বেডরুম থেকে ব্যবসায়িক ব্র্যান্ডের যাত্রা

দিনাজপুর শহরের পশ্চিম রামনগরে ঘরে বসে তৈরি হচ্ছে একেকটি রঙিন স্বপ্ন ‘ ড্রিমক্যাচার’। একপাশে কাজ শিখিয়ে দিচ্ছেন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক শামীমা নাছরিন অন্যপাশে ব্যস্ত হাতে কাজ করছেন স্কুল–কলেজ পড়ুয়া তরুণীসহ ২০ জনের বেশি নারী। এ দৃশ্য এখন নিয়মিত ‘চতুর্ভুজ’ নামের এই হস্তশিল্প কারখানায়।
ছোট ছোট রঙিন ফিতা দিয়ে মোড়ানো ধাতব রিং, সুই-সুতা দিয়ে মাঝখানে জালের মতো নকশা, তার উপর বুনন, পালক ও পুঁতির শোভা। সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে একেকটি নান্দনিক ড্রিমক্যাচার। শোবার ঘর, ড্রয়িংরুম, কিংবা বারান্দার দেয়ালে ঝুলিয়ে ঘরের সৌন্দর্য বাড়াতে এই পণ্যের কদর দিন দিন বাড়ছে।
২০২০ সালের করোনা মহামারির সময় ঘরবন্দী শামীমা নাছরিনের মনে জেগেছিল নতুন কিছু করার তাগিদ। ছোটবেলায় মায়ের কাছে শিখে রাখা সুই-সুতা ও কুশিকাঁটার কাজ কাজে লাগিয়ে ঘরে বসেই শৌখিন পণ্য তৈরির হাতেখড়ি হয় তাঁর। পরে অনলাইনে ড্রিমক্যাচারের ছবি দেখে মন থেকে কাজটি শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। স্বামীর কাছ থেকে তিন হাজার টাকা ধার নিয়ে ড্রিমক্যাচারের উপকরণ কিনে তৈরি করেন কয়েকটি নমুনা। ছবি তুলে ফেসবুকে আপলোড করেন। সাড়া আসে দ্রুত। প্রথম বিক্রি হয় দুই হাজার টাকার পণ্য। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাঁকে।
বর্তমানে দিনাজপুর শহরে গড়ে তুলেছেন ‘ চতুর্ভুজ’- এর কারখানা ও অফিস। ড্রিমক্যাচারের পাশাপাশি এখানে তৈরি হয় দড়ি সুতার পর্দা, জায়নামাজ হ্যাঙ্গার, বুকশেলফ, কলমদানি, টেবিল ল্যাম্প, ফ্লাওয়ার হ্যাঙ্গার, শতরঞ্জি, ডোরবেলসহ প্রায় শতাধিক হস্তনির্মিত পণ্য। প্রতিটি পণ্য তৈরিতে ব্যবহার হয় মালাই কড, উলের সুতা, দড়ি সুতা, রঙিন পালক, কাঠ, পুঁতি, লোহা বা বেতের রিং এবং বিভিন্ন ধরনের আঠা।
প্রতিমাসে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হয় নারী এই উদ্যোক্তার। সব খরচ বাদ দিয়ে লাভ থাকে প্রায় ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ। চতুর্ভুজের হয়ে এখন কাজ করেন প্রায় ৩০ জন নারী। তাঁদের মধ্যে অনেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করছে।
পরিচালক শামীমা নাছরিন বলেন, ‘ কখনো ভাবিনি এমন কিছু শুরু করব। স্কুলশিক্ষক হওয়ার ইচ্ছা ছিল। সেটা না হলেও আজ ৩০ জনকে নিয়ে কাজ করছি। সংসার সামলানোর পাশাপাশি নিজের একটা স্বপ্ন তৈরি করতে পেরেছি, এই তৃপ্তি।’
চতুর্ভুজের ফেসবুক পেজের অনুসারী এখন ৬৬ হাজার।তিনি আরও বলেন,’ অফলাইনের চেয়ে অনলাইন বিক্রিই বেশি হয়। এমনকি বিদেশেও পণ্য গেছে। গ্রাহক খুশি হলে আমার পরিশ্রম সার্থক মনে হয়।’
বর্তমানে গড়ে দুই লাখ টাকার তৈরি পণ্য স্টকে রাখা হয় আর কাঁচামালের স্টক থাকে ছয় থেকে সাড়ে ছয় লাখ টাকার। একসময় কাঁচামাল সংগ্রহে অনেক কষ্ট করতে হতো এখন সরবরাহকারীরাই যোগাযোগ করেন।
শামীমার স্বামী কামরুল হাসান বলেন, ‘ ওর মধ্যে সবসময় একটা সৃজনশীলতা ছিল। কাজটা চ্যালেঞ্জিং হলেও আনন্দ নিয়ে করছে। শুরু থেকেই তাঁকে সাপোর্ট করে যাচ্ছি।’
শামীমা এখন শুধু নিজেই স্বাবলম্বী নন অন্যদেরও আয় ও সম্মানজনক পেশার সুযোগ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ চেষ্টা করছি মানসম্মত পণ্য দিতে, ক্রেতার সন্তুষ্টিই আমার বড় অর্জন।’
ছবি: প্রথম আলো



