেক সময় প্রকাশ্য অপরাধ হলেও ভিড়ের অজুহাতে এগুলোকে স্বাভাবিক করে ফেলা হয়। শরীর ঘেঁষে দাঁড়ানো, ইচ্ছে করে ধাক্কা দেওয়া কিংবা নির্লজ্জ হাত বাড়িয়ে দেওয়া—এসব নারীদের প্রতিদিনকার বাস্তবতা।

কথার আঘাতও কম ভয়াবহ নয়

শারীরিক হয়রানির পাশাপাশি মৌখিক আক্রমণ নারীর মানসিক জগতে গভীর ক্ষত তৈরি করে। কেউ কেউ বাসে উঠেই শুনতে পান বাজে মন্তব্য, বাঁকা কথা, কিংবা কানে কানে সিটি বাজানো। অনেকে ভয়ে বা লজ্জায় প্রতিবাদ করেন না। কিন্তু ভেতরে জমতে থাকে আতঙ্ক আর ক্ষোভ।

আসনের অভাব ও অনিরাপদ যাত্রা

গণপরিবহনে নারীদের জন্য নির্ধারিত আসনের সংখ্যা নগণ্য। অল্প কয়েকটি আসন দ্রুত ভরে যায়, বাকিদের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বিশেষ করে রাতে বা নির্জন স্টপেজে বাস থেকে নামার সময় নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। অনেকেই বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহন বা ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন, যেখানে ঝুঁকির মাত্রা ভিন্নভাবে উপস্থিত থাকে।

রাতে যাতায়াতের ভীতি

অফিস বা কর্মস্থল থেকে দেরি করে ফেরা অনেক নারীর জন্য এখনো দুঃস্বপ্নের মতো। রাতের পরিবহনে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নেই, রাস্তার ফাঁকা পরিবেশে নারীরা সহজেই টার্গেট হয়ে যান। নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা থাকা সত্ত্বেও রাতের যাতায়াত এখনো ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন অনেকে।

চালক ও হেলপারের অসহযোগিতা

অনেক সময় দেখা যায়, নারী যাত্রীরা উঠতে চাইলে চালক বাস থামাতে অনীহা প্রকাশ করেন। আবার নেমে যাওয়ার সময় পর্যাপ্ত সময় না দেওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়। কিছু ক্ষেত্রে হেলপার বা চালকের অশোভন আচরণও নিরাপত্তাহীনতার একটি বড় কারণ।

আইন ও সহায়তা সেবার সীমাবদ্ধতা

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন থাকলেও, গণপরিবহনে তা প্রয়োগ অনেক সময় দুর্বল। হেল্পলাইন (৯৯৯) ও পুলিশের মোবাইল অ্যাপ থাকলেও নারীরা সব সময় সেসব ব্যবহার করতে পারেন না, বিশেষ করে চলন্ত বাসে।

আশার আলো মেট্রো রেল

দীর্ঘদিন ধরে নারীরা গণপরিবহনে যাতায়াতের ক্ষেত্রে ভোগান্তি, হয়রানি আর নিরাপত্তাহীনতাকে যেন ভাগ্যের মতো মেনে নিয়েছিলেন। প্রতিদিন অফিসগামী নারী, ছাত্রী কিংবা গৃহিণীরা বাসে উঠে অনিশ্চয়তায় থাকেন—আজ কী ঘটতে পারে? নিরাপদে পৌঁছানো যাবে তো? কিন্তু এই দীর্ঘ অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে রাজধানীতে নতুন এক যাতায়াত ব্যবস্থা খুলে দিয়েছে ভিন্ন দিগন্ত।

মেট্রো রেল শুধু সময় বাঁচাচ্ছে না, বরং নারীর যাত্রায় ফিরিয়ে এনেছে সেই কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা আর স্বস্তি। এখানে ভিড় আছে ঠিকই, কিন্তু নেই ধাক্কাধাক্কি বা অনাকাঙ্ক্ষিত দৃষ্টি। প্রতিটি কোচে নিয়মতান্ত্রিকতা, আলাদা নারী কোচ, সিসিটিভি ক্যামেরা আর শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ নারীদের জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে। অনেক নারীই বলছেন, তাঁরা প্রথমবারের মতো নিশ্চিন্ত মনে গণপরিবহন ব্যবহার করছেন।

গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তায় উদ্যোগ আছে, কতটা কার্যকর?

নারী বাস সার্ভিস, সীমিত সমাধান

ঢাকায় কিছু রুটে নারী যাত্রীদের জন্য আলাদা বাস চালু আছে। বিশেষ করে অফিসগামী নারীরা এতে কিছুটা স্বস্তি পান। তবে সমস্যার জায়গা হলো— এই বাসের সংখ্যা অতি সামান্য। ব্যস্ত সময়ে নারী বাস খুঁজে পাওয়া কঠিন, আর শহরের বাইরের রুটগুলোতে তো এমন সেবা প্রায় নেই। ফলে নারী বাস সার্ভিসের প্রভাব সীমিত পরিসরেই আটকে আছে।

আলাদা আসনের ব্যবস্থার নিয়ম থাকলেও প্রয়োগ দুর্বল

আইন অনুযায়ী সব বাসেই নারীদের জন্য নির্দিষ্ট আসন থাকতে হবে। বাস্তবে দেখা যায়—অften পুরুষ যাত্রীরা এসব আসনে বসে পড়েন। কন্ডাক্টর বা ড্রাইভার অনেক সময় উদাসীন থাকেন, আবার কেউ কেউ প্রতিবাদ করলে উল্টো ঝামেলায় জড়ান। ফলে আসনের এই সুবিধা নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে প্রথাগত একটি “টিক মার্ক” হয়ে গেছে।

প্রযুক্তির ব্যবহার, সিসিটিভি ও জিপিএসের বাস্তবতা

বাংলাদেশে গণপরিবহনে সিসিটিভি বা জিপিএস বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা খুব সীমিত। কিছু নতুন এসি বাসে সিসিটিভি থাকলেও অধিকাংশই সচল থাকে না। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় ক্যামেরাগুলো কেবল দেখানোর জন্য বসানো হয়েছে বলা যায়। জিপিএস থাকলেও তা যাত্রী নিরাপত্তার চেয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বেশি ব্যবহৃত হয়।

হেল্পলাইন ৯৯৯ এ সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা

জরুরি সেবার জন্য ৯৯৯ একটি বড় উদ্যোগ। যেকোনো হয়রানির ঘটনায় নারী ফোন করলে পুলিশ সহযোগিতা দেয়। তবে বাস্তবে সমস্যাও আছে। অনেক নারী জানেন না কিভাবে ৯৯৯ ব্যবহার করবেন। তাছাড়া চলন্ত বাসে কিংবা ভিড়ের মধ্যে ফোন করা সবসময় সম্ভব হয় না। আবার কল রিসিভ ও পদক্ষেপ নিতে দেরি হলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়।

মহিলা পুলিশ ও নজরদারি টিমের সীমিত উপস্থিতি

ঢাকার কিছু ব্যস্ত স্টপেজে মাঝে মাঝে মহিলা পুলিশ মোতায়েন করা হয়। তাদের উপস্থিতি নারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, হয়রানিকারীরাও সাবধান থাকে। কিন্তু এই ব্যবস্থা নির্দিষ্ট জায়গা ও নির্দিষ্ট সময়ে সীমিত। রাতে কিংবা কম ব্যস্ত স্টপেজে এমন সহায়তা সাধারণত পাওয়া যায় না।

ড্রাইভার-হেলপার প্রশিক্ষণের অনুপস্থিত উদ্যোগ

বাসে নারী যাত্রীরা অনেক সময় ড্রাইভার বা হেলপারের কাছ থেকেও অশোভন আচরণের শিকার হন। অথচ তাদের জন্য আলাদা কোনো আচরণগত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নেই। অনেক এনজিও ছোট পরিসরে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালালেও তা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়নি। ফলে গণপরিবহন কর্মীরা নারীর নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতন নন।

সামাজিক সচেতনতা ক্যাম্পেইনে পোস্টার আছে, প্রভাব কম

ঢাকার কিছু বাসে বা স্টপেজে লেখা থাকে “নারী নির্যাতন আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।” কিন্তু যাত্রী বা কর্মীরা সেটাকে গুরুত্ব দেন না। ক্যাম্পেইনগুলো ধারাবাহিক ও প্রভাবশালী না হওয়ায় এগুলো কার্যকর হচ্ছে না। গণপরিবহনে যাত্রীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এ ধরনের ক্যাম্পেইন কেবল পোস্টারেই সীমাবদ্ধ থাকে।

মোবাইল অ্যাপে উদ্যোগের অভাব

ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে নারীদের জন্য বিশেষ অ্যাপ চালু আছে, যেখানে বিপদে পড়লে এক ক্লিকে পুলিশ ও পরিবারের কাছে অবস্থান পাঠানো যায়। বাংলাদেশে কয়েকটি স্টার্টআপ চেষ্টা করলেও সেগুলো জনপ্রিয় হয়নি। সরকারের তরফ থেকে এখনো কোনো জাতীয় পর্যায়ের “নারী নিরাপত্তা অ্যাপ” চালু হয়নি।

আলো ও অবকাঠামো, ভয়ের আরেক নাম

রাজধানীসহ সারা দেশে অধিকাংশ বাসস্টপে পর্যাপ্ত আলো নেই। রাতের বেলা অন্ধকার স্টপেজে নেমে যাত্রীরা ভয়ের মধ্যে থাকেন। অনেক স্টপেজ নির্জন বা অপর্যাপ্তভাবে ডিজাইন করা, যা নারীদের ঝুঁকিতে ফেলে। অথচ সামান্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন (যেমন আলো বসানো, সিসিটিভি যুক্ত স্টপেজ) হলে নিরাপত্তা অনেকটাই বাড়তে পারত।

আইনগত সুরক্ষায় কাগজে-কলমেই বেশি

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসহ একাধিক আইন আছে, কিন্তু গণপরিবহনে বাস্তব প্রয়োগ সীমিত। হয়রানিকারীরা প্রভাবশালী হলে বা ছোটখাটো অপরাধ করলে পুলিশি ব্যবস্থা অনেক সময় নেওয়া হয় না। মামলা করতেও ভুক্তভোগী নারীরা অনিচ্ছুক, কারণ লজ্জা, ঝামেলা আর দীর্ঘসূত্রতা তাদের নিরুৎসাহিত করে। ফলে আইন থাকলেও নিরাপত্তা আসে না।

নারীর যাত্রা কখনো কেবল গন্তব্যে পৌঁছানোর বিষয় নয় বরং এটি তাদের স্বাধীনতা, আত্মবিশ্বাস ও মর্যাদার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। মেট্রো রেলের মতো উদ্যোগ আশা জাগায়—প্রতিদিনের ভয়ের মধ্যে একটি নিরাপদ জায়গা তৈরি করে। কিন্তু স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে, আমাদের প্রয়োজন শুধু আধুনিক প্রযুক্তি নয়, বরং সচেতন সমাজ, কার্যকর আইন এবং নারী-বান্ধব পরিবহনের সুসংহত নীতি।

গণপরিবহন হতে পারে নারীর জন্য নিরাপদ, আর সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আমাদের প্রত্যেকের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। আজকের নতুন প্রজন্মের নারীরা যেন ভয়ে নয়, স্বাচ্ছন্দ্যে রাস্তায় চলতে পারেন, এটাই হবে সত্যিকারের অগ্রগতি।