বাংলা সাহিত্যের শেকড়সন্ধানী স্রষ্টা নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন

নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের ৭৬তম জন্মবার্ষিকী আজ। উপনিবেশিক সাহিত্যধারার বিপরীতে দাঁড়িয়ে বাংলা নাটককে আবহমান বাংলার গতিধারায় ফিরিয়ে এনেছিলেন প্রখ্যাত এ নাট্যব্যক্তিত্ব।
বাংলা নাটকের স্বপ্নস্রষ্টা নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন বাংলা নাটককে নিয়ে গিয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়। পাশ্চাত্য ছোঁয়া থেকে বেরিয়ে এসে এদেশের মাটি ও মানুষের ভেতর থেকে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন নাটকের প্রাণ।
স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে বাংলা নাটকের যে আন্দোলন, তার পেছনেও সেলিম আল দীনের গুরুত্ব অপরিহার্য। তিনি প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের শেকড়ের সন্ধানে মগ্ন ছিলেন। রবীন্দ্রপরবর্তী যুগের সবচেয়ে শক্তিশালী নাট্যজন হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন সেলিম আল দীন।
নাট্যকার সেলিম আল দীন ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ আগস্ট ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার সেনেরখীল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মফিজউদ্দিন আহমেদ ও ফিরোজা খাতুনের তৃতীয়সন্তান তিনি। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ফেনী, চট্টগ্রাম, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও রংপুরের বিভিন্নস্থানে। বাবার চাকরির সূত্রে এসব জায়গার বিভিন্ন স্কুলে পড়াশোনা করেছেন তিনি।
ছোটবেলা থেকেই বইপড়ার প্রতি ছিল তার চরম ঝোঁক। তাই দূরে-কাছে নতুন বই দেখলেই পড়ে ফেলতেন এক নিমিষেই। ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর লেখক হওয়ার বিষয়ে পাকাপোক্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই নাটকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন সেলিম আল দীন, যুক্ত হন ঢাকা থিয়েটারে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষে যোগ দেন বিজ্ঞাপনী সংস্থা বিটপীতে কপিরাইটার হিসেবে।
১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ওই বছরই বেগমজাদী মেহেরুন্নেসার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। তাদের একমাত্র সন্তান মইনুল হাসানের মৃত্যু হয় অল্প বয়সেই।
মধ্যযুগের বাংলা নাট্যরীতি নিয়ে গবেষণা করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন সেলিম আল দীন। বাংলাদেশে একমাত্র বাংলা নাট্যকোষের প্রণেতা তিনি। এছাড়া আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণকেন্দ্রিক নিও এথনিক থিয়েটারেরও তিনি উদ্ভাবনকারী।
১৯৮৯ সালে মানিকগঞ্জ জেলার হরগজে সংঘটিত প্রলয়ংকারী টর্নেডোর অভিজ্ঞতা নিয়ে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন হরগজ রচনা করেন। নাটকটি টর্নেডোর পর উদ্ধারকারী দলের অভিজ্ঞতা ও আকৃতির জগৎ থেকে হঠাৎ নিরাকৃতির জগতে তাদের উপস্থিতি ও পরিণতি নিয়ে আবর্তিত।
তার রচিত আতর আলীদের নীলাভ পাট, কীত্তনখোলা, কেরামতমঙ্গল, যৈবতী কন্যার মন, বনপাংশুল, চাকা, ধাবমান, স্বর্ণবোয়াল, পুত্রসহ অসাধারন মনোজাগতিক নাটক রচনা করে বাংলা সাহিত্য জগতকে করেছেন সমৃদ্ধ।
সেলিম আল দীন ২০০৮ সালের ১৪ জানুয়ারি ঢাকায় মারা যান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চিরশায়িত আছেন সাহিত্যের এ মানসপুত্র।


